২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ফল
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২২ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম পাসের হার। এমনকি গত বছরের চেয়েও এবার কম পাস করেছে। গত দুই দশক ধরে গড় পাসের হার ৬০ শতাংশের ওপরে ছিল। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর গত চার-পাঁচ বছরে গড় পাসের হার ছিল ৮০ শতাংশের আশপাশে। গত বছরও পাসের হার ৫৮ শতাংশের ওপরে ছিল। এবার সেই হার আরও কমে ৫২.১২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ; তাদের মধ্যে ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল। এই হিসাবে ২০২৬ সালের পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন।
এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। আর ফেল করেছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকের মতো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি এবারের পরীক্ষায়। ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৪ সালে এইচএসসিতে পাস করেছিলেন ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। এরপর এইচএসসিতে পাসের হার আর কখনও এর নিচে নামেনি। সেই হিসাবে গত ২২ বছরের মধ্যে এবারই পাসের হার সবচেয়ে কম।
গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে এ ফল প্রকাশ করা হয়। সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একযোগে সারাদেশে ফল প্রকাশের ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সেখানেই ফলাফলের এ সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। দুই দশকের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় ৫০ শতাংশের ওপরে ওঠে পাসের হার। ২০০৬ সালের গড় পাসের হার ৬০ শতাংশের কোটা পার করার পর আর কখনোই এর নিচে নামেনি। বিভিন্ন সময় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করলেও করোনাকালীন শতভাগ অটোপাস এবং এর পরবর্তী সময়ে পাসের গড় হার ছিল ৮৫ ও ৯৫ শতাংশের ঘরে। ২০২৪ সালে গড় পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এবারের ফলাফলে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের পাসের হার কম। ছাত্রদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ, আর ছাত্রীদের ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। সব শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে ছাত্রদের তুলনায় ৬৬ হাজার ৩৭১ জন বেশি ছাত্রী পাস করেছে। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলও উদ্বেগজনক। এ বছর ২০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২টি। অন্যদিকে, এ বছর ২০২টি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছে। পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
চূড়ায় ঢাকা বোর্ড, তলানিতে বরিশাল : এবারের ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। অন্যদিকে সব বোর্ডের নিচে অবস্থান নিয়ে পাসের হারে তলানিতে নেমেছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। প্রকাশিত ফলের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পাসের হার সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই বোর্ডে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩০ জন শিক্ষার্থী।
এর বিপরীতে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে বরিশাল বোর্ড। এই বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৫৭ হাজার ৯১২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে এখানে পাস করেছেন মাত্র ২৫ হাজার ৯৭০ জন। বরিশালের ঠিক ওপরেই রয়েছে যশোর বোর্ড (৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ) এবং রাজশাহী বোর্ড (৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ)। অন্যান্য বোর্ডের মধ্যে— চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং কুমিল্লা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার দিক থেকেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বোর্ড। এই বোর্ড থেকে রেকর্ড ১৬ হাজার ৭১৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, যা নয়টি সাধারণ বোর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৫২০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে রাজশাহী বোর্ডে। বরিশাল বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন সবচেয়ে কম— মাত্র ৯৫০ জন পরীক্ষার্থী। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডসহ সারাদেশে মোট পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
কোন বোর্ডে পাসের হার কত : চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। এরমধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১.৮০ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৪৫.০৬ শতাংশ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৮.০৪ শতাংশ। যশোর শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৪.৯২ শতাংশ। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫২.০৭ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে পাসের হার ৪৪.৮৪ শতাংশ। সিলেট বিভাগে পাসের হার ৫০.৯০ শতাংশ। দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৫.৯৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫১.৪৪ শতাংশ।
পাসের হারে মেয়েরা, জিপিএ ৫-এ এগিয়ে ছেলেরা : উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় গত কয়েক বছরের মত এবারও পাসের হারে এগিয়ে আছে ছাত্রীরা। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েক বছর পর মেয়েদের পেছনে ফেলতে পেরেছে ছেলেরা। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৯ জন ছিল ছাত্রী। তাদের মধ্যে পাস করেছে ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। সেই হিসাবে ছাত্রীদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে, ৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৯ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন। তাদের পাসের হার ৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
অর্থাৎ পাসের হারে ছেলেদের চেয়ে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এবার মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৩৬৩ জন এবং ছাত্রী ১৯ হাজার ৭২১ জন। অর্থাৎ মেয়েদের চেয়ে ৬৪২ জন বেশি ছেলে পূর্ণাঙ্গ জিপিএ পেয়েছে। ২০২৫ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫, দুই দিক দিয়েই এগিয়ে ছিল মেয়েরা। গতবছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৬৬১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ছিল ৬ লাখ ২৪ হাজার ২১৫ জন। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৬ জন, অর্থাৎ ৬২ দশমিক ৯৭ শতাংশ পাস করেছিল। অন্যদিকে, ৬ লাখ ১১ হাজার ২১৫ জন ছাত্রের মধ্যে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৪ জন পাস করেছিল। তাদের পাসের হার ছিল ৫৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত বছর জিপিএ-৫ পাওয়া ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ছিল ৩৭ হাজার ৪৪ জন এবং ছাত্র ৩২ হাজার ৫৩ জন। সেই হিসাবে ছেলেদের চেয়ে ৪ হাজার ৯৯১ জন বেশি মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। ২০২৪ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সে বছর মোট ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। তাদের মধ্যে ছাত্রী ছিল ৮০ হাজার ৯৩৩ জন এবং ছাত্র ৬৪ হাজার ৯৭৮ জন। তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৪৯ হাজার ৩৬৫ জন ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। বিপরীতে ছাত্রদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জিপিএ পেয়েছিল ৪৩ হাজার ২৩০ জন। সে বছর ছেলেদের চেয়ে ৬ হাজার ১৩৫ জন বেশি মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
