কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানছে সরকার
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

কিশোরের হাতে থাকার কথা বই-খাতা, খেলার সরঞ্জাম আর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই হাত যখন অপরাধের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহন, আধিপত্য বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে শুরু করে সহিংস অপরাধেও কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। এ পরিস্থিতিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান জোরদার করেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগর ও জেলা শহরে কিশোর অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারী এবং পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে বিপুলসংখ্যক কিশোরকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার অভিযানে আটক ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া মাদকসেবন, নিয়মিত মামলা, মোবাইল কোর্ট, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম ও গ্রেফতারি পরোয়ানার মামলায় ১৭৩ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। কুমিল্লা জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সাম্প্রতিক সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে এ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু কুমিল্লা নয়, দেশের অন্যান্য এলাকাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িতদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কুমিল্লার ঘটনা ঘিরে নতুন করে আলোচনা : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ১৩ বছর বয়সী সন্তান হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এরপর কুমিল্লায় সংঘবদ্ধ কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় জেলা পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় অপরাধী চক্র কিশোরদের ব্যবহার করে থাকে। বয়স কম হওয়ায় তাদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কাজ করিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে শুধু কিশোরদের আটক বা গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; তাদের অপরাধে যুক্ত করা ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করা জরুরি।
ছোট অপরাধ থেকে বড় অপরাধের পথে : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কিশোরদের একটি অংশ প্রথমে ছোটখাটো অপরাধ কিংবা এলাকায় দলবদ্ধভাবে ঘোরাফেরার মাধ্যমে সংঘবদ্ধতার দিকে এগোয়। পরে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হলে তারা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহন, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট কিশোর দল গড়ে ওঠার খবর বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। এসব দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযানও চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক অস্থিরতা, বন্ধুবান্ধবের প্রভাব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ, অপরাধী চক্রের প্ররোচনা এবং অনলাইন জগতের নেতিবাচক প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় কাজ করতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত পরিচিতি, ক্ষমতার অনুভূতি ও সহজে অর্থ উপার্জনের আকাঙ্ক্ষাও তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিতে পারে।
কিশোরদের ব্যবহার করছে অপরাধী চক্র : কিশোর গ্যাং নিয়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— এসব অপরাধী দলে কিশোরেরা কতটা নিজের সিদ্ধান্তে এবং কতটা প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের প্ররোচনা বা ব্যবহারের শিকার হয়ে যুক্ত হচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধী চক্রগুলো অনেক সময় কিশোরদের বয়স ও অপরাধ সম্পর্কে অপরিপক্বতাকে কাজে লাগায়। তাদের সামনে অর্থ, ক্ষমতা কিংবা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের আকর্ষণ তুলে ধরে অপরাধে যুক্ত করা হয়। একবার কোনো চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলে অনেক কিশোর ধীরে ধীরে সেই পরিবেশ থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ হারায়। বিশেষ করে মাদক পরিবহন ও বিক্রির মতো অপরাধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে কিশোর অপরাধ দমনে শুধু কিশোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযান বাড়লেও প্রশ্ন থাকছে : কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে এমন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক কিশোরকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব অভিযানের পরও বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে শুধু ধরপাকড়ের মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযানের পাশাপাশি অপরাধের মূল কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযানে যেন নিরপরাধ কিশোর হয়রানির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অপরাধে জড়িত কিশোরদের ক্ষেত্রে বয়স, অপরাধের ধরন ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারেই প্রথম প্রতিরোধ : কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার আচরণে হঠাৎ কী পরিবর্তন এসেছে— এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু কঠোর নজরদারি দিয়ে কিশোরদের নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। তাদের সমস্যা, হতাশা ও আকাঙ্ক্ষার কথা শোনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করার সুযোগও বাড়াতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাড়াতে হবে নজরদারি ও কাউন্সেলিং : কিশোরদের আচরণগত পরিবর্তন চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে, সহপাঠীদের সঙ্গে বিরোধে জড়ালে কিংবা আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে তার কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সমস্যাগ্রস্ত শিক্ষার্থীকে সহায়তা করার ব্যবস্থা থাকলে অনেক কিশোরকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহারেও প্রয়োজন সচেতনতা : বর্তমানে কিশোরদের জীবনে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব ব্যাপক। এর ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন যোগাযোগ, ক্ষতিকর কনটেন্ট ও অপরাধমূলক সংস্কৃতির প্রচার তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কিশোরদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে হবে। অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কী ধরনের কনটেন্টে যুক্ত হচ্ছে এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে কি না— এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা : কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার তাগিদ রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক, সামাজিক সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় খেলাধুলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যারা কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করছে বা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। কারণ কিশোর অপরাধ কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্র— সব পক্ষের জন্য একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ। আজকের কিশোররাই আগামী দিনের নাগরিক। তাই তাদের অপরাধের জালে জড়িয়ে পড়ার আগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযান সেই উদ্যোগেরই একটি অংশ। তবে অভিযানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে এ সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। কিশোরদের হাতে অপরাধের হাতিয়ার নয়, শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্ভাবনার পথ তুলে দেওয়াই হতে পারে এ সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ।
