সংস্কার ও আধুনিকায়ন হচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও গ্রাহকের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ এখন বিতরণ নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণপ্রবণ এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ও অতিরিক্ত চাপে থাকা অবকাঠামোর ওপর চাপও বাড়ছে। কোথাও সাবস্টেশনের সক্ষমতা সীমার কাছাকাছি, কোথাও পুরোনো লাইন ও সরঞ্জামের কারণে বাড়ছে কারিগরি ক্ষতি। আবার দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ঝুঁকিও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ঢাকা ও এর আশপাশের শিল্প ও শহরতলি এলাকায় বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশকে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীনে থাকা ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পিবিএস) আওতাধীন এলাকায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে। 'পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট' নামের এ উদ্যোগে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বিদ্যমান নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো, ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা, সিস্টেম লস কমানো, দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং বিতরণ ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার এডিবির ঢাকা কার্যালয় থেকে প্রকল্পটির বিষয়ে তথ্য জানানো হয়।
উৎপাদনের পর বড় প্রশ্ন বিতরণে : দেশে ২০২২ সালে শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য অর্জিত হলেও বিদ্যুৎ খাতের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এখন শুধু বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছে দেওয়া নয়, ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ বিতরণ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় শিল্পকারখানা, আবাসিক এলাকা ও নগর অবকাঠামো দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহারও বাড়ছে। এর ফলে যে নেটওয়ার্ক একসময়কার তুলনামূলক কম চাহিদা বিবেচনায় তৈরি হয়েছিল, তার ওপর ক্রমেই বাড়তি চাপ পড়ছে।
এডিবির তথ্যেও দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল বছরে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে দারিদ্র্যের হারও কমেছে। ২০০০ অর্থবছরে ৪৯ শতাংশ থাকা দারিদ্র্যের হার ২০২২ অর্থবছরে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নগরায়নের এই ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ না হলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে। নতুন প্রকল্পটি মূলত সেই অবকাঠামোগত চাপ মোকাবিলার উদ্যোগ।
৫২ নতুন সাবস্টেশন, বাড়বে ১,১৫০ এমভিএ সক্ষমতা : প্রকল্পের সবচেয়ে বড় অংশগুলোর একটি হলো সাবস্টেশন উন্নয়ন। এর আওতায় ৫২টি নতুন সাবস্টেশন স্থাপন করা হবে। এসব সাবস্টেশনে মোট ১ হাজার ১৫০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার (এমভিএ) ক্ষমতার নতুন ট্রান্সফরমার বসানো হবে। শুধু নতুন সাবস্টেশন নয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতাও বাড়ানো হবে। ১২টি পুরোনো সাবস্টেশনের ক্ষমতা আরও ১১৫ এমভিএ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ নতুন অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি যেসব সাবস্টেশন বর্তমানে অতিরিক্ত লোড বহন করছে, সেগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিল্প ও নগর এলাকায় বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দেওয়ার জন্য বিতরণ নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হবে।
২,৬০০ কিলোমিটারের বেশি লাইন : সাবস্টেশন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিবহনের লাইনও সম্প্রসারণ ও সংস্কার করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি ওভারহেড ও ভূগর্ভস্থ লাইন নির্মাণ ও সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কাজে আধুনিক ইনসুলেটেড পরিবাহী ব্যবহার করা হবে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি পুরোনো নেটওয়ার্কের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় শুধু লাইনের দৈর্ঘ্য বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; কোথায় কতটা লোড, কোথায় কী ধরনের ত্রুটি হচ্ছে এবং কীভাবে দ্রুত সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা যায়— এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই প্রকল্পে ত্রুটি শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৯০০ ফল্ট লোকেটর : বিদ্যুৎ লাইনে ত্রুটি দেখা দিলে কোন অংশে সমস্যা হয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে মেরামত কাজে সময় লাগে। তাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই সমস্যা কমাতে প্রকল্পের আওতায় ৯০০টি আধুনিক ফল্ট লোকেটর স্থাপন করা হবে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে লাইনের ত্রুটির স্থান দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা করা হবে। এতে ত্রুটিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে দ্রুত মেরামত এবং সরবরাহ পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়বে। এ ছাড়া নদীর ওপর টাওয়ার এবং আধুনিক সুইচিং স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এর ফলে বিতরণ নেটওয়ার্কের পরিচালন সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার সুযোগ তৈরি হবে।
