বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সরকারের নতুন উদ্যোগ
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। নিউইয়র্কে বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে জ্বালানি, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও উৎপাদন খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে সরকার। পাশাপাশি বিনিয়োগ সুরক্ষা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সহজ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও বিনিয়োগের অর্থ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার কথা জানানো হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশে বিদেশি পুঁজির প্রবাহ নিয়ে বিপরীতমুখী চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই দেশে আসছে, অন্যদিকে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘদিনের নিট অর্থপ্রবাহ নেতিবাচক। ফলে নতুন বিনিয়োগ টানার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের নিট অবস্থান ছিল ঋণাত্মক ২২৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ ওই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কেনার তুলনায় ২২৩ কোটি ডলার বেশি মূল্যের শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর আগের অর্থবছরেও নিট বহির্গমন ছিল ১৩৮ কোটি ডলার। এ নিয়ে টানা ষষ্ঠ অর্থবছর বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে নিট অর্থ বেরিয়ে গেছে। তবে শেয়ারবাজারের এই হিসাবকে বাংলাদেশের সব ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের হিসাব আলাদা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে নিট এফডিআই এসেছে প্রায় ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ শেয়ারবাজার থেকে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে গেলেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারখানা, ব্যবসা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এফডিআই থাকা মানেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের আস্থা ফিরে এসেছে— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী তুলনামূলক দ্রুত অর্থ তুলে নিতে পারেন। বিপরীতে একটি বিদেশি কোম্পানি যখন কারখানা স্থাপন করে, প্রযুক্তি আনে কিংবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অংশীদারত্বে যায়, তখন সেটি অনেক বেশি সময়ের সিদ্ধান্ত। ফলে এফডিআইয়ের পরিমাণের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ, পুনর্বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ স্থানান্তরের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা ছিল বাংলাদেশে অর্থ আনা এবং বিনিয়োগ শেষে তা ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া। এ সমস্যা কমাতে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার হস্তান্তর ও বিক্রয়লব্ধ অর্থ দেশে ফেরত নেওয়ার নিয়ম সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কিছু অনুমোদন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। শেয়ারবাজারেও সংস্কারের উদ্যোগ চলছে। দীর্ঘদিনের শেয়ারদর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাজারে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সূচক নির্ধারক সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারের নিয়মিত পর্যালোচনার উদ্যোগও আবার শুরু হয়েছে। এর প্রাথমিক কিছু প্রভাব সেপ্টেম্বরের লেনদেনে দেখা গেছে। মাসের প্রথম ২৪ দিনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন এবং প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। ফলে ওই সময়ে তাদের নিট কেনাকাটা ছিল প্রায় ৭০ কোটি টাকা। দীর্ঘ সময়ের নিট বহির্গমনের পর এ ধরনের কেনাকাটা বাজারে পরিবর্তনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মাত্র এক মাসের লেনদেনের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বদলে গেছে— এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনও আসেনি।
কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত শুধু শেয়ারের সম্ভাব্য মুনাফার ওপর নির্ভর করে না। অর্থ আনা ও নেওয়ার সুবিধা, মুদ্রার স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা, কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা, করব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং নীতির ধারাবাহিকতাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসব জায়গায় এখনও বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা ও ব্যবসার পরিবেশে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হারও বিনিয়োগকারীদের কাছে ঝুঁকির একটি বিষয়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসার পরিবেশকে কতটা নির্ভরযোগ্য করা যাচ্ছে, সেটিও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এফডিআইয়ের পরিমাণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও আরেকটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কোনো বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে অর্জিত মুনাফা আবার দেশেই বিনিয়োগ করলে সেটিও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের হিসাবে যুক্ত হয়। কিন্তু এ ধরনের পুনর্বিনিয়োগ নতুন বিদেশি মূলধন আসার সমান নয়। তাই শুধু এফডিআইয়ের মোট পরিমাণ বাড়ছে কি না, সেটি দিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
