বাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ডিজেলচালিত বাস, মিনিবাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সহকারী সচিব মো. জসিম উদ্দিন প্রজ্ঞাপনে সই করেন। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলার অভ্যন্তরীণ রুটের বাস-মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। নতুন ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসে এই ভাড়ার হার কার্যকর হবে না।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য বিআরটিএর অনুমোদিত আসন সংখ্যা কমিয়ে কোনো বাস বা মিনিবাসের আসন পুনর্বিন্যাস করা হলে নির্ধারিত ভাড়া আনুপাতিক হারে পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রুট পারমিট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ বা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির কাছ থেকে আনুপাতিক ভাড়ার হার অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নতুন ভাড়ার তালিকা বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বিআরটিএর পক্ষ থেকে সিটি সার্ভিসে কিলোমিটারপ্রতি ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে তিন শ্রেণির ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

বিআরটিএ সূত্র বলছে, দূরপাল্লা এবং শহরের কোন পথে, কত দূরত্বে ভাড়া কেমন হবে— এর পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে। তবে এর জন্য দু-এক দিন সময় লাগবে। এদিকে রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসে গতকাল সোমবার থেকেই বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করে দিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। কোথায় কোথাও ১০০ টাকা কিংবা তারও বেশি ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-বরিশাল পথে সাকুরা পরিবহনে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ এই পথের ভাড়া বড়জোর ৩০ টাকা বাড়তে পারে। বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে অন্যান্য খরচ যুক্ত করা হয়। তবে এবার অন্যান্য খরচ যুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের দাম যতটা বেড়েছে, ততটুকুই ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণত জ্বালানি তেলের দাম এক টাকা বাড়লে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি বৃদ্ধি পায় এক পয়সা। এবার ডিজেলের মূল্য লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। বিআরটিএ কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তা কমিয়ে ১৭ পয়সা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, টেম্পোসহ অনেক যানবাহন ডিজেলে চলে। এর মধ্যে মালবাহী যানবাহনের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না। এমনকি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়াও সরকার ঠিক করে না। এসি বাস ও মালবাহী যানের ভাড়া মালিক-শ্রমিকেরাই নির্ধারণ করেন। অন্যদিকে নন-এসি বাস ও নগর পরিবহনের বাস-মিনিবাসে ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দিলেও তা মানা হয় না। এ ছাড়া জ্বালানির মূল্য কমার পর ভাড়া কমালেও সেটাও কার্যকর হয় না। গত রোববার রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে সরকার। এর আগে গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা নেওয়া হচ্ছিল। সেটা এখন ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়ে যাবে। আর মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা। তা হবে ২ টাকা ৫৯ পয়সা। অন্যদিকে দূরপাল্লার পথে ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা নেওয়া হচ্ছিল। এখন কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া হবে ২ টাকা ৪০ পয়সা। নতুন ভাড়া নির্ধারণের মধ্য দিয়ে ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া সংক্রান্ত আগের সব প্রজ্ঞাপন ও আদেশ রহিত করা হয়েছে।

বাড়ল লঞ্চের ভাড়া : গণপরিবহনের পর লঞ্চভাড়াও বাড়িয়েছে সরকার। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় প্রতি কিলোমিটারে লঞ্চের ভাড়া ২৩ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২০ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে নৌপথে যাতায়াতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে নৌযান মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গত রোববার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এরপর গতকাল মঙ্গলবার বাসভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়। বাসের পর এবার বাড়ল লঞ্চভাড়াও। পাঁচ মাস আগে গত এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ১৫ টাকা। তখন বাসভাড়া বেড়েছিল কিলোমিটারে ১১ পয়সা। বেড়েছিল ট্রাকভাড়াও।

গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে নৌযান পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। নৌযানের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ডলারের দাম বাড়ার কারণে যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নৌযানমালিকরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। মালিকদের পক্ষ থেকে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল উল্লেখ করে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, তাদের কিছু দাবির যৌক্তিকতা থাকলেও যাত্রীদের সক্ষমতা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া বাড়ানোর হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, 'তেলের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, আর ভাড়া বাড়বে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এটা আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে। আমরা মনে করি, জনগণের নৌযাত্রার ভাড়া একটি যৌক্তিক পর্যায়ে বাড়িয়ে রাখতে আমরা সক্ষম হয়েছি।' নৌযান মালিক সমিতিও এ সিদ্ধান্তে সহযোগিতা করেছে। সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়েছে।

এর আগে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানির দাম এক দফায় ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, 'আমরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর দুবার তেলের দাম বেড়েছে। দুবারই আমরা যৌক্তিকভাবে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করে সর্বনিম্ন বাড়াতে পেরেছি। যাতে জনগণের ওপর খুব বেশি চাপ না হয়।' জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌযানের ভাড়া বাড়ানো জনজীবনে চাপ তৈরি করবে— এ কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, ভাড়া বাড়ানো কখনোই কাম্য নয়। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যখন ভাড়া বাড়ানো অবধারিত হয়ে যায়, তখন যাত্রীদের ওপর যাতে কম চাপ পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রভাব শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে নৌযানমালিকরা যাতে স্বেচ্ছাচারীভাবে ভাড়া বাড়াতে না পারেন, সে বিষয়েও মন্ত্রণালয় নজর রেখেছে।