রামপালে হচ্ছে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র

ব্যয় ২৫০০ কোটি টাকা

প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পরিচিত বাগেরহাটের রামপালে এবার নির্মাণ হচ্ছে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা অব্যবহৃত জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রামপাল থেকে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রস্তাবিত রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য গতকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উত্থাপন করা হয়। প্রকল্পটি ২০২৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে কার্যক্রম চলছে। পরিকল্পনা কমিশন ও বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ১ হাজার ১২৩ কোটি ৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ এবং পরিশোধের মেয়াদ ১৬ বছর। এর মধ্যে এক বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে।

প্রকল্পটির বড় সুবিধা হলো, নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। ২০১১ সালে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বিপিডিবি মোট ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে। জমিটি ব্লক-এ ও ব্লক-বি নামে দুটি অংশে বিভক্ত করা হয়। ব্লক-এ অংশে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানির ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। ব্লক-বি অংশটি বিপিডিবির অধীনে রয়েছে। সেখানে ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ আগেই সম্পন্ন হয়েছে।

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ব্লক-বির মোট ৯১৮ দশমিক ৫০ একর জমির মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬৩ একর গ্রিন বেল্টের জন্য রাখা হয়েছে। ৩২ দশমিক ৮৭ একর রয়েছে বন্যা প্রতিরোধ বাঁধের জন্য। এ ছাড়া প্রায় ৯৪ একর নিচু জমি এবং উত্তর-পশ্চিম পাশে প্রায় ৩০ একর জমি লেক হিসেবে রয়েছে। এসব এলাকা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বাদ দেওয়ার পর সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রায় ৬৮৫ একর জমি ব্যবহারযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পরে বিদ্যুতের বিশেষ বিধান আইন, ২০১০-এর সংশোধিত কাঠামো বাতিল হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া স্থগিত হয়। এরপর অবকাঠামো বিনিয়োগ সুবিধা কোম্পানি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করে ৬৮৫ একর জমিতে গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করে।

প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রস্তাবিত ট্যারিফ ধরা হয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সা। বিপিডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফেনীর সোনাগাজীতে প্রস্তাবিত ২২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের তুলনায় রামপালের বিদ্যুতের দাম কম। সোনাগাজী প্রকল্পে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের ট্যারিফ ৮ টাকা ৮৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সোনাগাজীর তুলনায় রামপালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রস্তাবিত দাম প্রায় ৪৩ শতাংশ কম।

নির্মাণ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও রামপাল প্রকল্প তুলনামূলক সুবিধাজনক। রামপাল প্রকল্পে প্রতি মেগাওয়াট স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সোনাগাজী প্রকল্পে এ ব্যয় প্রায় ৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। তবে সোনাগাজী প্রকল্পের সক্ষমতা ব্যবহারের হার রামপালের চেয়ে বেশি। সোনাগাজীর ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর ২১ শতাংশ এবং রামপালের ক্ষেত্রে তা ১৭ শতাংশ। ফলে একই এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি এবার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি তিনটি ১৩৩/২৪০ কেভি বে, ৯টি সুইচিং স্টেশন এবং প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। সৌর প্যানেলের ন্যূনতম ক্ষমতা ধরা হয়েছে ৫৪০ ওয়াটপিক।

প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ যাবে সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কেনায়। সৌর প্যানেল ও স্থাপনের কাঠামোর জন্য ১ হাজার ২৩৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে ৭৬২ কোটি ২৬ লাখ টাকা, অন্যান্য সরঞ্জামে ৮০ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং সঞ্চালন লাইনে ৬০ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ২০৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, নকশা ও প্রকৌশল কাজে ১১ কোটি ২ লাখ টাকা এবং স্থাপন, চালু, পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ে ৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা রাখা হয়েছে।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটির আর্থিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ১২ দশমিক ০২ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ৯৮ দশমিক ৩১ শতাংশ ধরা হয়েছে। আর্থিক হিসাবে ব্যয়-সুবিধা অনুপাত ১ দশমিক ০০১ এবং অর্থনৈতিক হিসাবে ১ দশমিক ৪৬। অর্থনৈতিক নিট বর্তমান মূল্য প্রায় ৯২৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, গ্যাস বা তরল জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না। ফলে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়ানো সম্ভব হবে। সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সুন্দরবনের কাছাকাছি হওয়ায় প্রকল্পটির পরিবেশগত বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এর কারণে সুন্দরবনের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। একইসঙ্গে বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, পানির গুণমান, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান খাল ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ সচল রাখার পাশাপাশি সবুজ বেষ্টনী তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

অব্যবহৃত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষির সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বয়ের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়েছে। একই জমিতে সৌর প্যানেল স্থাপনের পাশাপাশি উপযোগী কৃষিকাজের সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে সরাসরি ২৫ জন, ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ জন দক্ষ কর্মী এবং প্রায় ১৫০ জন অস্থায়ী কর্মী কাজ করবেন। কেন্দ্র চালুর পর পরিচালন পর্যায়ে মোট ২৫৬ জন জনবল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৫১ জন স্থায়ী এবং ২০৫ জন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত থাকবেন।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, প্রস্তাবিত সৌর ফোটোভোলটাইক (পিভি) বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৯১৮ দশমিক ৫ একর অব্যবহৃত জমির ওপর নির্মাণ করা হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আগে এই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত জমি কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার করা হবে।

জহুরুল ইসলাম বলেন, রামপালে বর্তমানে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ৬৫৬ মেগাওয়াট এবং দ্বিতীয় ইউনিট থেকে ৬৬৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করিম জানান, পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে। প্রকল্প প্রস্তাব নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের পরিকল্পনা উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব নূর আহমেদ বলেন, রামপাল এলাকায় প্রস্তাবিত ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, সোনাগাজীতে ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। সেই তুলনায় রামপালের ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটি প্রায় দ্বিগুণ বড়। এটি দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নির্দেশ করে। এই প্রকল্পের ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় কম, যা এটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করেছে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জমিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে রূপান্তর বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে পরিবর্তিত অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এ ধরনের প্রকল্প ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখার পাশাপাশি আরও পরিচ্ছন্ন, টেকসই ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম বিদ্যুৎ খাত গড়ে তোলার পথে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।