ফ্লাইট বাতিল, বিপাকে হাজার হাজার প্রবাসী কর্মী

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক আছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। নিহতের পাশাপাশি আরও চার বাংলাদেশি রিয়াদের এক?টি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সৌদি প্রবাসীদের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সরকার এ হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে নিহত দুই বাংলাদেশির পরিবারের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আহত সবার দ্রুত ও পূর্ণ সুস্থতা কামনা করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করে এবং বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সংহতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

গত শনিবারের ওই হামলায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। বর্বর এ হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী কর্মী। পাশাপাশি অন্যান্য দেশের যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক। অন্যদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। আহতদের রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহত বাংলাদেশিদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

২ বাংলাদেশি নিহত, আইসিইউতে ৪ জন; পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত চার বাংলাদেশি রিয়াদের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গতকাল রোববার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, সৌদির বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন, তারা সৌদির কিং খালেদ হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। আমরা সবার পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা করছি। শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশি যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিচয় আমরা জানার চেষ্টা করছি। কোন জেলা থেকে তারা গেছেন, দেশে তাদের পরিবার আছে; তাদের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করছি। আগেও যখন হুথিরা আক্রমণ করেছিল, সেখানে কিন্তু বাংলাদেশের একজন নিহত হয়েছিল। এখন দুইজন নিহত হলেন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করছি, আল্লাহতায়ালা তাদেরকে যেন বেহেশত নসিব করেন এবং আশা করছি যেন আর কোনো খারাপ খবর আমরা শুনতে পাব না।

প্রতিমন্ত্রী ব?লেন, আমরা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিগত দিনে ১৪ জন বাংলাদেশিকে হারিয়েছি এরইমধ্যে। আমরা আশা করব যে, এই বিপর্যয় বন্ধ হবে, এই আক্রমণ বন্ধ হবে। এ ধরনের মৃত্যু আসলে মেনে নিতে অত্যন্ত কষ্টকর। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সবসময় একটি কথা বলেছেন, আমাদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে যে আমাদের বিশাল যে জনগোষ্ঠী বাংলাদেশি ভাই-বোনরা যারা বিদেশে চাকরি করেন, যারা আমাদের রেমিট্যান্সযোদ্ধা, তাদের নিরাপত্তা, তাদের দেখভাল করাটা আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। আমরা সেটাই করার চেষ্টা করছি এবং আমাদের মিশন ওখানে আরও যারা বাংলাদেশিরা আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, হতাহতের অবস্থা জানার চেষ্টা করছে এবং যারা বাংলাদেশি ভাইয়েরা আছেন তারা যতদূর সম্ভব যাতে নিরাপদে থাকতে পারেন, সে নির্দেশনা আমাদের মিশনকে দেওয়া হচ্ছে।

যারা মারা গেছেন তাদের লাশ এবং যারা আহত আছেন আইসিইউতে আছেন তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারের কোনো নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আছে কিনা-জানতে চাইলে শামা ওবায়েদ বলেন, মাত্র দুর্ঘটনাটা ঘটেছে। আমরা অবশ্যই সৌদি সরকারের সঙ্গে এবং আমাদের যারা বাংলাদেশি ভাইয়েরা ওখানে বিভিন্ন কোম্পানিতে তারা চাকরি করেন, সেই কোম্পানির মালিকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সব ফরমালিটিজ কমপ্লিট করে তাদের মরদেহ যাতে তাদের পরিবারের কাছে শিগগিরই সম্ভব দেশে ফেরত আনা যায়, সে ব্যবস্থাটা আমরা অবশ্যই করব।

বিমানবন্দরে অপেক্ষায় আড়াই হাজার যাত্রী : সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ঢাকা-রিয়াদ আকাশপথের যোগাযোগ। গত শনিবার রাত থেকে গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত রিয়াদগামী সাতটি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে পৌঁছানো প্রবাসী কর্মীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। কারো গন্তব্য কর্মস্থল, কারো ফেরার কথা পরিবারের কাছে। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সবার যাত্রাই আটকে গেছে অনিশ্চয়তায়। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, সৌদিয়া, রিয়াদ এয়ার ও শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটের প্রায় আড়াই হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন।

