গঙ্গায় নবায়ন নয়, 'নতুন বা সংশোধিত' চুক্তি চায় ঢাকা
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ডিসেম্বরে ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন বা সংশাধিত চুক্তি করার বিষয়ে আশাবাদী পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার ইস্কাটনে পানি বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি বলেছেন, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হতে যাচ্ছে। শুধু বর্তমান চুক্তি নবায়ন না করে শুষ্ক মৌসুমের প্রাপ্যতা নিশ্চিতের বিধান যুক্ত করে নতুন বা সংশোধিত চুক্তি চাইছে বাংলাদেশ সরকার।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউ অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত 'পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা' শীর্ষক সেমিনার থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন এ্যানি। এক প্রশ্নে ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্নের বিষয়ে আশা প্রকাশ করে এ্যানি বলেন, যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমে বৈঠক হচ্ছে এবং সেই বৈঠকের ভিত্তিতে আমরা আশাবাদী যে, ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বরের আগেই এই চুক্তি সম্পন্ন হবে। সেখানে আমাদের মূল অগ্রাধিকার থাকবে ১৯৭৭ সালে চুক্তির মতো 'গ্যারান্টি ক্লজ' ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, "গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সবাই বেশ উদগ্রীব। ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই চুক্তির মেয়াদ শেষ, ৩০ বছরের যে চুক্তি ছিল। ১৯৭৭ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় প্রথম ৫ বছরের জন্য চুক্তি করেছিলেন, সেই চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। "কিন্তু ১৯৯৬ সালে সেই গ্যারান্টি ক্লজটা বাদ রেখেই বাকিটা নবায়ন করা হয়, বা নতুন চুক্তি করা হয় সেই সময়— ৩০ বছরের জন্য। এই মুহূর্তে, ১২ ডিসেম্বরের আগেই আমাদের নতুন চুক্তি করতে হবে। সেই অনুযায়ী আমি মনে করছি, বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় পক্ষই নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।"
নবায়ন নাকি নতুন চুক্তি, সেই বিষয়ে আরেক প্রশ্নে শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, "আমরা যে সেমিনারে ছিলাম, সেই সেমিনারে সবাই এই আলোচনার ওপরই জোর দিয়েছেন। এবং সবাই একমত যে নতুনভাবে চুক্তি করে যেন আরও অনেক দিন চুক্তির মেয়াদ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি এবং সেখানে যেন এই গ্যারান্টি ক্লজটা অন্তর্ভূক্ত থাকে, সেদিকে আমাদের নজর রয়েছে। "এবং আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের স্বার্থ রেখেই, দেশের স্বার্থ রেখেই যেন আমরা চুক্তিকে অগ্রাধিকার দিই, সেদিকে আমরা খুব বেশি সক্রিয় রয়েছি।" যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের তারিখ নিয়ে ভারতের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা চলছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "আমাদের জেআরসির কারিগরি টিম এরইমধ্যে কাজ করেছেন এবং প্রতি মুহূর্তে তারা এই কাজগুলো করছেন। "আমরা আশা করছি, তাদের সেই কারিগরি টিম কাজ শেষ করেই বাকি যে কাজটা সম্পন্ন করা দরকার জেআরসির মন্ত্রী পর্যায়ে, সেটা সম্পন্ন হবে।" যে গ্যারান্টি ক্লজের কথা পানিসম্পদ মন্ত্রী এ্যানি বলেছেন, সে বিষয়ে এ সেমিনারে বিস্তারিত ধারণা দিয়েছেন পানি কূটনীতি বিশ্লেষক মালিক ফিদা খান।
সেন্টার ফর সায়েন্স, টেকনোলজি, পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির এই নির্বাহী পরিচালক বলেছেন, ১৯৭৭ এবং ১৯৯৬ সালে গঙ্গার দুই পানি বণ্টন চুক্তিতে দুই ধরনের গ্যারান্টি ক্লজ ছিল। তবে তার বিবেচনায় ১৯৭৭ সালের বিধানটি বাংলাদেশের পক্ষে 'বেশি জোরালো ছিল'।
১৯৯৭ সালের গ্যারান্টি ক্লজের কথা তুলে ধরে মালিক ফিদা এ খান বলেন, "নির্ধারিত ১০ দিনের বিরতিতে গঙ্গার পানি যদি তফসিলে থাকা নির্ধারিত পরিমাণের কম প্রবাহিত হয়, বাংলাদেশ তার নির্ধারিত পরিমাণের কমপক্ষে ৮০ শতাংশ পানি পাওয়া নিশ্চিত করছে এই ধারা।
"সুতরাং তফসিলে যদি লেখা থাকে— বাংলাদেশ ১০০ কিউসেক পানি পাবে, তাহলে এটা কোনো ৮০ শতাংশের নিচে যাবে না।"
১৯৯৬ সালের চুক্তিতেও এক ধরনের গ্যারান্টি ক্লজ থাকার কথা তুলে ধরে ফিদা এ খান বলেন, "এই গ্যারান্টি ক্লজে কৃষির চাহিদা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সময় সেখানে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময় ধরা হয় এবং তিনটি পর্যায়ক্রমিক— ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাওয়ার নিশ্চিয়তা দেওয়া হয়েছে প্রত্যেক দেশকে।
"তার মানে হচ্ছে, প্রতি ১০ দিন করে ছয়টি সময়সীমা রয়েছে। তিনটি সময়সীমায় ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাবে এবং ভারতও একইভাবে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। এটাও একটা গ্যারান্টি ক্লজ।"
এ পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ বলেন, দুই চুক্তিতেই ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা পয়েন্টে পানি প্রবাহের ঐতিহাসিক তথ্য বিবেচনায় পানি বণ্টন করা হয়েছিল। যদিও শুধু একটি স্থান নয়, পুরো অববাহিকা বিবেচনায় নিয়ে পানিবণ্টন করা দরকার ছিল।
মালিক ফিদা এ খান বলেন, "গঙ্গার পুরো অববাহিকায় পানির সম্পূর্ণ পরিমাণ নিয়ে আমরা কখনও চিন্তা করিনি। আমরা শুধু ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ বিবেচনায় নিয়েছি এবং সে অনুযায়ী নিজেদের অংশ ভাগ করে নিয়েছি। সুতরাং আমাদের আলোচনা করতে হবে।
"আমি বলছি না যে, এখনই সবকিছু পরিবর্তন করে ফেলতে পারব, তবে আমাদের ভারত বা অন্যদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে হবে।"
