ভয় ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের পুলিশ হতে হবে
বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

সবধরনের ভয়ভীতি ও পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণকে সেবা ও সুরক্ষা দিয়ে জনগণের পুলিশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে ২৭তম শিক্ষানবিস সার্জেন্ট এবং ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর ব্যাচ-২০০৬-এর মৌলিক প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, 'পুলিশের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেবাপ্রত্যাশী সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সেবা প্রদানে আপনাদের হতে হবে আরও আন্তরিক। সকল প্রকার ভয়ভীতি, পক্ষপাতিত্বকে উপেক্ষা করে জনমানুষকে আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে হবে।
"সর্বোপরি মানুষের পাশে থেকে মানুষকে সেবা দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করে সত্যিকারের অর্থেই জনগণের পুলিশ হিসেবে নিজেকে, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মানুষের জন্য কাজ করেই মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে।" মন্ত্রী বলেন, 'দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের প্রতীক্ষা, আইনি প্রক্রিয়া ও নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এ ব্যাচের সদস্যরা দেশসেবার মহান পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বৈষম্য আর অন্যায়কে যেন আপনারা কখনোই ব্যক্তিজীবনে প্রশ্রয় না দেন এবং পেশাজীবনে চর্চা না করেন, সেই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।' সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের পোশাক, পরিচয় ও দায়িত্ব শুধু চাকরির প্রতীক নয়। এটি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচারের পথ সুগম করা এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এক মহান অঙ্গীকার। পুলিশের প্রতিটি সিদ্ধান্ত একজন নাগরিকের জীবন, একটি পরিবারের নিরাপত্তা এবং সমাজের শান্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই দায়িত্ব পালনে প্রতিটি পদক্ষেপে দায়িত্বশীল ও আইনসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণে মানবিকতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান সময়ে অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে উল্লেখ করে স্বপ্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে রাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "প্রচলিত অপরাধের পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ, মানবপাচার এবং সঙ্গবদ্ধ অপরাধ মোকাবেলা পুলিশের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। 'এইসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শুধু প্রচলিত অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, বৈজ্ঞানিক তদন্ত, অপরাধের ধরন সম্পর্কে হালনাগাদ জ্ঞান এবং বিভিন্ন আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা প্রয়োজন।'
যেকোনো ধরনের অপরাধ মোকাবিলার জন্য সংবিধান এবং দেশের মৌলিক আইনে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, 'এই কারণে আপনাদের প্রতি আমার নির্দেশনা-দুরব্যবহার, পক্ষপাতদুষ্টতা ও পেশিশক্তির পরিবর্তে পেশাদারিত্ব, দক্ষতা আর মানবিক পুলিশিংয়ের মাধ্যমে আপনারা আপনাদের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।" একই সঙ্গে নিরপরাধ মানুষের অধিকার সুরক্ষিত রাখা এবং তদন্ত ও আইন প্রয়োগের প্রতিটি পর্যায়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি বলেও বক্তব্যে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা এবং দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
আইন প্রণয়ন, জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন ক্রয়, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সরবরাহের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে একটি দক্ষ, আধুনিক, যুগোপযোগী ও সেবাদর্মী একটি মানবিক বাহিনীতে পরিণত করতে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
নবীন পুলিশ সদস্যদের পেশাগত সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ বিভিন্ন স্পেশালাইজড ইউনিটে কাজ করার অবারিত সুযোগ রয়েছে আপনাদের।' কিন্তু কর্তব্যে অবহেলা, আচরণবিধি অমান্য করা, অপরাধ সংগঠন ও নৈতিকতাবিরোধী কাজের জন্য শাস্তির বিধানও রয়েছে বলেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, 'আপনারা ব্যক্তিগত স্বার্থ ও মোহের ঊর্ধ্বে উঠে সবার আগে বাংলাদেশ— এই মন্ত্রে অবিচল থাকবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।' অনুষ্ঠানে কুচকাওয়াজের অভিবাদন গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় প্রশিক্ষণের বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন তিনি। ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ২৭তম শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট ব্যাচের সদস্যরা নিজ নিজ ইউনিটে যোগ দেবেন। অন্যদিকে, ৪৩তম ক্যাডেট সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) ব্যাচের সদস্যরা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে শিক্ষানবিশ এসআই (নিরস্ত্র) হিসেবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পদায়িত হবেন।
২০০৬ সালে নিয়োগের জন্য বাছাই করা ৮৪ জন পুলিশ সার্জেন্ট ও ১৬২ জন সাব-ইন্সপেক্টরকে ২০০৭ সালে 'দলীয় বিবেচনায়' চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের মার্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে ওই আদেশ প্রত্যাহার করে তাদের জ্যেষ্ঠতাসহ চাকরিতে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২০ বছর পর চাকরি ফিরে পাওয়া এই ২৪৬ জন পুলিশ সদস্য বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সমাপনী কুচকাওয়াজে অংশ নেন।
