মামলাজট কমাতে নতুন উদ্যোগ রেলওয়ের
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ রেলওয়ের নামে দেশের বিভিন্ন আদালতে চলমান মামলার সঠিক সংখ্যা নিয়েই রয়েছে অস্পষ্টতা। কোনো মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পরও তা নথিতে হালনাগাদ হয়নি, আবার কিছু মামলা তালিকায় অন্তর্ভুক্তই করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মামলা পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনা ও দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ১৫ দিনের মধ্যে বিচারাধীন সব মামলার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, মামলার সর্বশেষ অবস্থা জানতে ট্র্যাকিংব্যবস্থা চালু, গুরুত্বপূর্ণ ও আদালত অবমাননার মামলায় বিশেষ নজরদারি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিনিয়র আইনজীবী নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একই সঙ্গে দায়িত্বে গাফিলতি করা প্যানেল আইনজীবীদের বাদ দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ মামলার পেপারবুক ও নথি সংরক্ষণ, আইনজীবীদের বকেয়া বিল ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ এবং জরুরি মামলার ব্যয় মেটাতে বিশেষ বাজেটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে মামলার প্রকৃত সংখ্যা ও অবস্থান সম্পর্কে একটি সমন্বিত চিত্র পাওয়া যাবে। এতে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি মামলা পরিচালনায় দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা কমবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের সভাপতিত্বে গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আইন শাখার সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় মামলা পরিচালনার বর্তমান পরিস্থিতি, আইন শাখার সক্ষমতা, আইনজীবীদের দায়িত্ব ও পাওনা এবং জরুরি আইনি ব্যয়ের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
১৫ দিনের মধ্যে মামলার পূর্ণাঙ্গ তালিকা : সভায় জানানো হয়, রেলওয়ের বিচারাধীন মামলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তালিকা বর্তমানে নেই। ফলে কোন আদালতে কতটি মামলা চলছে, কোন মামলার কী অবস্থা এবং কোন মামলায় কখন কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন— এসব তথ্য এক জায়গা থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় আদালত অবমাননার মামলাসহ রেলওয়ের সব বিচারাধীন মামলার পূর্ণাঙ্গ তালিকা ১৫ দিনের মধ্যে প্রস্তুতের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলাগুলোর আলাদা তালিকা এক মাসের মধ্যে প্রস্তুত করে আইন শাখায় পাঠাতে বলা হয়েছে। মামলার সংখ্যা, আদালতের নাম, বর্তমান অবস্থা, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও পরবর্তী করণীয়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য তালিকায় রাখার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের আইন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আল মাহমুদ বলেন, 'কিছু মামলা হয়েছে দেখা যায় এন্ট্রি হয়নি, আবার নিষ্পত্তি হয়েছে, অথচ দেখা গেলো লেখা হয়নি। মামলার সংখ্যা ওইভাবেই রয়ে গেছে। এখন আমরা তালিকা করবো, সঠিক সংখ্যাটা বের হবে। তালিকার কাজ চলছে।'মামলার অবস্থান জানতে ট্র্যাকিংব্যবস্থা : মামলার তালিকা তৈরির পাশাপাশি সেগুলোর সর্বশেষ অবস্থা নিয়মিত জানার জন্য মামলা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে রেলওয়ের নামে চলমান মামলাগুলোর তথ্য দ্রুত পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো মামলার শুনানি কবে, আদালত কী আদেশ দিয়েছেন, পরবর্তী তারিখ কবে এবং মামলাটি কোন পর্যায়ে রয়েছে— এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা সম্ভব হবে। এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রেলওয়ের সিনিয়র আইন কর্মকর্তাকে।
গুরুত্বপূর্ণ মামলায় বিশেষ নজর : রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ মামলা এবং আদালত অবমাননার মামলাগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব মামলায় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত তদারকি করতে বলা হয়েছে। জরুরি মামলায় প্রয়োজন অনুযায়ী সিনিয়র আইনজীবী নিয়োগেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে কোনো মামলায় আদালতের আদেশের কারণে রেলওয়ের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মো. আল মাহমুদ বলেন, 'হাইকোর্টের মামলাগুলো স্পর্শকাতর। এজন্য আইনজীবী নিয়োগের জন্য টেন্ডারও হয়েছে মিনিস্ট্রি থেকে। নিয়োগ হলে জানা যাবে, কয়জনকে নেওয়া হয়েছে, কাকে কাকে নেওয়া হয়েছে।'
পেপারবুক ও নথি সংরক্ষণ : গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় পেপারবুক ও নথি প্রস্তুত করে রাখার সিদ্ধান্তও হয়েছে। অতি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তালিকা অনুযায়ী এসব নথি প্রস্তুত করে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের অধীন আইন শাখায় সংরক্ষণ করা হবে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এতে আদালতে শুনানির সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে দেরি এবং নথি খোঁজার জটিলতা কমবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মামলার প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গায় থাকায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াও সহজ হবে।
দায়িত্বে গাফিলতি করা আইনজীবীদের বাদ : রেলওয়ের প্যানেল আইনজীবীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত হয়েছে। যারা পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন না, তাদের প্যানেল থেকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। নতুন প্যানেল আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়র আইন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে মামলার গুরুত্ব ও ধরন অনুযায়ী দক্ষ আইনজীবী বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
ডিসেম্বরের মধ্যে বকেয়া বিল : আইনজীবীদের বকেয়া বিল পরিশোধের বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বকেয়া বিল পরিশোধের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এজন্য বিদ্যমান বাজেট যথাযথভাবে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মো. আল মাহমুদ বলেন, 'গত বছর কোনো বিল দেওয়া হয়নি, আমরা পেপার পাঠাচ্ছি। এ বছর বিল দেওয়া হবে।' তিনি জানান, মহাপরিচালক ও সচিব যেসব মামলায় যুক্ত বা যেসব মামলা সম্পর্কে অবগত, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অতিরিক্ত বাজেট দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জরুরি মামলায় আলাদা বাজেট : মামলায় স্থিতাবস্থা বা সাময়িক আদেশ বাতিল কিংবা পরিবর্তনের আবেদন, জরুরিভিত্তিতে মামলা দায়েরসহ তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপের জন্য বর্তমানে আলাদা আর্থিক ব্যবস্থা নেই। এ সমস্যা সমাধানে জরুরি মামলার জন্য বিশেষ বাজেটের বিষয়ে রেল মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি মামলা পরিচালনার ছোট ও তাৎক্ষণিক খরচ মেটাতে আইন শাখার জন্য ১০ হাজার টাকা অগ্রিম খরচের (ইমপ্রেস্ট) বিলের ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মামলা ফাইলিং, কোর্ট ফি, নথি সংগ্রহ, সার্চিং ফি ও সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের মতো খরচ এ অর্থ থেকে মেটানো যাবে। পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের আইন কর্মকর্তাদের অফিসের অগ্রিম খরচের বিল বাড়ানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জনবল ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ : মামলা পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জনবল ও দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টিও সভায় উঠে এসেছে। আইন শাখার কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়ার পাশাপাশি মামলা পরিচালনায় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক এবং যুগ্ম মহাপরিচালককে (পার্সোনাল) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলার সঠিক তথ্যভান্ডার তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ, ট্র্যাকিংব্যবস্থা, দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং জরুরি আইনি ব্যয়ের ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে রেলওয়ের মামলা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এতে দীর্ঘদিনের মামলাজট কমানোর পাশাপাশি রেলওয়ের সম্পদ ও স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
