পোলিও মায়েলাইটিস নির্মূল করা জরুরি
প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

পৃথিবী রোগের আধার। হাজার রকমের জীবাণুর সংক্রমণে আক্রান্ত পৃথিবী। এর মধ্যে কয়েকটাকে মানুষ পৃথিবী থেকে নির্মূল করতে পেরেছে এবং আরও কয়েকটি নির্মূল হওয়ার পথে। নির্মূল হওয়ার শেষ পর্যায়ে যে রোগটি আজও মানুষের মাথাব্যথার কারণ, তার নাম পোলিও। পূর্ণাঙ্গভাবে বললে পোলিও মায়েলাইটিস।
পোলিও রোগের জীবাণু : পোলিও রোগের জীবাণু হলো- একধরনের ভাইরাস যা এন্টারোভাইরাস ধরনের। একে পোলিও ভাইরাস নামে অভিহিত করা হয়। এরা মানুষের অন্ত্রে কলোনি বা উপনিবেশ তৈরি করে বংশবিস্তার করে। আক্রান্ত ব্যক্তির মলে এ ভাইরাস নির্গত হয় এবং মলের মাধ্যমেই এর সংক্রমণ ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তির নির্গত মল পানি ও খাদ্যে মিশে মুখ গহ্বরের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এর ফলে পোলিওর বিস্তার ঘটে। সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সি শিশুরাই এ রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। প্রতি ২০০ জন আক্রান্ত রোগীর মধ্যে একজন প্যারালাইসিসে ভোগে। গড়ে ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ রোগী শ্বাসতন্ত্রের মাংসপেশির প্যারালাইসিসজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে।
উপসর্গ ও লক্ষণ : কোনো লক্ষণ থাকে না শতকরা ৭২ শতাংশ ক্ষেত্রে। হাল্কা অসুস্থতা থাকে শতকরা ২৪ শতাংশ ক্ষেত্রে। প্যারালাইসিসহীন মেনিনজাইটিস শতকরা ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘটে। প্যারালাইটিক পোলিও হয় শতকরা ০.১ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে। স্পাইনাল পোলিও হয় শতকরা ৭৯ শতাংশ ভাগ। বাল্বোস্পাইনাল পোলিও হয় শতকরা ১৯ শতাংশ। সাধারণ ক্ষেত্রে জ্বর, গলাব্যথা, বমি ও বমিভাব, পেটে ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা মাঝেমধ্যে ডায়রিয়া হতে পারে। ভাইরাস যখন স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করে, তখন মাথাব্যথা, পিঠ ব্যথা, অবসন্নতা তৈরি হয়। পোলিও একটি উচ্চমাত্রার সংক্রামক রোগ, যা আক্রান্ত মানবদেহের অন্ত্রস্থ জীবাণুযুক্ত মলের নির্গমন ও সেই মলদ্বারা দূষিত পানি বা আহার্য গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থ দেহে সংক্রামিত হয়।
প্রাদুর্ভাবসম্পন্ন এলাকায় ওয়াইল্ড পোলিও ভাইরাস সব জনগোষ্ঠীকে সংক্রামিত করার সামর্থ্য রাখে। গ্রীষ্ম ও শরতে পোলিওর প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং শীতে তুলনামূলক কম হয়। এই জীবাণুর সুপ্তকাল ৬ থেকে ২০ দিন যা গড়ে ৩ থেকে ৩৫ দিন পর্যন্ত হয়। প্রথম সংক্রমণের পর হতে মলে দীর্ঘদিন ধরে পোলিও ভাইরাস নির্গমন হয়।
উপসর্গ দেখা দেওয়ার ৭ দিন আগে এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার ১০ দিন পরে থেকে পোলিও জীবাণুর সংক্রমণ সক্ষমতা অধিক থাকে। তবে যতদিন পর্যন্ত লালা ও মলে জীবাণু নির্গত হয়, ততদিন পর্যন্ত সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
শারীরিক পরিশ্রমে অনীহা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি কারণে সংক্রমণ ত্বরান্বিত হয়। গর্ভস্থ ভ্রূণে মায়ের রক্তের মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। তবে মায়ের পোলিও টিকা গ্রহণ বা পোলিও সংক্রমণ গর্ভস্থ ভ্রূণকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না।
রোগ নিরূপণ : প্যারালাইটিক পোলিও ক্লিনিক্যালি নিরূপণ করা সহজ। বিশেষত, যারা হঠাৎ করে হাত বা পায়ের ঢলঢলে প্যারালাইসিসে ভুগছে এবং হাত বা পায়ের মাংসপেশির টেন্ডনগুলোর প্রতিক্রিয়া হ্রাস পায় বা থাকে না।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় রোগ নিরূপণে আক্রান্ত বা সন্দেহজনক রোগীর মল বা গলার সোয়াব নেওয়া হয়। রোগীর রক্তে পোলিও ভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি পাওয়া যেতে পারে।
সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড বিশ্লেষণে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে। এ ফ্লুইডে খুব বিরলভাবে পোলিও ভাইরাস পাওয়া যায়।
ইতিহাস : এ রোগ প্রথম ১৭৮৯ সালে ইংরেজ চিকিৎসক মিকায়েল আন্ডারউড কর্তৃক শনাক্ত হয়। ১৯০৯ সালে অস্ট্রিয়ার ইমিউনোলজিস্ট কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার প্রথম পোলিও ভাইরাস চিহ্নিত করেন। প্রথম ইনজেকশনযোগ্য পোলিও ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন জোনাস এডওয়ার্ড সক। এরপর মুখে খাওয়ার বিশ্বমানের পোলিও ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী আলবার্ট স্যাবিন। পোলিও নির্মূলে দুই ধরনের টিকার প্রচলন আছে। এ দুই রকম টিকাই রক্তে ইমিউনিটি বা রোহ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় করে তোলে। এর মাধ্যমে জন থেকে জনে ওয়াইল্ড পোলিও ভাইরাসের সংক্রমণকে প্রতিরোধ করা যায়। এতে হার্ড (Herd Immunity) ইমিউনিটি তৈরি হয়।
প্রথম ধরনের ভ্যাকসিন হলো লাইভ অ্যাটেনিউয়েটেড ভ্যাকসিন যা জীবাণুকে দুর্বল করে তৈরি করা হয়। এটি ভাইরোলজিস্ট হিলারি কপ্রোভস্কি আবিষ্কার করেছেন। দ্বিতীয় রকমের ভ্যাকসিন হলো সক (ঝধষশ) ভ্যাকসিন যা পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানী জোনাস এডওয়ার্ড সক তৈরি করেছেন। পরবর্তী সময়ে আলবার্ট স্যাবিন ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন।
ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
এমবিবিএস (সিএমসি), মেডিসিন ও হৃদরোগের চিকিৎসক
