ব্যবসা শুরুর জটিলতা কমাতে সরকারের নতুন উদ্যোগ
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে উদ্যোক্তাদের জন্য স্বতন্ত্র বিজনেস আইডি চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এই আইডির মাধ্যমে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেই ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদনের আবেদন করা যাবে। এর মাধ্যমে কোম্পানি নিবন্ধনের পর ব্যবসা শুরু করতে বর্তমানে যে গড়ে ৩৫৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগে, তা কমিয়ে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসা শুরু করার কার্যক্রম সহজ করতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিবিআইডি, বাংলাবিজসহ একাধিক কার্যক্রম রয়েছে।
তবে নতুন এ সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে যৌথভাবে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইনভেস্ট বাংলাদেশ। ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবা দেওয়ার একক প্ল্যাটফর্ম 'বাংলাবিজ'-এর জন্য ১৪ দিনের একটি 'বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ' তৈরি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে একটি কোম্পানি নিবন্ধনের পর ব্যবসা শুরু করার আগে উদ্যোক্তাদের একাধিক লাইসেন্স, ছাড়পত্র ও অনুমোদন নিতে হয়। এর মধ্যে ট্রেড লাইসেন্স, করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ও ব্যাংক হিসাব খোলার পাশাপাশি ব্যবসার ধরন অনুযায়ী অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে এসব শর্ত আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) পাওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। ফলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, কোম্পানি নিবন্ধন থেকে এলসি খোলা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮০ থেকে ৩৫৫ দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়।
এ বিষয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় একটি শর্ত পূরণের সঙ্গে আরেকটি শর্তের নির্ভরতা থাকায় ব্যবসা শুরুর পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া ১৪ দিনে নামিয়ে আনার উদ্যোগের মূল বিষয় হলো— সব শর্তপূরণ বাদ দেওয়া নয়; বরং এলসি খোলার আগে যেসব পূর্বশর্ত এখন বাধ্যতামূলক, সেগুলো কমিয়ে আনা বা কিছু শর্ত পরবর্তী সময়ে পূরণের সুযোগ দেওয়া এবং একাধিক প্রক্রিয়া সমান্তরালভাবে সম্পন্ন করা। নতুন ব্যবস্থায় একজন উদ্যোক্তা কোম্পানি নিবন্ধনের সময়ই একটি ইউনিক বিজনেস আইডি পাবেন। ওই আইডি ব্যবহার করে একটি একক প্ল্যাটফর্ম থেকেই ব্যবসা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবার আবেদন করা যাবে।
নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থায় বিজনেস আইডিরমাধ্যমে একজন উদ্যোক্তার পুরো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হবে। কোন অনুমোদন কখন নেওয়া হয়েছে, কোনটি বাকি রয়েছে এবং কোনো আবেদন কোন পর্যায়ে আটকে আছে— এসব তথ্য একটি ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে।
এতে কোনো উদ্যোক্তা প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে ব্যবসা শুরুর কাজ এগিয়ে নেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে পরবর্তী শর্তপূরণ না করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও তা জানতে পারবে। প্রয়োজনে পরিদর্শন বা যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে শর্তপূরণ নিশ্চিত করা হবে।
ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে তিনটি মূল নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এগুলো হলো— শর্তপূরণে ছাড় না দেওয়া, পুরো প্রক্রিয়া শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল করা এবং ব্যবসা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় পূর্বশর্তের সংখ্যা যৌক্তিকভাবে কমিয়ে কিছু শর্ত পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়া।
জানা যায়, ইনভেস্ট বাংলাদেশ এরইমধ্যে ব্যবসা শুরু করতে প্রয়োজনীয় ধাপ এবং কোন পর্যায়ে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, তার ম্যাপিং শেষ করেছে। কিছু ক্ষেত্রে বিধিমালা পরিবর্তনের কাজও শুরু হয়েছে।
এর আগে গত ১ অক্টোবর দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রম আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো সমন্বিত করার নির্দেশ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি সেবাব্যবস্থাকে আরও সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করার কথা বলেন তিনি। ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সেবাগুলো পর্যায়ক্রমে ডিজিটাল ও সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা, গতিশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
পাশাপাশি কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়া, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা এবং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ চলছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, ব্যবসা শুরুর সংস্কারের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের পর খাতভিত্তিক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ শুরু হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি এরইমধ্যে কয়েকটি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করেছে।
কর্মকর্তারা জানান, আগামী এক মাসের মধ্যে সংস্কারের কিছু প্রাথমিক ফল পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ৬ থেকে ৭ মাসের মধ্যে সংস্কারের বড় একটি অংশ বাস্তবায়ন এবং প্রায় ১ বছরের মধ্যে পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
