রামপালে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাগেরহাটের রামপালে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছেই বিদ্যমান জমি ব্যবহার করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে না।
এর আগে ২০১২ সালে রামপালে ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। জমিটি ব্লক-এ ও ব্লক-বি; এই দুই ভাগে বিভক্ত। ব্লক-এ-তে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি লিমিটেডের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ব্লক-বি এখনও পিডিবির অধীনে রয়েছে। সেখানে জমি উন্নয়ন ও প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজও এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। সেই জমি ব্যবহার করেই দেশের সবচেয়ে বড় এই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে যৌথ উদ্যোগেই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। তবে ২০১০ সালের বিশেষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আইন (২০২১ সালে সংশোধিত) বাতিলের পর সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মে মাসে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ব্লক-বি'র ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। সমীক্ষায় বলা হয়, জমি উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় তুলনামূলক কম হবে। এতে নির্মাণ ব্যয় ও বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশও করা হয়।
প্রস্তাব অনুযায়ী, রামপালের ব্লক-বি-তে প্রায় ৯১৮ একর জমিতে গড়ে তোলা হবে কেন্দ্রটি। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ কাছের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কমপ্লেক্সের বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার কথা রয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাব সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সবুজায়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে প্রকল্পটি। এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই অনুমোদন পাওয়া গেলে সরকারি আদেশ জারি করা হবে।
প্রাথমিকভাবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ বাড়বে। তবে এ প্রকল্পের অর্থ এই নয় যে, বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হবে বা এর পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হবে।
৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণে আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হলে প্রতি মেগাওয়াটের বিপরীতে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নির্ভর করবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ, কেনাকাটার ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ এবং যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের খরচের ওপর।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কয়লাভিত্তিক পরিকল্পনা থেকে সৌরবিদ্যুতের দিকে অগ্রসর হওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে একটি বড় পরিবর্তন। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত সময়ে মান বজায় রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রকৌশল অনুষদের সাবেক ডিন ও অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বাংলাদেশে জমির স্বল্পতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎস বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনায় সরকারি জমি ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ ইতিবাচক।
বিদ্যমান জমি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করলে প্রকল্পের কিছু উন্নয়ন ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পটি কতটা লাভজনক হবে, তা বোঝার জন্য সরকারকে বিস্তারিত ব্যয়, কেনাকাটার ব্যবস্থা, অর্থায়ন কাঠামো এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের সম্ভাব্য খরচ প্রকাশ করতে হবে।
নির্মাণকাজের সময়সূচি, কেনাকাটার প্রক্রিয়া এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর নির্ধারিত সময় এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। প্রকল্পটির অবস্থানের কারণে পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রামপাল সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থিত। সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনগুলোর একটি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় সরাসরি বায়ুদূষণ অনেক কম হয়। তবে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও জমির ব্যবহার, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, প্রাণীদের আবাসস্থল এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নির্মাণকাজের সময় এসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ পরিবেশ ও সুন্দরবনের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে সে জন্য সৌরপ্যানেল ও ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো পরিকল্পনার পুরো জীবনচক্রে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সরকারের উচিত প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র, প্রকল্প এলাকার সীমানা এবং সংরক্ষিত এলাকার সঙ্গে এর দূরত্ব জনসমক্ষে প্রকাশ করা।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি বলেন, রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পরও পরিবেশগত দায়িত্ব শেষ হবে না। সৌরপ্যানেল, ইনভার্টার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। একপর্যায়ে এসব যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন, পুনর্ব্যবহার অথবা নিরাপদে অপসারণের প্রয়োজন হবে। সৌরপ্যানেল সাধারণত প্রায় ২৫ বছর বা তার বেশি সময় ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে, ব্যাটারির আয়ুষ্কাল নির্ভর করে এর প্রযুক্তি ও ব্যবহারের পরিবেশের ওপর। রামপাল প্রকল্পে ব্যাটারি যুক্ত করা হলে সরকারকে এর প্রযুক্তি, প্রতিস্থাপনের সময়সূচি এবং মেয়াদ শেষে ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা স্পষ্ট করতে হবে। ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ও বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব কারা পালন করবে, তাও নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি এসব কাজের সম্ভাব্য ব্যয়ও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
প্রস্তাবিত ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিদ্যমান জমি ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে পারে। তবে প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে ব্যয়ের স্বচ্ছতা, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য সংযোগ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থার ওপর।
