বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের পরিকল্পনা

* প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর * আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকরা * ভবিষ্যতে দেশের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিকল্প উৎস থেকে প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাসের লক্ষ্যে মানববর্জ্য, পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্য, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশ থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন দেশের গবেষকরা। প্রায় এক দশকের গবেষণায় বর্জ্য থেকে জৈব অপরিশোধিত তেল বা বায়োক্রুড উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পর এবার পরীক্ষামূলক উৎপাদনের জন্য পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রস্তাবিত পাইলট প্ল্যান্টে প্রতিদিন এক থেকে তিন টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি স্থাপনে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকরা। তাদের দাবি, প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে দেশের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিকল্প উৎস থেকে প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে পাইলট প্ল্যান্টে উৎপাদনক্ষমতা, জ্বালানির গুণগত মান, পরিশোধন ব্যয় ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা যাচাইয়ের ওপর।

গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের উদ্ভাবনী প্রকল্পের প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী এ আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) এ তথ্য জানান। প্রকল্পের গবেষকরা তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের গবেষণার অগ্রগতি, পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফল এবং দেশে বাণিজ্যিকভাবে জ্বালানি তেল উৎপাদনের সম্ভাবনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। প্রকল্পটির সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে এর বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

সংকট মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানির সন্ধান : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং সরবরাহসংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও বাজারের অস্থিরতা বেড়েছে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এ পরিস্থিতি বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় প্রচলিত জ্বালানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, দেশীয় সম্পদের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি কাজে লাগানোর গুরুত্ব বাড়ছে। বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের এ গবেষণা সেই বিবেচনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ তৈরি হয়। এসব বর্জ্যের একটি অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা না গেলে তা পরিবেশদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে কৃষিজ অবশিষ্টাংশেরও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না। এসব উপাদানকে প্রযুক্তির সাহায্যে জ্বালানি উৎপাদনের কাঁচামালে রূপান্তর করা গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে বাণিজ্যিক ব্যবহারে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তাই গবেষণাগারে পাওয়া সাফল্যকে শিল্পপর্যায়ে কার্যকর উৎপাদনে রূপ দিতে প্রয়োজন হবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই, বিনিয়োগ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিক কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করা।

১০ বছরের গবেষণায় অগ্রগতি : খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে গবেষকরা প্রায় ১০ বছর ধরে এ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের গবেষণায় ব্যবহার করা হচ্ছে 'হাইড্রোথার্মাল লিকুইফ্যাকশন' (এইচটিএল) প্রযুক্তি। এ পদ্ধতিতে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে পানির উপস্থিতিতে জৈব বর্জ্যকে তরল জ্বালানিসদৃশ পদার্থে রূপান্তর করা হয়। প্রচলিত কিছু বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিতে জৈব উপাদান থেকে মূলত গ্যাস বা অন্যান্য উপজাত পাওয়া গেলেও এইচটিএল প্রযুক্তির লক্ষ্য হলো জৈব পদার্থকে সরাসরি তরল জ্বালানির কাঁচামালে রূপান্তর করা। ফলে যথাযথভাবে প্রযুক্তিটি প্রয়োগ করা গেলে বিভিন্ন ধরনের ভেজা জৈব বর্জ্য থেকেও জ্বালানি উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে বর্জ্যের ধরন, আর্দ্রতা, জৈব উপাদানের পরিমাণ এবং প্রক্রিয়াকরণের শর্ত অনুযায়ী উৎপাদনের হার ও জ্বালানির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হতে পারে।

প্রকল্পের গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের পরীক্ষাগারে বর্জ্য থেকে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বায়োক্রুড উৎপাদনের ফল পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ডিজেলসমৃদ্ধ বায়োক্রুড উৎপাদনেও সাফল্য এসেছে। প্রধানমন্ত্রীকে গবেষণার এসব ফলাফল ও প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবহিত করেন অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান। গবেষকদের মতে, বায়োক্রুড উৎপাদনের এ অগ্রগতি প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরীক্ষাগারে পাওয়া উৎপাদনের হারকে সরাসরি বাণিজ্যিক পর্যায়ের উৎপাদন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বড় পরিসরে একই ফল পাওয়া যায় কি না, উৎপাদিত তেলের মান কতটা স্থিতিশীল থাকে এবং তা প্রচলিত জ্বালানি পরিশোধনব্যবস্থায় কীভাবে ব্যবহার করা যাবে— এসব বিষয় আরও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

পাইলট প্ল্যান্টে প্রতিদিন প্রক্রিয়াকরণ হবে তিন টন বর্জ্য : গবেষণার পরবর্তী ধাপে প্রতিদিন এক থেকে তিন টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম একটি পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ প্ল্যান্টে পরীক্ষাগারের প্রযুক্তিকে তুলনামূলক বড় পরিসরে প্রয়োগ করে এর কার্যকারিতা, উৎপাদনব্যয় এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট গবেষকদের হিসাবে, পাইলট প্ল্যান্ট স্থাপনে আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এটি কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ রাখার পরিবর্তে শিল্প পর্যায়ে নেওয়ার প্রস্তুতিমূলক একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, যন্ত্রপাতির সক্ষমতা, জ্বালানি উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং পরিচালন ব্যয় সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে।

