পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সাড়া মিলছে

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

পরিচ্ছন্ন বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সাড়া মিলছে। রাজধানীর প্রবেশপথ আমিনবাজারে দীর্ঘদিনের বর্জ্যের ভাগাড় সরিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন বাগান 'রূপান্তর'। প্রায় দুই দশক ধরে জমে থাকা ৩০ ফুট উঁচু বর্জ্যের স্তূপ এখন সবুজে ঘেরা। গতকাল রোববার বাগানটির উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ উদ্যোগকে দেশের অন্য ৬৩ জেলার প্রশাসকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে আমিনবাজারের এই সাফল্য ধরে রাখা, মহাসড়কের দুই পাশের ফাঁকা জায়গা সবুজায়নের আওতায় আনা এবং বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও শিল্পকারখানার মালিকদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় আমিনবাজারে নিমগাছ রোপণের মাধ্যমে 'রূপান্তর' প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি বলেন, পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে একটি এলাকাকে মানুষের কল্যাণে সুন্দরভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব। আমিনবাজারের উদ্যোগ দেশের অন্য জেলাগুলোর প্রশাসনের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। এ সাফল্যের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রাজধানীর পরিবেশদূষণ কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। আমিনবাজারের চার কিলোমিটারে সীমাবদ্ধ না থেকে আশপাশের শিল্পকারখানা ও ফাঁকা জায়গাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সবুজায়নের আওতায় আনার নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফলে বর্জ্যের ভাগাড়কে বাগানে রূপান্তরের এই উদ্যোগ এখন আরও বিস্তৃত পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে একটি এলাকাকে মানুষের কল্যাণে কীভাবে সুন্দরভাবে পরিবর্তন করা যায়, আমিনবাজারের এই উদ্যোগ তার বড় প্রমাণ।

আপনারা যারা এলাকাবাসী, তারা জানেন দুই মাস আগে এই জায়গাটার কী অবস্থা ছিল। আর আজকে প্রায় দুই মাস পরে এই জায়গাটির কী পরিবর্তন হয়েছে। এই চার কিলোমিটার এলাকার মানুষের কাছে জায়গাটি দেখতে ভালো লাগার পাশাপাশি ভালো পরিবেশে শ্বাস নেওয়াও এখন সহজ হয়েছে।' তিনি বলেন, সরকার উদ্যোগ নিয়ে এলাকাটিকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছে। এখন এই সৌন্দর্য ধরে রাখার দায়িত্ব এলাকাবাসীকেও নিতে হবে। জনগণ সরকারকে সহযোগিতা করলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে সমাধান করা সম্ভব হবে। এতে মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে।

বর্জ্যের স্তূপ থেকে সবুজের সমারোহ : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই দশক ধরে আমিনবাজার এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলা হতো। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় সেখানে বর্জ্যের স্তূপ প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে ওঠে। রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের পাশে এমন পরিস্থিতি পরিবেশের পাশাপাশি নগরীর সামগ্রিক সৌন্দর্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছিল। গত জুলাই মাসে মানিকগঞ্জের সিংগাইরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বর্ষাকালীন মহড়া পরিদর্শনে যাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমিনবাজারের এই বর্জ্যের ভাগাড় ও দুর্গন্ধ প্রত্যক্ষ করেন। বিষয়টি নজরে আসার পর তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের তত্ত্বাবধানে সাভার উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার সহযোগিতায় বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু হয়।

প্রায় তিন মাসের প্রচেষ্টায় জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরিয়ে জায়গাটিকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। শুধু আবর্জনা অপসারণেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; জমি প্রস্তুত, মাটির সুরক্ষা, পানি নিষ্কাশন এবং সবুজায়নের জন্যও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। একসময়ের দুর্গন্ধময় বর্জ্যস্তূপকে পরিকল্পিত বাগানে পরিণত করার পুরো প্রক্রিয়ায় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বিত ভূমিকা ছিল। বর্জ্য অপসারণের পর জমি প্রস্তুত করে মাটির সুরক্ষায় প্যালাসাইডিং করা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ২০টি সারফেস ড্রেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাজ পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে সার্ভিস শেড। মাটির ক্ষয়রোধে লাগানো হয়েছে নেপিয়ার, দুর্বা ও বিন্নাসহ বিভিন্ন ধরনের ঘাস। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বাগানটির পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি জমির ব্যবহার উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

