আবারও কর্মচঞ্চল শিল্পাঞ্চল সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ-অচলাবস্থা ও ছুটি শেষে আবারও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেছে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল। কারখানাগুলোয় কাজে যোগ দিয়েছেন শ্রমিকরা। খুলেছে শ্রমিক বিক্ষোভের কারণে বন্ধ থাকা অনেক কারখানা। শ্রমিকদের উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরেছে সেগুলোতে। গতকাল রোববার সকাল থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল ঘুরে এমন দৃশ্যই দেখা গেছে। কর্মস্থলে যোগ দিতে কারখানার ফটকে শ্রমিকদের উপস্থিতি ও প্রবেশের চিত্র ছিল স্বাভাবিক। কোথাও জটলা বা বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচলও স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে চায় না প্রশাসন। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া ঠেকাতে এখনো শিল্পাঞ্চলজুড়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে— আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, 'সকাল থেকেই শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তাঁরা কাজে ফিরে আনন্দিত। 'তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১৩ প্লাটুন বিজিবি, ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।' গতকাল রোববার শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, কারখানার আশপাশে তাদের অবস্থান করতেও দেখা গেছে।
কর্মস্থলে ফেরা কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে তারা কাজ বন্ধ রেখে আন্দোলন, ভাঙচুর কিংবা শিল্পকারখানায় অস্থিরতা চান না। নিয়মিত কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের ন্যায্য দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে চান তারা।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আমজাদ হোসাইন বলেন, 'কারখানাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। সকাল থেকেই শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।'
ছুটির দিনেও খোলা ছিল কিছু কারখানা : শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের কারণে গত কয়েকদিন গাজীপুরে কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলেনি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শনিবার সরকারি ছুটির দিনেও খোলা ছিল কিছু কারখানা। শিল্পাঞ্চল পুলিশের সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, শনিবার সরকারি ছুটির দিনে বিজিএমইএভুক্ত কারখানাগুলো বন্ধ থাকলেও পাঁচ শতাংশ কারখানা চালু ছিল। এদিন নিজস্ব উদ্যোগে শ্রমিকদের ওভারটাইমের বিনিময়ে এসব কারখানা চলেছে। এর আগে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় কয়েক দফায় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় বহু কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
শিল্পাঞ্চল পুলিশের সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, গাজীপুরে শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে হামলা, বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করার অভিযোগে শিল্পপুলিশ তিনটি ও গাজীপুর মহানগর পুলিশ আরও আটটির মতো মামলা করেছে। তিনি বলেন, এসব মামলায় অন্যদের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের পাঁচ নেতাকে আটক করা হয়েছে। এসব নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই কারও নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। যাচাইবাছাই শেষে দায়ীদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে বলেও জানান তিনি।
শিল্পাঞ্চলে ৩৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন : সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় ৩৩ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল রোববার বিজিবি সদর দপ্তরের গণসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুর; নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট, জালকুড়ি, বিসিক শিল্পনগরী, চাষাঢ়া, কাঁচপুর ও শিমরাইল এবং গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, আমবাগ, কাশিমপুর, নাওজোর, ভোগড়া বাইপাস, গাছা ও সালনা এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। শরিফুল ইসলাম জানান, বিজিবি সদর দপ্তরের মনিটরিং সেল থেকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও সরাসরি ভিডিও চিত্র সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা, জনসাধারণের জানমালের সুরক্ষা এবং স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখতে এ মোতায়েন ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে বিজিবির তরফে জানানো হয়েছে। ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে সম্প্রতি ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে নামেন পোশাক শ্রমিকরা। এর মধ্যে কোথাও কোথাও পুলিশ ও বহিরাগতদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়কে নামতে দেখা গেছে। এর মধ্যে গত ৪ নভেম্বর পোশাক খাতের নিম্নতম মজুরি বোর্ড প্রথম সভা করে বলেছে, পোশাক শ্রমিকদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে, যা শ্রমিকরা হাতে পাবেন জানুয়ারি মাসে। এরপর পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত রয়েছে। তৈরি পোশাক শ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে, যা কার্যকর হয় পরের মাসে। সেই হিসাবে পোশাক খাতের বর্তমান নিম্নতম মজুরি হারের মেয়াদ শেষ হবে চলতি নভেম্বরে। ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। এক্ষেত্রে মজুরি বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
