চাঁদাবাজি ঠেকাতে আসছে কঠোর আইন

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন আইনে ভুক্তভোগীর অভিযোগের অপেক্ষা নয়, চাঁদাবাজির প্রমাণ পেলেই সরাসরি মামলা করে ব্যবস্থা নিতে পারবে পুলিশ— এমন কঠোর বিধান রেখে নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার। শিগগিরই নতুন আইন হতে পারে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা হওয়ায় শুধু ঘোষণা দিয়ে চাঁদাবাজি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ অপরাধের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, সন্ত্রাসী কিংবা ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত থাকেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ভয়ে অনেকে সাক্ষ্য দিতে চান না, এমনকি থানায় অভিযোগ করতেও সাহস পান না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

গতকাল শনিবার দুপুরে খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) লাইনসে কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আইজিপি। চাঁদাবাজি, মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাস দমনে চলমান অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি পুলিশি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে নতুন আইনি কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

আইজিপি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর কাছে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, পুলিশ যেন মামলা দিতে পারে এবং পুলিশই যেন ব্যবস্থা নিতে পারে, জনগণের কমপ্লেইন করার দরকার নেই, ডিজিটাল এভিডেন্সসহ যেকোনো ধরনের এভিডেন্স পেলে যেন সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়— এ বিষয়ে আগামী কিছুদিনের মধ্যে দেখবেন নতুন আইন হচ্ছে। এগুলো সমাজ থেকে নির্মূল হবে।

আইজিপির বক্তব্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর অভিযোগ না করার প্রবণতা বড় বাধা। অপরাধীরা প্রভাবশালী হলে কিংবা কোনো ক্ষমতার বলয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সাধারণ মানুষ তাঁদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পায়। ফলে অনেক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এলেও অভিযোগ ও সাক্ষ্যের অভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জটিল হয়ে পড়ে। এ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পুলিশকে নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি নতুন আইনের অন্যতম লক্ষ্য।

তবে প্রস্তাবিত আইনের বিস্তারিত কাঠামো, অপরাধের সংজ্ঞা, ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং তদন্তের প্রক্রিয়া সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানানো হয়নি। আইনটি কার্যকর হলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তির হয়রানি রোধ এবং অভিযুক্তের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চ্যালেঞ্জ : চাঁদাবাজি দীর্ঘদিন ধরে জনজীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদা দাবির অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। অনেক ভুক্তভোগী প্রতিশোধের আশঙ্কায় অভিযোগ করেন না। আবার অভিযোগ করলেও প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্য দিতে অনীহা দেখান। ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে ওঠে।

আইজিপির বক্তব্যে এ বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়; অপরাধের তথ্য সংগ্রহ, প্রমাণ সংরক্ষণ, তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। নতুন আইনে পুলিশকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে অভিযোগ না আসার কারণে তৈরি হওয়া বাধা কমতে পারে।

বিশেষ করে ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেগুলোর সত্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও আইনসম্মতভাবে সংগ্রহের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হবে। অভিযোগের অপব্যবহার করে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

পুলিশ-জনগণের আস্থা ফেরানোর লক্ষ্য : চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধ দমনের পাশাপাশি পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আস্থার সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে পুলিশের কার্যক্রমের কারণে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই আস্থা পুনরুদ্ধার এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকরভাবে কাজ করার লক্ষ্যেই তিনি খুলনায় এসেছেন।

পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধের তথ্য পাওয়া, অপরাধী শনাক্ত করা, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। জনগণ পুলিশের ওপর আস্থা রাখতে পারলে অপরাধের তথ্য জানানো ও তদন্তে সহযোগিতার প্রবণতা বাড়তে পারে।

আইজিপি বলেন, পুলিশকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে আইনি কাঠামোর মধ্যে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কমিউনিটি পুলিশিংকে পুলিশের একটি শাখা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ, সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করা এবং নাগরিকদের সঙ্গে পুলিশের যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়মিত কার্যক্রম, জবাবদিহি, জনগণের অংশগ্রহণ এবং পুলিশের দ্রুত সাড়ার ওপর।

মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান : চাঁদাবাজির পাশাপাশি মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন আইজিপি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছরে মাদককে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসব অপরাধ নির্মূলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান আইজিপি।

মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অপরাধের উৎস ও অপরাধীদের পুনরায় একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কারণ শনাক্ত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ।

আইজিপি বলেন, মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ গড়ে তুলতে চায় পুলিশ। তবে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পরও তাঁদের কেউ কেউ কিছুদিনের মধ্যে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এ সমস্যা মোকাবিলায় কীভাবে অপরাধীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে স্থায়ীভাবে দূরে রাখা যায়, সে বিষয়ে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা মানবিক পুলিশ হতে চাই, জনবান্ধব পুলিশ হতে চাই। এটা করতে গেলে আবার অনেকে বলছে, অপরাধীরা পুলিশকে ভয় পায় না। তাদের আইনের আওতায় আনা হলেও কিছুদিন পর আবারও একই কার্যক্রম করছে। আমরা পলিসি ডেভেলপমেন্ট করছি, কীভাবে তাদের নির্মূল করা যায়। নতুন আইন বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ : চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এলো, যখন অপরাধ দমনের পাশাপাশি পুলিশি কার্যক্রমে জনআস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। অভিযোগ করতে অনীহা, সাক্ষ্য দিতে ভয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ চাঁদাবাজি প্রতিরোধে দীর্ঘদিনের বাধা। এসব বাধা দূর করতে পুলিশকে নিজ উদ্যোগে মামলা ও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব কার্যকর হতে পারে।

তবে শুধু আইন প্রণয়নই চাঁদাবাজি নির্মূলের নিশ্চয়তা নয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা, তদন্তের নিরপেক্ষতা, সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আইনের অপপ্রয়োগ রোধে কার্যকর নজরদারিও প্রয়োজন।

আইজিপি জানিয়েছেন, চাঁদাবাজি নির্মূলে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং নতুন আইনের বিষয়ে শিগগিরই অগ্রগতি দেখা যেতে পারে। এখন দেখার বিষয়, প্রস্তাবিত আইনের কাঠামো কী হয়, তা কবে কার্যকর হয় এবং বাস্তবে চাঁদাবাজির শিকার মানুষ কতটা নিরাপদে অভিযোগ জানাতে ও ন্যায়বিচার পেতে পারেন। ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে নতুন আইনের পাশাপাশি ধারাবাহিক প্রয়োগ ও দৃশ্যমান ফল নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।