পুলিশের দাবি, আন্দোলনে আ.লীগের ইন্ধন রয়েছে
শ্রমিকদের আন্দোলনে উত্তপ্ত পোশাক কারখানা
সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে ৩০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা : * মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ * আন্দোলন থেকে ১১ জন গ্রেপ্তার * পুলিশ বলছে পরিস্থিতি 'স্বাভাবিক'
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটার পাশাপাশি জলকামান, কাঁদুনে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করেছে পুলিশ। গতকাল রোববার দুপুর ১২টার সময়ও সংঘর্ষ চলছিল। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ওই এলাকায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি। পুলিশের ভাষ্য, 'ছিনতাইকারী' সন্দেহে আন্দোলনকারীদের মধ্যে একজনকে হেফাজতে নিয়ে পুলিশ বক্সে রাখার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর চার দিক থেকে আন্দোলনকারীরা গোলচত্বরের পুলিশ বক্সের দিকে এগিয়ে আসতে থাকলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়।
পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার দুপুর ১২টার দিকে বলেন, এখনও সংঘর্ষ চলছে। আমরা তাদের ডিসপার্স করছি। বিস্তারিত পরে জানানো হবে। এর আগে সকাল ৯টার দিকে মিরপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই গোলচত্বর দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে আশপাশের এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প পথে গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করে ট্রাফিক পুলিশ।
পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, সকাল থেকেই মিরপুর ১০, ১১ ও ১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করছেন। সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সড়ক থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে পুলিশ কাজ করছে। মিরপুর জোন ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মাহফুজুল হক বকশী সকালে বলেন, পোশাক শ্রমিকরা আজও সড়ক অবরোধ করেছেন। বর্তমানে মিরপুর-১০ নম্বর দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। আমরা ডাইভারশন দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। গত শনিবারও মিরপুরের একাধিক এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, মিরপুর-১২ ও প্রশিকা মোড় এলাকায় তাদের আন্দোলনের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান পোশাক শ্রমিকরা। ওই দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে কয়েকশ শ্রমিক সড়কে নামেন। পরে তারা সেখান থেকে সরে গেলেও একই দাবিতে পূরবী সিনেমা হলের সামনে মেট্রোরেলের ১১ নম্বর স্টেশন এলাকায় আবার সড়ক অবরোধ করেন। দুই দফায় প্রায় ছয় ঘণ্টা সড়ক অবরোধের পর বিকালে শ্রমিকরা সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছেন পোশাক শ্রমিকরা। এর মধ্যে রোববার পোশাক শ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আরিফ।
পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে আ.লীগের ইন্ধন : ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, সাভার, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর তৎপরতা। এই আন্দোলনে দলটির নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ, সংঘর্ষে উসকানি ও নাশকতার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাদের এই তৎপরতার সমন্বয় করছেন ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহ। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের এনে আন্দোলনে যুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। গতকাল রোববার ডিবির মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান ১১ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানান।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে দুজনের নাম রাকিব ও আরিফ বলে জানা গেছে। বাকিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। ডিবির এই কর্মকর্তা দাবি করেন, আলিফ মোল্লাহ বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীদের ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে শতাধিক নেতাকর্মীর উপস্থিতির তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।
মিরপুর বিভাগের পুলিশের পক্ষ থেকে আরও ১৭ জনকে আটকের কথা জানিয়েছেন উপ-পুলিশ কমিশনার আবু নাসের রিকাবদার। তার দাবি, আটক ব্যক্তিরা নাশকতার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হয়ে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
মিরপুরের শ্রমিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের পদধারী নেতার অংশগ্রহণের তথ্যও সামনে এসেছে। তার নাম সাজবুল ইসলাম। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। গতকাল রোববার সকাল থেকে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শ্রমিক আন্দোলনের একাধিক ছবি প্রকাশ করে এতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সাজবুল। তার ফেসবুক পরিচিতিতেও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পদটির উল্লেখ রয়েছে। একটি পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'আমি নিজেও একজন শ্রমিক।' জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একাধিক ফেসবুক পেজ ও গ্রুপেও তার শ্রমিক আন্দোলনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি পেজের দাবি, সাজবুল এখন গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন। রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি দাবি করেন, গার্মেন্টসকর্মী পরিচয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে নেমেছেন। মিরপুরে ছাত্রলীগ নেতা সাজবুল ইসলাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রাশেদ খাঁনের অভিযোগ, আন্দোলনকে উসকে দিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ডিসেম্বরকে সামনে রেখে এ ধরনের আরও আন্দোলন গড়ে তোলার অপচেষ্টা চলছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তার পোস্টে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধেও আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।
এদিকে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মাসিক মজুরির দাবিতে কয়েক দিন ধরেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করছিলেন পোশাক শ্রমিকেরা। রোববার সকাল থেকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর অবরোধের মধ্য দিয়ে নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। পরে মিরপুর-১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ।
