গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনা বন্ধ করছে সরকার

প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ১২ টাকা ৮০ পয়সায় কিনে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করে; যার ফলে প্রতি ইউনিটে সরকারকে ৪ টাকা ৩০ পয়সা ভর্তুকি দিতে হয়। বিপিডিবি'র ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের সার্বিক গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা। বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির চাপ কমাতে নতুন নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। নতুন এই নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য আর কোনো নতুন চুক্তি করবে না সরকার। একই সঙ্গে, গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দর নির্ধারিত রয়েছে— এমন বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির মেয়াদও আর বাড়ানো হবে না।

গত ৬ অক্টোবর অর্থ বিভাগকে পাঠানো এক চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ কেনা ও বিক্রির দামের মধ্যকার ব্যবধানের কারণে তৈরি হওয়া আর্থিক চাপ কমাতেই এই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তিন বছরের সংস্কার রোডম্যাপের অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়নে এরইমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে কৃষি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় ইঙ্গিত মিলেছে যে, সারের দামের ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে তুলে নিয়ে বাজারভিত্তিক দাম নির্ধারণের বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ নিয়েও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবছে সরকার।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, সরকারি সারের ভর্তুকির প্রায় অর্ধেকই পান বড় কৃষকরা, অথচ ক্ষুদ্র কৃষকদের ভাগে জোটে মাত্র ১৩ শতাংশ সহায়তা।

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের বৈঠক সামনে রেখে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমাতে নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে অর্থ বিভাগকে এ ব্যাখ্যা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর আগে অর্থ বিভাগ জানতে চেয়েছিল, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমাতে সরকার কী কী উদ্যোগ নিয়েছে।

ব্যাংককে ১২-১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে আইএমএফুবিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন। সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আইএমএফের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা করবে বলে অর্থ বিভাগের সূত্রে জানা গেছে। তবে বৈঠকের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে একটি নতুন ঋণসহায়তা কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করছে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে এটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সর্বশেষ নিয়মিত প্রতিনিধিদল গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সফর করে। সফরকালে আগের ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন একটি কর্মসূচি চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ গড়ে ১২ টাকা ৮০ পয়সায় কিনে ৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করে; যার ফলে প্রতি ইউনিটে সরকারকে ৪ টাকা ৩০ পয়সা ভর্তুকি দিতে হয়। বিপিডিবি'র ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের সার্বিক গড় দাম ছিল প্রতি ইউনিট ১৪ টাকা ৫৬ পয়সা।

বিপিডিবির সূত্র জানিয়েছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৩ টাকা ৫৭ পয়সায় এবং ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে ১৪ টাকা ৮৬ পয়সায় কেনা হচ্ছে। আরও কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও গড় উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

অর্থ বিভাগকে পাঠানো চিঠিতে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে বিদ্যুতের ট্যারিফ সমন্বয় করেছে। পাশাপাশি, গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত ট্যারিফের চেয়ে বেশি দরে নতুন বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুমোদন না করার নীতি নেওয়া হয়েছে। গড় ট্যারিফের চেয়ে বেশি দর থাকা কোনো চুক্তির মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে না।

বিদ্যুৎ বিভাগ আশা করছে, এসব পদক্ষেপের ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির প্রয়োজন কমবে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে তা আরও কমবে। তবে এসব উদ্যোগের ফলে ভর্তুকি বাবদ কত টাকা সাশ্রয় হবে, চিঠিতে তার কোনো হিসাব উল্লেখ করা হয়নি।

বিদ্যুৎ ক্রয়নীতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, সরকারি মালিকানাধীন কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম ইতিমধ্যে গড় দরের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। অন্য কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে একই পদ্ধতি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দামের অস্থিরতার মধ্যে ভর্তুকি কমানো একটি নীতিগত চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক দায় কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের জন্য দাম সাশ্রয়ী রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস ইনস্টিটিউটের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, গড় লেভেলাইজড ট্যারিফের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি ভর্তুকি কমাতে এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ব্যয় হ্রাস করতে সহায়তা করবে। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ কমতে পারে, যা গ্রাহকদের জন্য সুফল বয়ে আনবে।

তবে তিনি বলেন, কাজটি সহজ হবে না। বিভিন্ন ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের লেভেলাইজড ট্যারিফে পার্থক্য রয়েছে। একই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যেও এ পার্থক্য থাকতে পারে। গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং একটি কেন্দ্র পুরো সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে কি না, তার ওপরও ব্যয় নির্ভর করে। তাই গড় ট্যারিফ নির্ধারণ একটি কারিগরি প্রক্রিয়া, যার জন্য গ্রহণযোগ্য ও সুস্পষ্ট পদ্ধতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, 'সবকিছু যথাযথভাবে করা গেলে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ব্যয় কমবে, ভর্তুকি হ্রাস পাবে এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ন্ত্রণে রাখার কিছু সুযোগ তৈরি হবে।'

সরকারের সারের ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পান বড় কৃষকরা। অন্যদিকে, দেশের মোট কৃষকের ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক হলেও তারা ভর্তুকির মাত্র ১৩ শতাংশ পান। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ উন্নয়নবিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষিজমির প্রায় ২০ শতাংশের মালিক বড় কৃষকরা। কৃষকদের আয়ের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করলে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ কৃষক সরকারের সরাসরি সহায়তার এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি পান। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পান প্রায় অর্ধেক সুবিধা। অর্থাৎ, সারসহ ব্যয়বহুল ভর্তুকি কর্মসূচির সুবিধার অসমানুপাতিক বড় অংশ পাচ্ছেন বড় কৃষকরা।

গত পাঁচ বছরে সারের ভর্তুকি প্রায় চার গুণ বেড়ে ২৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক ধীরে ধীরে সারের দাম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা তুলে দিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের দিকে যাওয়ার সুপারিশ করেছে।

পাশাপাশি, বিএনপি সরকারের আমলে চালু হওয়া 'কৃষক কার্ডের' সঙ্গে ইলেকট্রনিক ভাউচার যুক্ত করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

কৃষি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা থেকে জানা গেছে, সরকার বিশ্বব্যাংকের সুপারিশগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিক্রির সময় ভর্তুকি না দিয়ে সারের প্রকৃত দামেই তা বিক্রি করা হবে। এর পরিবর্তে যোগ্য কৃষকদের কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।

এ ব্যবস্থা কার্যকর করতে সরকার কৃষকদের একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করছে। এতে প্রতিটি কৃষকের কতটুকু জমি রয়েছে, কতটুকু জমিতে তারা চাষাবাদ করেন, কী ধরনের ফসল উৎপাদন করেন এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।