সিস্টেম লস কমানোও লক্ষ্য : বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আরেকটি বড় বিষয় হলো কারিগরি অপচয় বা সিস্টেম লস। পুরোনো লাইন, অপর্যাপ্ত সক্ষমতা এবং নেটওয়ার্কের বিভিন্ন কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে বিতরণ পর্যায়ে ক্ষতি হতে পারে। নতুন প্রকল্পে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর মাধ্যমে এই কারিগরি অপচয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু নতুন সংযোগ বা নতুন লাইন নির্মাণ নয়; বিদ্যমান বিদ্যুৎকে আরও দক্ষতার সঙ্গে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এডিবির হিসাবে, প্রকল্পের মাধ্যমে কারিগরি দক্ষতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ৭৫১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে সহায়তা করবে।
জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় অবকাঠামো : বাংলাদেশে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, অতিবৃষ্টি কিংবা অন্যান্য দুর্যোগে বিদ্যুৎ লাইন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে একসঙ্গে বড় এলাকায় সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। নতুন প্রকল্পে তাই দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য এডিবি প্রায় ১৪৬ দশমিক ৫২ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ সহনশীলতা অর্থায়ন দিচ্ছে। এ অর্থায়নের আওতায় পরিবেশবান্ধব গ্যাস-ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশগত বিষয়টিও প্রকল্পের মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাতেও জোর : নতুন প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— অবকাঠামোর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিআরইবি ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডিজিটাল ব্যবস্থা একীভূতকরণ, সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা, পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, ততই বাড়ছে তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব। ফলে অবকাঠামো আধুনিকায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনবলের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিকেও প্রকল্পের অংশ করা হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নারীদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা : বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও প্রকল্পে রাখা হয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ তৈরির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ প্রকল্পটির পরিধি শুধু সাবস্টেশন, লাইন কিংবা ট্রান্সফরমার নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জনবল, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং কর্মপরিবেশ— সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
মোট অর্থায়ন ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি : প্রকল্পটির মোট অর্থায়নও বড়। এর মধ্যে এডিবি দেবে ২০০ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সরকার দেবে ১০৭ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড দেবে ১৪১ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলার। এর বাইরে কোরিয়া ই-এশিয়া অ্যান্ড নলেজ পার্টনারশিপ ফান্ড থেকে ১ মিলিয়ন ডলারের অনুদান সহায়তা দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এ প্রকল্পের কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়— দ্রুত পরিবর্তনশীল ঢাকা ও আশপাশের এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের চাহিদার উপযোগী করা। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও সেই বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে হলে শক্তিশালী বিতরণ নেটওয়ার্ক প্রয়োজন। বিশেষ করে যেখানে শিল্পায়ন ও নগরায়ন দ্রুত বাড়ছে, সেখানে সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার, বিতরণ লাইন ও ত্রুটি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা পুরোনো সক্ষমতায় রেখে চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন।
নতুন প্রকল্পে তাই একদিকে যেমন ৫২টি নতুন সাবস্টেশন ও ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের বেশি লাইন নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে, অন্যদিকে ১২টি সাবস্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানো, ৯০০ ফল্ট লোকেটর বসানো এবং আধুনিক সুইচিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। এডিবির অর্থায়নে নেওয়া এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা সুফল দেবে, তা নির্ভর করবে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি, অবকাঠামোর মান, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন সক্ষমতার ওপর। তবে পরিকল্পিত বিনিয়োগের আকার ও কাজের পরিধি থেকে স্পষ্ট, দেশের সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল শিল্প ও নগর এলাকাগুলোর বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর লক্ষ্যেই এবার বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
