সবুজের আবহে বদলাচ্ছে ঢাকা
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কগুলোর পাশে ফুটপাত একসময় ছিল হকারদের দখলে। কোথাও পসরা সাজিয়ে বসা দোকান, কোথাও খাবারের স্টল, আবার কোথাও নানা পণ্যের অস্থায়ী বাজার। পথচারীদের চলাচলের জায়গা দখল করে ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের একাংশেও ছড়িয়ে পড়েছিল এসব দোকান। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষকে নামতে হতো মূল সড়কে। বাড়ত যানজট, তৈরি হতো দুর্ঘটনার ঝুঁকিও এর ফলে ভোগান্তিতে পড়তেন নগরবাসী। সেই চেনা দৃশ্য এখন বদলাতে শুরু করেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত হকারমুক্ত করে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করার পাশাপাশি চলছে বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। কোথাও ফুটপাতের পাশে শোভা পাচ্ছে ফুলের টব, কোথাও লাগানো হয়েছে সবুজ গাছের চারা। কোথাও আবার তৈরি হয়েছে পথচারীদের বিশ্রামের জায়গা। এতে নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে ফিরতে শুরু করেছে স্বস্তি, তৈরি হচ্ছে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরীর নতুন আবহ।
রাজধানীর মিরপুর এলাকার চিত্রে এ পরিবর্তন বিশেষভাবে দৃশ্যমান। মিরপুর-১-এর শাহ আলী মার্কেট, সনি সিনেমা হলের মোড়, মুক্তবাংলা মার্কেট, পাইকপাড়া ও বাঙলা কলেজ এলাকা থেকে মিরপুর-২-এর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকা এবং মিরপুর-১০ গোলচত্বর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের ফুটপাত হকারমুক্ত করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)।
মিরপুর-১০ ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়ের সামনের ফুটপাত, ফলপট্টি, শাহ আলী প্লাজা, আনোয়ার ম্যানশন, কাজীপাড়া, পর্বতা, শেওড়াপাড়া ও হারমান মেইনার স্কুলের সামনের ফুটপাতও এখন পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত।
সম্প্রতি এসব এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাতজুড়ে আগের মতো হকারদের হাঁকডাক নেই, নেই দোকানপাটের ভিড়। পথচারীরা নির্বিঘ্নে ফুটপাত ধরে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছেন। অনেক জায়গায় ফুটপাতের পাশে গাছ লাগিয়ে নতুন করে দখল ঠেকানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর ফুটপাত ফিরে পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছেন পথচারীরা। তাদের কাছে দখলমুক্ত এসব ফুটপাত যেন এক নতুন নগর অভিজ্ঞতা।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক পর্যন্ত ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে যে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন, মিরপুরের এ পরিবর্তন তারই বাস্তব প্রতিফলন। নগরবাসীর চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ এখন দুই সিটি কর্পোরেশনেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ফুটপাতে হকারদের আর বসতে দেওয়া হবে না। আমরা বাধ্য হয়েই ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা ও হকারদের উচ্ছেদ করেছি। আজকের এ পরিস্থিতির জন্য কিছু সিন্ডিকেট ও হকাররা নিজেরাই দায়ী। কেননা তারা ফুটপাত ছেড়ে রাস্তা পর্যন্ত দখল করে রেখেছিল, যেখানে সাধারণ জনগণের হাঁটার কোনো পথ ছিল না। সাধারণ জনগণ জানতেই পারত না যে তাদের জন্য ফুটপাত ছিল।
শুধু উত্তর সিটি নয়, রাজধানীর দক্ষিণ অংশেও ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গুলিস্তান, মতিঝিল, নিউমার্কেট, মৎস্য ভবন ও সেগুনবাগিচাসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কসংলগ্ন ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সড়কের মিডিয়ান, সড়কদ্বীপ ও বিভিন্ন চত্বরে ফুলের গাছসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি নীলক্ষেত মোড় সংলগ্ন নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেট থেকে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট সংলগ্ন ৪ নম্বর গেট পর্যন্ত মূল সড়ক ও ফুটপাত এবং প্রিয়াঙ্গন সুপার মার্কেট থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত মূল সড়ক সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা হয়েছে। উচ্ছেদের পর এসব স্থান পুনরায় দখল ঠেকানো এবং এলাকার সৌন্দর্য বাড়াতে সাময়িকভাবে ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী বিভিন্ন গাছের টব স্থাপন করা হয়েছে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি নগরীর সবুজায়নেও বড় পরিসরে কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সড়ক, চত্বর, খেলার মাঠ, পার্ক, উদ্যান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংসদীয় আসনে মোট ২ লাখ ৩০ হাজার ১২০টি গাছ রোপণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে নগরীর ৪০ কিলোমিটার সড়ক মিডিয়ানের মধ্যে ৩১ কিলোমিটার এলাকায় রোপণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার গাছ। দুই কিলোমিটার চত্বরের মধ্যে ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার এলাকায় লাগানো হয়েছে ৮ হাজার গাছ। এ ছাড়া দেড় কিলোমিটার সড়কদ্বীপের মধ্যে ১ দশমিক ১৭ কিলোমিটার এলাকায় রোপণ করা হয়েছে ২ হাজার ৩০০টি গাছ। এসব স্থানে বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলমান রয়েছে। নগরীর সাতটি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে ৫০০টি করে মোট ৩ হাজার ৫০০টি গাছ রোপণ করেছে ডিএসসিসি।
বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় উন্নয়ন করা ২৩টি খেলার মাঠের মধ্যে ১২টির চারপাশে লাগানো হয়েছে ৯০০টি গাছ। একইভাবে ২৫টি পার্ক ও উদ্যানের মধ্যে ১৪টিতে ফলজ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী ৮০০টি গাছ রোপণ করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সবুজায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫২০টি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০০টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিগগিরই আরও ৪০০টি গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নগরীর আরও কয়েকটি স্কুল ও কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুধু গাছ লাগানোতেই সীমাবদ্ধ নেই ডিএসসিসির সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচি। সড়ক মিডিয়ানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সবুজ ও নান্দনিক করে তুলতে রাজস্ব বিভাগের মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল মোড় থেকে শিক্ষা ভবন মোড়, শিক্ষা ভবন থেকে কাকরাইল মসজিদ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকার রাজসিক ভাস্কর্য থেকে কাকরাইল মসজিদ হয়ে পৃথিবী চত্বর ও মগবাজার মোড়, শিক্ষা ভবন থেকে জিরো পয়েন্ট, জিরো পয়েন্ট থেকে বঙ্গভবন ও রাজউক মোড় থেকে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত সড়ক মিডিয়ানের সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া এলিফ্যান্ট রোড, দৈনিক বাংলা মোড় থেকে ফকিরাপুল, মালিবাগ মোড় থেকে কাকরাইল, শাপলা চত্বর থেকে ফকিরাপুল ও রাজধানী সুপার মার্কেট, ফকিরাপুল থেকে শাহজাহানপুর, নিউমার্কেট সিগন্যাল থেকে কলাবাগান-পান্থপথ মোড় এবং পান্থপথ থেকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়ক পর্যন্ত বিভিন্ন সড়ক মিডিয়ান এ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
তালিকায় আরও রয়েছে শাহবাগ মোড় থেকে ঢাকা ক্লাব, ঢাকা ক্লাব থেকে মৎস্য ভবন, মগবাজার চৌরাস্তা থেকে মালিবাগ, পুরানা পল্টন থেকে বিজয়নগর নাইটিঙ্গেল মোড়, মুক্তাঙ্গন থেকে গুলিস্তান ফ্লাইওভারের নবাবপুর রোডের উত্তরাংশ, নীলক্ষেত থেকে বিজিবি গেট, আজিমপুর থেকে নীলক্ষেত, সার্ক ফোয়ারা থেকে নীলক্ষেত, হাতিরপুল থেকে বাংলামোটর, সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ, বেইলি রোড থেকে রাজারবাগ, বাটা সিগন্যাল থেকে গাউছিয়া ও পান্থপথ-গ্রিন রোড থেকে পান্থপথ মোড় পর্যন্ত সড়ক। এর আগে, সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার পাশাপাশি সেখানে সংস্কারকাজও সম্পন্ন করেছে ডিএসসিসি।
নতুন ডাস্টবিন স্থাপন, পথচারীদের বিশ্রামের জন্য বেঞ্চ নির্মাণ ও সীমানাপ্রাচীর সংস্কার করা হয়েছে। সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে ফুটপাতের সীমানাপ্রাচীরে স্থান পেয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ জন গুণী ব্যক্তিত্বের গ্রাফিতি। ফলে ফুটপাতটি শুধু চলাচলের উপযোগীই হয়নি, পেয়েছে সাংস্কৃতিক আবহও।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, নগরীর পরিবেশ উন্নয়ন, পথচারীবান্ধব নগর গড়ে তোলা এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবৈধ ফুটপাত দখলের পক্ষে যতই যুক্তি বা অজুহাত দেখানো হোক না কেন, কোনো অবস্থাতেই রাস্তা ও ফুটপাতে হকার বসতে দেওয়া হবে না।
বারবার অভিযানের পরও হকাররা কীভাবে আবার ফুটপাতে ফিরে আসে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যতবারই অবৈধভাবে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করা হবে, ততবারই আমরা নগরবাসীর স্বার্থে অভিযান চালাব। একাধিকবার আলোচনা, অনুরোধ ও সতর্ক করার মতো সব ধরনের পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। এখন থেকে অবৈধভাবে বসলে মালামাল জব্দ এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেফতার করা হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে ফুটপাতের যথাযথ ব্যবহার, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল ও পর্যাপ্ত সবুজের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফুটপাত দখলমুক্ত হলে মানুষ সড়কে না নেমে নিরাপদে ফুটপাত দিয়েই চলাচল করতে পারে। এতে যানবাহনের চলাচলেও শৃঙ্খলা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে সড়কের মিডিয়ান, চত্বর ও উন্মুক্ত স্থানে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ নগরীর সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাকের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বাসসকে বলেন, রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার এই উদ্যোগ নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। তবে উচ্ছেদের পর ফুটপাতের স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিয়মিত তদারকি, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও পরিকল্পিত সবুজায়ন অব্যাহত রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও মানবিক ও পরিকল্পিতভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে রাজধানীর ফুটপাতকে পথচারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং সড়ক-মিডিয়ানসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে সবুজের সমারোহ গড়ে তোলার উদ্যোগ ঢাকা শহরের চেহারা বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। হকারমুক্ত ফুটপাতে নাগরিকের স্বস্তি, সড়কে শৃঙ্খলা ও চারপাশে সবুজের আবহ— এ তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে প্রত্যাশিত বাসযোগ্য ঢাকা।
