ট্যানারি বর্জ্যকে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে পরিণত করা সম্ভব
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীতে বছরে প্রায় ৮৪ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর ৮৪ শতাংশের বেশি এখনো অব্যবহৃত থাকছে। বিপুল এই বর্জ্যকে পরিবেশ দূষণের বোঝা হিসেবে না দেখে শিল্পের কাঁচামাল ও অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে ট্যানারি বর্জ্য থেকে জেলাটিন, কোলাজেন, ট্যালো, জুতার সোল, সেফটি গ্লাভস, লেদারবোর্ডসহ বিভিন্ন মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্মৃতি কর্মকার বলেছেন, ট্যানারি বর্জ্যকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে না দেখে নতুন পণ্য, ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, 'আমাদের ট্যানারি বর্জ্যকে শুধু সমস্যা বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও উদ্যোক্তার মাধ্যমে কীভাবে এটিকে নতুন পণ্য ও ব্যবসার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেদিকে আমরা নজর দিতে পারি।' গতকাল সোমবার রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় 'ট্যানারি সলিড ওয়েস্ট (টিএসডব্লিউ) ম্যানেজমেন্ট: ওয়েস্ট টু ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসোর্স' শীর্ষক নীতিগত সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিইউআইএলডি) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করে।
বিইউআইএলডির উপস্থাপনায় বলা হয়, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে বর্তমানে ১৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে প্রায় ৮৪ হাজার টন ট্যানারি কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ৮৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বর্জ্যই অব্যবহৃত থাকে। বর্তমানে মাত্র ১৫ দশমিক ৬১ শতাংশ ক্রোমমুক্ত ট্যানারি কঠিন বর্জ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশাল পরিমাণ এই বর্জ্যের একটি অংশকে যথাযথভাবে সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, প্রক্রিয়াজাত ও পুনর্ব্যবহার করা গেলে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে সংলাপে তুলে ধরা হয়। স্মৃতি কর্মকার বলেন, ট্যানারি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংলাপে উঠে আসা বিষয়গুলো শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। বর্জ্যকে কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ করা যায়, সে বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, 'যখনই আমরা বর্জ্য নিয়ে কথা বলি, আমরা সবসময় পরিবেশ দূষণ ও নদী দূষণের বিষয়টি দেখি। কিন্তু আমরা এটিকে আসলে ব্যবহার করতে পারি।' বাংলাদেশে ট্যানারি শিল্পকে ঘিরে উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, দক্ষ কর্মী এবং প্রতিষ্ঠিত একটি শিল্প ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ট্যানারি বর্জ্যকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।
'আজকের উপস্থাপনাটি শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়; একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক চামড়া শিল্প গড়ে তোলার জন্যও এটি খুবই প্রয়োজনীয়,' বলেন তিনি।
সংলাপে ট্যানারি বর্জ্যের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্জ্যের ধরন ও উপাদান অনুযায়ী তা থেকে জেলাটিন, কোলাজেন, ট্যালো, জুতার সোল, সেফটি গ্লাভস, লেদারবোর্ড, কম্পোজিট উপকরণসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য তৈরি করা যেতে পারে। এ জন্য বর্জ্য সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। ট্যানারি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সার্কুলার অর্থনীতিতে আরও এগিয়ে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন স্মৃতি কর্মকার। তিনি বলেন, 'এটি সার্কুলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে একটি শিল্পপ্রক্রিয়ায় উৎপন্ন বর্জ্য কীভাবে অন্য একটি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়েও আমাদের ভাবতে হবে।'
সংলাপে ট্যানারি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, শুধু বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বর্জ্য থেকে সম্পদ আহরণ এবং মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিইউআইএলডি ট্যানারি কঠিন বর্জ্যভিত্তিক সম্পদ পুনরুদ্ধার ও মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদনকে পৃথক একটি শিল্প খাত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে পুনরুদ্ধার, পৃথকীকরণ ও পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ করা ট্যানারি কঠিন বর্জ্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কাছে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য যৌথ সুবিধা স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহকারীদের নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং প্রোটিন, কোলাজেন, ট্যালো ও ক্রোমিয়াম পুনরুদ্ধারে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও পাইলট প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সিইটিপির বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে স্মৃতি কর্মকার বলেন, এ বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে কাজ করছে এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা আশা করি, আমরা বর্তমানে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হব।'
সংলাপ থেকে পাওয়া সুপারিশগুলো মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হলে তা বিবেচনা করে মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিইউআইএলডির চেয়ারপারসন এ কে খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. নুরুজ্জামান, এনডিসি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনিডোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলমগীর হোসেন।
বিইউআইএলডির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সময় দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজও বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর বিশ্বব্যাংকের সাবেক অল্টারনেট এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাবেক সিনিয়র সচিব শরীফা খানের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