জানা গেছে, যাত্রীদের কেউ বাসে, কেউ ব্যক্তিগত পরিবহনে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। এখানে এসে ফ্লাইট বাতিলের খবর পেলে তাদের আবার নতুন করে যাত্রার পরিকল্পনা করতে হয়। অধিকাংশ প্রবাসীই সৌদির ট্রাভেল এজেন্সি থেকে টিকিট কেটে এসেছেন। তারা জানেন না কীভাবে তাদের টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করে কবে সৌদিতে ফিরবেন। ফ্লাইট বাতিলের কারণে অনেকেই চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন, ভুগছেন অতিরিক্ত যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচ এবং পরিবারের কাছে ফেরার অনিশ্চয়তায়।

রোববার দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে দেখা যায়, রিয়াদগামী ফ্লাইটের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। কেউ টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে নিয়ে এয়ারলাইনসের কাউন্টারে খোঁজ নিচ্ছেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পরবর্তী করণীয় জানার চেষ্টা করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব প্রবাসীর অনেকেই জানেন না, কবে আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সুযোগ পাবেন কিংবা টিকিটের তারিখ পরিবর্তন করতে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ফ্লাইট বাতিলের পর বিকল্প যাত্রার নিশ্চয়তা না পেয়ে তাদের চোখেমুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ। বিদেশে কর্মস্থলে সময়মতো ফিরতে না পারার আশঙ্কার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন করে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার খরচের চাপ।

বিমানবন্দরের বহির্গমন টার্মিনালের বাইরে রিয়াদ প্রবাসী শাহ আলম বলেন, রিয়াদে যাওয়ার জন্য বিমানের টিকিট কেটে আগস্টে দেশে এসেছিলাম। রোববার দুপুরে আমার ফ্লাইট ছিল। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। দেশের বাড়ি কেরানীগঞ্জের রোহিতপুর থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার কাজ আছে, সময়মতো ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শরীফ উদ্দিনেরও যাওয়ার কথা সৌদি আরবের রিয়াদে। ইন্ডিগো এয়ারলাইনসের টিকিট কেটেছেন তিনি। মুম্বাই হয়ে রিয়াদে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে যাত্রা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, ভারতের মুম্বাই হয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখন শুনছি, মুম্বাইয়ে যাদের ট্রানজিট, তাদের বোর্ডিং দেওয়া হচ্ছে না, মুম্বাই থেকে নাকি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন টিকিট কেটেও যেতে পারব কি না, সেই নিশ্চয়তা নেই। সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে বিকল্প পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। এখন সেই পথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ম্যানেজার (ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট) স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব বলেন, বাতিল হওয়া সাতটি ফ্লাইটে মোট ২ হাজার ৫৩২ জন যাত্রীর রিয়াদে যাওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে অবহিত করছে। যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী যাত্রার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে ধৈর্য ও সহমর্মিতার সঙ্গে অপেক্ষা করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

এর আগে, শনিবার মধ্যরাতে রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের মিসাইল হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে বাংলাদেশি ছাড়াও মিশর, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা রয়েছেন। হামলার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে রিয়াদ বিমানবন্দরে এ নিয়ে অন্তত চারবার হামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার এক পাইলটসহ তিন সৌদির নাগরিক নিহত হন।