সকাল থেকে সড়কে অবস্থান নেওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। কয়েক দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ চলে দুপুর পর্যন্ত। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ এলাকায় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশ বক্স ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। এ সময় মিরপুর-১০, ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা অবরোধ ও সংঘর্ষে মিরপুরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে সংকটের মধ্যে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন পাসের মাধ্যমে এ নিষেধাজ্ঞা আইনি ভিত্তি পায়। দলটির নিবন্ধনও স্থগিত রয়েছে। তবে এরইমধ্যে দলটির প্রধান এবং গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝেই নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে ১১ জন গ্রেপ্তার, পুলিশ বলছে আ.লীগ : রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগ। পুলিশ বলছে, তারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। গতকাল রোববার দিনভর অভিযানে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ?বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিবি মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ রাকিব খান। তিনি বলছেন, 'কয়েকদিন ধরে বেতন বৃদ্ধি দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। তবে গতকাল থেকে তারা বেশ সহিংস হয়ে উঠেছে। আজকেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।'
রাকিব খান জানিয়েছেন, 'মূলত সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা নাশকাতার চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের আন্দোলনের মাঝ থেকে এমন ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।' তিনি বলেন, 'মিরপুর ১০ ও এর আশেপাশের এলাকায় অভিযানে গ্রেফতারকৃতরা বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃনমুল নেতা। মিরপুরের পলাতক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগ্নে আলিফ মোল্লা মূলত এই নাশকতার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছে। পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, 'আলিফই মূলত ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এই সকল নেতাকর্মীদের ঢাকায় এনেছে। প্রায় শতাধিক নেতাকর্মী এখানে উপস্থিত ছিল। তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার অভিযান চলমান রয়েছে।'
আশুলিয়ায় ৩ পোশাক কারখানায় কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধ, পুলিশ বলছে পরিস্থিতি 'স্বাভাবিক' : তৈরি পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং 'ব্ল্যাকলিস্টিং' বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকার আশুলিয়ায় তিনটি কারখানায় কর্মবিরতি পালন করেছেন শ্রমিকরা। তবে শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম 'স্বাভাবিক' রয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। তবে শ্রমিকদের দাকিকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিভিন্ন কারখানার সামনে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। গতকাল রোববার সকাল ৯টার দিকে আশুলিয়ার পল্লীবিদ্যুৎ, ইউনিক, জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাবো ও কাঠগড়া এলাকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলছেন, "সকাল থেকে অধিকাংশ কারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং 'ব্ল্যাকলিস্টিং' বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে নিশ্চিতপুর এলাকার তিনটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখেছেন।" তবে সার্বিক পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি এ পুলিশ কর্মকর্তার। শিল্প পুলিশ জানায়, রোববার সকাল থেকে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা 'শান্তিপূর্ণভাবে' কাজে যোগ দেন। তবে নিশ্চিতপুর এলাকার 'আল-মুসলিম অ্যাপারেলস', 'নিউএইজ গ্রুপ'-এর একটি কারখানা এবং 'ট্রাউজার লাইন লিমিটেড'-এর শ্রমিকরা কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন। পরে সকাল ১০টার পরে তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে সামনের বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক অবরোধ করে। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা তারা সেখানে অবস্থান করেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে তারা সড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও শ্রমিকদের আশ্বস্ত করতে সকাল থেকেই শিল্প পুলিশ মাইকিং করছে।
মাইকে বলা হয়-'শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির বিষয়ে শিল্প পুলিশ আন্তরিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শ্রমিকদের পাশে থেকে দায়িত্ব পালন করছে।' বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, "ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকার দাবিতে সকালে কর্মস্থলে যোগ দিয়েই কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। "পরে শ্রমিক বিক্ষোভ বাড়তে থাকলে নরসিংহপুর জিরাবো কাঠগড়া এলাকার আশপাশের বেশ কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেন।" দ্রুত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের দাবির বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে ৩০০ কারখানায় ছুটি ঘোষণা : ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ অন্যান্য দাবিতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। এ ছাড়া গাজীপুরেও শতাধিক কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শিল্প পুলিশ-১ এর আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া রোববার বিকালে বলেন, "সকাল থেকে শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন। শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭টি তৈরি পোশক কারাখানা আজকের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।" এ ছাড়া বিকালে কয়েকটি কারখানার শ্রমিক মিলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুরে সড়ক অবরোধ করেছেন। এ কারণে ওই পথে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। পুলিশ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানান শিল্প পুলিশের কর্মকর্তা মুমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। শিল্প পুলিশ-২ এর গাজীপুরের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, গতকাল রোববার সারা দিনে শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধের মধ্যে দুপুরে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি কারখানার গুদাম ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রোববার সকাল থেকে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে মিরপুর ১১, ১২ ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়, যা চলে প্রায় দুপুর ২টা পর্যন্ত। এ সময় মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ, যাত্রী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
দুপুরের দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে মিরপুর ১০, মিরপুর ১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সড়ক ও রেল— দুই পথেই যোগাযোগ ব্যাহত হয়। মিরপুরে আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর বাহিনীটি ২৮ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছে।