এ বাস্তবতায় নিউইয়র্কের বৈঠকগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের বড় বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের আহ্বানও জানানো হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের কাছে সম্ভাবনার তালিকা তুলে ধরাই শেষ কথা নয়। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী অর্থ বিনিয়োগের আগে হিসাব করেন, তিনি কতটা সহজে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন, বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ থাকবে, মুনাফা ও মূলধন প্রয়োজন অনুযায়ী দেশে ফিরিয়ে নিতে পারবেন কি না এবং আগামী কয়েক বছর নীতির পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে।
এ কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের সামনে দুটি সমান্তরাল কাজ— নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা এবং বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা। শেয়ারবাজারে বিদেশি পুঁজির দীর্ঘদিনের বহির্গমন যেমন বিনিয়োগ পরিবেশের কিছু দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি এফডিআইয়ের প্রবাহ দেখায় যে বাংলাদেশ এখনও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাহীন হয়ে যায়নি। সেপ্টেম্বরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিট শেয়ার কেনা এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত কিছু নিয়ম সহজ করার উদ্যোগ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা বোঝার জন্য আরও দীর্ঘ সময়ের তথ্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশ এখন তাই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে; একই সঙ্গে তাদের অর্থ ধরে রাখার মতো পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা হবে শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীকে দেশে আনা নয়— তাদের বিনিয়োগ ধরে রাখা, পুনর্বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।
সম্ভাবনা আছে, তবে আমন্ত্রণের পরের কাজটাই বড় : বাংলাদেশের সামনে তাই একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা রয়েছে। একদিকে ২০২৫ সালে এফডিআইয়ের প্রবাহ বেড়েছে এবং বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে নতুন ইকুইটি মূলধনের প্রবাহ তুলনামূলকভাবে কম এবং শেয়ারবাজারে বিদেশি পুঁজির দীর্ঘমেয়াদি বহির্গমন এখনও বড় বাস্তবতা। সেপ্টেম্বরে বিদেশিদের নিট শেয়ার কেনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপাট্রিয়েশন-সংক্রান্ত নিয়ম সহজ করা এবং নভেম্বর থেকে এমএসসিআইয়ের নিয়মিত পর্যালোচনা পুনরায় শুরু— এসব পরিবর্তন বাজারে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে এগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রবণতার স্থায়ীটা নিরাপদ, অর্থ কতটা সহজে দেশে আনা যাবে, মুনাফা ও মূলধন প্রয়োজনে কতটা সহজে ফেরত নেওয়া যাবে, স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, কর ও নিয় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করার আগে আরও কয়েক মাসের তথ্য প্রয়োজন।
কারণ একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে অর্থ আনার আগে শুধু সম্ভাব্য মুনাফার হিসাব করেন না। তিনি দেখেন বিনিয়োগ কতটা নিরাপদ, অর্থ কতটা সহজে দেশে আনা যাবে, মুনাফা ও মূলধন প্রয়োজনে কতটা সহজে ফেরত নেওয়া যাবে, স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, কর ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো কতটা পূর্বানুমেয় এবং কয়েক বছর পরও নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে কি না।
নিউইয়র্কে সরকারের বিনিয়োগ আহ্বান তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল বিদেশি বিনিয়োগের নতুন প্রচারণা নয়; এর সঙ্গে দেশের ভেতরের সংস্কারের প্রশ্নটিও সরাসরি যুক্ত। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে সম্ভাবনার কথা বলা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে পরিণত করতে প্রয়োজন দ্রুত ও পূর্বানুমেয় সরকারি সেবা, স্থিতিশীল নীতি, শক্তিশালী আর্থিক খাত, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অর্থ আনা-নেওয়ার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি এখন তাই নজর দিতে হবে বিনিয়োগের গুণগত মান ও স্থায়িত্বের দিকে। নতুন কোম্পানি কতটা আসছে, কতটা নতুন মূলধন আসছে, কতটা পুনর্বিনিয়োগ হচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা কতটা সময় বাংলাদেশে অর্থ ধরে রাখছেন এবং নতুন প্রকল্পে কতটা অর্থ যাচ্ছে— এসব সূচকই শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ পরিবেশের বাস্তব চিত্র দেবে। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের জন্য দরজা খোলার বার্তা দিয়েছে। এখন সেই বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে দেশের ভেতরে কত দ্রুত বিনিয়োগের বাধাগুলো কমানো যায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যায় কি না, যেখানে তারা শুধু বাংলাদেশে অর্থ আনবেন না, বরং সেই অর্থ ধরে রেখে নতুন করে বিনিয়োগও করবেন।