সৌদি আরবে যা ঘটেছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়—ট্রাম্প : সৌদি আরবে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনাকে 'গ্রহণযোগ্য নয়' বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি আছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এ হামলার জন্য ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীকে দায়ী করা হচ্ছে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, এ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন। ট্রাম্প বলেন, 'সৌদি আরবে যা ঘটেছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।' সৌদিতে হামলার ঘটনায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মার্কো রুবিও লিখেছেন, সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর তীব্র নিন্দা জানায় যুক্তরাষ্ট্র। এই নিন্দনীয় হামলাগুলো নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ। এগুলো এখনই বন্ধ হতে হবে। রুবিও জানান, রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। ইয়েমেন-বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গও সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি গতকাল বলেছেন, সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোয় প্রাণঘাতী হামলা হুতিদের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটানোর শামিল। এক বিবৃতিতে হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে, সহিংসতার চক্রকে দীর্ঘায়িত করে এবং ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তোলে।

রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবারের হামলা ছিল চলতি সপ্তাহে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় হামলা। বিস্ফোরণের পর বিমানবন্দরের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা আহত যাত্রীদের মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের ৪০৩ নম্বর গেটে থাকা এক যাত্রী এএফপিকে জানান, তার চোখের সামনেই ৪০১ নম্বর গেটে হামলা হয়। এরপর যাত্রীরা প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। হুতিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি হামলার দায় স্বীকার করে দাবি করেছেন, ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ নিতে এই হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে হুতিরা সৌদি আকাশসীমাকে সামরিক অভিযানক্ষেত্র ঘোষণা করে বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছিল। তবে শনিবারের হামলার আগে সৌদি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কোনো সংকেত দেয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

বাতিল ৩১৬ ফ্লাইট : ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ফ্লাইটরাডার২৪-এর ১০ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ বিমানবন্দরে ১৫৫টি আগমনী ও ১৬১টি বহির্গামী ফ্লাইট বাতিল দেখানো হয়। সব মিলিয়ে বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা ৩১৬। একই সময়ে ২২২টি ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। নিরাপত্তার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বিকল্প বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের দুটি ফ্লাইট, বিজি-৩৩৯ ও বিজি-৩৪০, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে। এ ছাড়া ১১ অক্টোবর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রকাশিত সূচিতে রিয়াদগামী সৌদি এয়ারলাইন্সের এসভি-৮০৫ এবং রিয়াদ এয়ারের আরএক্স-৭৬৪ ফ্লাইটও বাতিল দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ওই দিনের সূচিতে ঢাকা থেকে রিয়াদগামী অন্তত তিনটি ফ্লাইট বাতিল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইতিহাদ এয়ারওয়েজ ৯ অক্টোবর আবুধাবি-রিয়াদ রুটে ছয়টি এবং ১০ অক্টোবর আরও দুটি ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দেয়। ভারতের আকাসা এয়ার আগেই দুটি নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করেছে। এয়ার ইন্ডিয়া, ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেসও রিয়াদগামী সেবা স্থগিত করে। জার্মানির লুফথানসা গ্রুপ ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদের ফ্লাইট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। ফ্লাইদুবাই, কাতার এয়ারওয়েজ ও কুয়েত এয়ারওয়েজের কার্যক্রমও বিঘ্নিত হয়েছে। তবে দেশভিত্তিক সব বাতিল ফ্লাইটের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কঠোর প্রতিক্রিয়া : হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেছেন, এ ধরনের হামলায় নিরীহ মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। কাতার হামলাকে সৌদি সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। বাহরাইন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলোর নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস নিজ নিজ নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর এবং আশপাশের এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। জাপানও বেসামরিক স্থাপনায় হুতি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তা সংস্থা সৌদি আকাশসীমায় উড্ডয়নসংক্রান্ত ঝুঁকির সতর্কতা সম্প্রসারিত করেছে। এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হামলাকে যুদ্ধাপরাধ আখ্যা দিয়ে কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রিয়াদের হামলার কয়েক ঘণ্টা পর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার তথ্য জানিয়েছে জোট। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি চলতি বছরের জুলাইয়ে ভেঙে পড়ার পর সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত আবার তীব্র হয়েছে। নতুন হামলায় বেসামরিক বিমান চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যও ঝুঁকিতে পড়েছে। রিয়াদে নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিনিয়োগ সম্মেলনগুলো আয়োজনের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলেও অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।