সাড়ে ছয় হাজারের বেশি গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ : প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ থেকে ২৫ মিটার চওড়া এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে 'রূপান্তর' বাগান। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ রোপণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাগানটিতে ১ হাজার ৫০টি নিমগাছ, ৩ হাজার ৮১৫টি সুপারি, ৬০টি তালগাছ, ৬৫০টি মাধবীলতা, ৪৫টি সিজিয়াম এবং ৭০০টি রঞ্জনগাছ লাগানো হয়েছে। সব মিলিয়ে রোপণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৫৮৫টি গাছ ও শোভাবর্ধক উদ্ভিদ। বাগানটিকে শুধু দৃষ্টিনন্দন করে তোলাই নয়, মহাসড়কের পাশের পরিবেশ উন্নয়ন এবং সবুজের পরিমাণ বাড়ানোও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর ফলে এলাকাটিতে সবুজ আচ্ছাদন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বর্জ্য জমে থাকা জায়গাকে নতুন কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার অংশ হিসেবে সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ২ কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল এবং ১ কিলোওয়াটের উইন্ড টারবাইনের মাধ্যমে মোট ৩ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাতে বাগানটির আলোকসজ্জার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১২০টি বৈদ্যুতিক বাতি।

এসব উদ্যোগের ফলে আমিনবাজারের এই অংশটি আগের চেহারা থেকে অনেকটাই বদলে গেছে। রাজধানীতে প্রবেশের পথে দীর্ঘদিন ধরে যে বর্জ্যের স্তূপ চোখে পড়ত, তার পরিবর্তে এখন দেখা যাচ্ছে সবুজে ঘেরা একটি পরিকল্পিত এলাকা। তবে এই পরিবর্তনের সুফল দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

চার কিলোমিটারের বাইরে সবুজায়নের নির্দেশ : উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শুধু 'রূপান্তর' বাগানের সাফল্যের প্রশংসা করেই থেমে থাকেননি; উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। ঢাকা জেলা প্রশাসককে তিনি মহাসড়কের দুই পাশে থাকা মিল-কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পাশের ফাঁকা জায়গাগুলোকে সবুজায়নের আওতায় আনার পরামর্শ দেন। এসব জায়গার পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পরিবেশ রক্ষার কাজে যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্যদেরও জেলা প্রশাসনকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন। তাঁর লক্ষ্য, বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলকে সবুজ ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা। এ জন্য শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন বলে তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।

পরিবেশ রক্ষার কাজে নাগরিকদের দায়িত্বের বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, সরকার কোনো এলাকা পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করে গড়ে তুললেও সেটি রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। মানুষ সচেতনভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অংশ নিলে এবং যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করলে পরিবেশের ক্ষতিকর সমস্যাগুলো সমাধান করা সহজ হবে। অন্যদিকে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নিয়মিত তদারকি ও বর্জ্য ফেলার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্য জেলার প্রশাসকদের জন্য দৃষ্টান্ত : আমিনবাজারের এ উদ্যোগকে দেশের অন্য ৬৩ জেলার জেলা প্রশাসকদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ কাজের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, অন্য জেলার প্রশাসকরাও এ ধরনের পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হবেন। দীর্ঘদিনের বর্জ্যের স্তূপ অপসারণ করে একটি এলাকাকে সবুজায়নের আওতায় আনার এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তবে এ ধরনের প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যনির্ভর করবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা, গাছের পরিচর্যা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসম্পৃক্ততার ওপর। আমিনবাজারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের অন্যান্য শহর ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে জমে থাকা বর্জ্য অপসারণ, পতিত জমির পরিকল্পিত ব্যবহার এবং সবুজায়নের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন, দায়িত্ব বণ্টন এবং নিয়মিত তদারকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রাজধানীর প্রবেশপথে 'রূপান্তর' বাগান এখন পরিচ্ছন্ন ও সবুজ পরিবেশ গড়ার একটি দৃশ্যমান উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যে বার্তা দিয়েছেন, তার মূল কথা হলো— পরিকল্পনা, সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সমস্যারও পরিবর্তন সম্ভব। এখন সেই পরিবর্তন ধরে রাখা এবং একই ধরনের উদ্যোগ অন্য এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়াই হবে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।