পাইলট প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রথমত বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন উৎসের বর্জ্যের গঠন এক রকম নয়। মানববর্জ্য ও পয়ঃশোধনাগারের বর্জ্যে আর্দ্রতা এবং অন্যান্য উপাদানের পরিমাণ এক ধরনের; রান্নাঘরের বর্জ্য ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের বৈশিষ্ট্য আবার আলাদা। তাই কোন ধরনের বর্জ্য থেকে কতটা বায়োক্রুড পাওয়া যায় এবং কোন উপাদানগুলো সবচেয়ে কার্যকর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব, তা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, উৎপাদিত বায়োক্রুডের গুণগত মান পরীক্ষা করে দেখতে হবে। বায়োক্রুড উৎপাদিত হলেই তা সরাসরি যানবাহন বা শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি হয়ে যায় না। এর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিশোধন, পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রয়োজনীয় মান যাচাই করতে হতে পারে। উৎপাদিত তেল থেকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি পেতে অতিরিক্ত কী পরিমাণ জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য উপকরণ প্রয়োজন হবে, সেটিও হিসাব করতে হবে।

তৃতীয়ত, প্ল্যান্ট পরিচালনায় প্রতি টন বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের খরচ, উৎপাদিত তেলের পরিমাণ, বর্জ্য পরিবহন, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং অবশিষ্ট পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ব্যয় নিরূপণ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

আমদানি করা তেলের বিকল্প হওয়ার সম্ভাবনা : গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিকল্প উৎস থেকে প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বছরে আনুমানিক সাড়ে ৬ হাজার কোটি থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে বলে তারা আশা করছেন। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে দেশের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে। দেশীয়ভাবে উৎপাদিত বিকল্প জ্বালানি সেই চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

একই সঙ্গে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে গবেষকদের উল্লিখিত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পরিমাণ একটি সম্ভাবনাভিত্তিক হিসাব। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কত পরিমাণ বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, সেখান থেকে প্রকৃতপক্ষে কতটা ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি পাওয়া যাবে এবং সেই জ্বালানি আমদানিকৃত তেলের কতটা কার্যকর বিকল্প হতে পারবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ পরীক্ষার ফলাফলের ওপর। এ ছাড়া বায়োক্রুড পরিশোধনের ব্যয়, প্রযুক্তির জ্বালানি দক্ষতা এবং বড় পরিসরে উৎপাদনের আর্থিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদিত তেলের পরিমাণ নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ায় নিট জ্বালানি লাভ, পরিবেশগত প্রভাব এবং উৎপাদন ব্যয়ের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হবে। পাইলট প্ল্যান্টে এসব তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া গেলে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের জন্য বিনিয়োগ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও মিলতে পারে সুফল : জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি এ প্রযুক্তি দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। নগর এলাকায় গৃহস্থালি বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনের পর জমি ও আশপাশে পড়ে থাকা অবশিষ্টাংশও অনেক সময় যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয় না। এসব বর্জ্যের উপযোগী অংশ সংগ্রহ করে জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহার করা গেলে একদিকে বর্জ্যের পরিমাণ ও দূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে তা থেকে অর্থনৈতিক মূল্যও পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াকরণের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে মানববর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্যের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি, জীবাণু নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে প্রক্রিয়াকরণের পর অবশিষ্ট কঠিন ও তরল পদার্থ নিরাপদে ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা না থাকলে নতুন পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গবেষকদের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তায় প্রযুক্তিটি সফলভাবে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়া গেলে দেশের জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় জ্বালানি শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তিকে শিল্পে রূপান্তরের পাশাপাশি দেশীয় গবেষণার ফল অর্থনীতিতে কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হবে।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ : প্রস্তাবিত পাইলট প্ল্যান্ট বাস্তবায়নে অর্থায়নের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। বর্জ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, উপযুক্ত স্থান নির্বাচন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রযুক্তিগত মান যাচাই এবং উৎপাদিত জ্বালানির ব্যবহারযোগ্যতা নির্ধারণ— প্রতিটি ধাপেই পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় ও সম্ভাব্য আয়, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় সম্পর্কে স্বচ্ছ মূল্যায়ন করতে হবে। পাইলট পর্যায়ে অর্জিত ফলাফল ইতিবাচক হলে পরবর্তী ধাপে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানো এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ আকর্ষণের পথ তৈরি হতে পারে। প্রকল্পটির প্রদর্শনী পরিদর্শনকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) পাবলিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাছুদ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতার আশ্বাসের পর এখন প্রকল্পটির পরবর্তী ধাপ হলো প্রস্তাবিত পাইলট প্ল্যান্টের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও কারিগরি প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া। দীর্ঘদিনের গবেষণার ফল বাস্তব উৎপাদনে কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ধারণে এ প্ল্যান্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া গেলে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিবেশবান্ধব সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি সম্ভাবনাময় নতুন পথ হয়ে উঠতে পারে।