জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার হচ্ছে

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঘিরে ঢাকা-টোকিও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, বেসামরিক বিমান চলাচল ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের অর্জন, ভবিষ্যৎ সহযোগিতার অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দিকনির্দেশনা তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের কথা রয়েছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফর সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা-সংক্রান্ত প্রায় আটটি দলিল চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। তবে আলোচনা ও প্রস্তুতি শেষ হওয়ার ওপর নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতটি দলিলে সই হবে। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, 'আমরা আশা করছি, সফরকালে এসব সমঝোতা স্মারকের অনেকগুলোই সই হবে।' তার মতে, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের পণ্যের জন্য জাপানের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

সফরটিকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে জাপানের শিল্প-অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সংযোগ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত খাতগুলোতে সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ সফর জাপানের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে নতুন গতি সঞ্চারের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকগুলো উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত খাতগুলোতে সহযোগিতার আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।'

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গুরুত্ব : সমঝোতা স্মারক সইয়ের পাশাপাশি চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি সই হওয়া বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে। চুক্তির সুফল কাজে লাগানো, বাংলাদেশের পণ্যের জাপানি বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদারের মাধ্যমে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। এছাড়া জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সম্ভাবনা, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এবং বাংলাদেশের শিল্প খাতে জাপানি বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করবেন। তাঁর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধি এবং জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকও রয়েছে।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বৈঠকে উন্নয়ন সহযোগিতা, অর্থায়ন এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।

অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের মাঝারি আকারের কোম্পানি ও বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে স্থানীয় সরবরাহকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাপানি বিনিয়োগের সুফল পাবে। একই সঙ্গে উৎপাদন পদ্ধতি, মান নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়বে।

অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়ন আলোচনায় : বাংলাদেশে জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র অবকাঠামো। মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী অবকাঠামো উন্নয়নসহ একাধিক বড় প্রকল্পে জাপান সহায়তা করছে। তবে ঢাকার এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের ব্যয় ৮৩ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়নের শর্ত এবং ঋণের সুদের হার নিয়ে আলোচনার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ব্যয় বৃদ্ধি ও জাপানি ঋণের সুদের হার কমানোর বিষয়ে আলোচনা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা চেয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে। তবে আলোচনা শুধু মেট্রোরেল প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তিনি বলেন, 'আমরা সব দেশ থেকেই কম সুদে ঋণ পেতে চাই।' তাঁর ভাষ্য, বৈশ্বিক অর্থায়নব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিভিন্ন বাস্তবতা ঋণের শর্ত এবং আলোচনার ফলাফলকে প্রভাবিত করে।

২০১৪ সালে চালু হওয়া 'বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট' বা 'বিগ-বি' উদ্যোগ অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে সংযোগ তৈরির একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। অধ্যাপক চৌধুরীর মতে, মাতারবাড়ী ও আড়াইহাজারে অবকাঠামো বিনিয়োগের সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের কার্যকর সংযোগ তৈরি করা গেলে বিনিয়োগের সুফল আরও বিস্তৃত হবে। এ জন্য প্রস্তুত শিল্পজমি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, উন্নত পরিবহন যোগাযোগ এবং অনুমোদনের পূর্বানুমেয় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তি সহযোগিতা : কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং গুণগত মান ব্যবস্থাপনায় জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়াতে ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণকে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক চৌধুরী। তিনি বলেন, 'ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ পাশাপাশি এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, কর্মীদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।' পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নও দুই দেশের আলোচনায় স্থান পাবে। বেসামরিক বিমান চলাচল, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী। তাঁর মতে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা রেখে একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, 'সমঝোতা স্মারক সই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নির্ভর করবে পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা বাড়ে, তার ওপর।'

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুও আলোচনায় : দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়ে দুই দেশের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই নেতা নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক এবং চিবা অঞ্চলের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ার একটি টয়োটা কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও বিবেচনায় রয়েছে।

দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করাই এ সফরের মূল লক্ষ্য। তবে সফরের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু সমঝোতা স্মারক সইয়ের ওপর নয়; বরং সেগুলোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে কতটা নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয়, তার ওপরও।