নানা ধরনের ফোবিয়া বা ভীতি

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

সাইকিয়ার্ট্রির ভাষায় ফোবিয়া বা ভীতি একধরনের মানসিক রোগ। ফোবিয়া বা ভীতি বা আতঙ্ক মূলত অতি তীক্ষè উদ্বেগজনিত ব্যাধি যা কোনো সুনির্দিষ্ট বস্তু, অবস্থা, কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ভীতি বা আতঙ্ক হতে উৎপন্ন হয়। শতাধিক ধরনের নির্ণীত ভীতি বা আতঙ্ককে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।

যেমন : প্রাণিজনিত ভীতি, প্রাকৃতিক পরিবেশজনিত ভীতি, রক্ত বা আঘাতজনিত ভীতি, অবস্থাজনিত ভীতি, অন্যান্য উদ্দীপকজনিত ভীতি। উপরোক্ত পাঁচ শ্রেণির ভীতি থেকে কুড়ি রকমের ভীতি বিষয়ে আমরা অধিক অবহিত হই।

সুনির্দিষ্ট অবস্থাজনিত ভীতি : ক্লস্ট্রোফোবিয়া বা বদ্ধস্থানজনিতভীতি, অ্যারোফোবিয়া বা উড্ডয়নভীতি, অ্যাগোরাফোবিয়া বা ভিড় কিংবা মুক্তাঙ্গন ভীতি, গ্লসোফোবিয়া বা বক্তৃতা দেওয়া কিংবা মাইকে কথা বলার ভীতি, অ্যামাক্সোফোবিয়া বা মোটরগাড়ি চালানো বা চড়ার ভীতি।

প্রাকৃতিক পরিবেশজনিত ভীতি : অ্যাক্রোফোবিয়া বা উচ্চতাভীতি, অ্যাকোয়াফোবিয়া বা জলভীতি, অ্যাস্ট্রাফোবিয়া বা বজ্র ও বিজলি ভীতি, থ্যালাসোফোবিয়া বা সমুদ্র কিংবা বড় জলাশয় ভীতি, নিক্টোফোবিয়া বা অন্ধকার ভীতি।

প্রাণিজনিত ভীতি : অ্যারাকেনাফোবিয়া বা মাকড়সাভীতি, অফিডিওফোবিয়া বা সর্পভীতি, সায়নোফোবিয়া বা কুকুরভীতি, অরনিথোফোবিয়া বা পাখিভীতি, এন্টোমোফোবিয়া বা পতঙ্গভীতি।

রক্ত, ক্ষত ও মেডিকেলজনিতভীতি : ট্রাইপেনোফোবিয়া বা ইঞ্জেকশন সুঁই ভীতি, হেমোফোবিয়া বা রক্তভীতি, ডেন্টোফোবিয়া বা দাঁতের চিকিৎসাজনিতভীতি।

অন্যান্য কারণজনিত ভীতি : মিসোফোবিয়া বা কীটাণু ও সংক্রমণ ভীতি, ইমেটোফোবিয়া বা বমন ভীতি।

ফোবিয়ার উপসর্গ : ফোবিয়ার কারণে শারিরীক, আবেগীয় এবং আচরণজনিত উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন- বুকে ব্যথা বা বুক জ্যাম জ্যাম অনুভূত হওয়া, অতিরিক্ত শীতলতা বা অতিরিক্ত উষ্ণতা অনুভব করা, চুপসে যাওয়ার অনুভূতি হওয়া, নিজের বোধবুদ্ধি লোপ পাওয়া, শ্বাসকষ্ট বোধ করা, মাথা ঘোরা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, বমি বমি ভাব হওয়া, হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হওয়া, কাঁপাকাঁপি শুরু হওয়া, অতিরিক্ত ঘামানো, ফ্যাকাশে মুখ হওয়া, আত্মণ্ডনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, মৃত্যুভয় তৈরি হওয়া।

ফোবিয়ার কারণ : ফোবিয়ার সঠিক কোনো কারণ আজও বের করা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, কতিপয় নিয়ামকসমষ্টি মানুষের মনে ফোবিয়া বা আতঙ্ক তৈরি করে।

জিনগত উপাদান : কিছু কিছু পরিবারে জিনগত কারণে ফোবিয়া তৈরি হয়। যেমন : কোনো পরিবারে কেউ ক্যান্সারে মারা গেলে পরবর্তীতে যে কারও ঐ ধরনের উপসর্গে ভীতি তৈরি হয়।

বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা : শৈশবে কুকুরে কামড়ের অভিজ্ঞতা থাকলে বড় হলে তার এ আতঙ্ক থেকে যায়।

লিঙ্গভেদ : পুরুষ অপেক্ষা নারীদের ফোবিয়াগ্রস্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। বিষণ্ণতা ফোবিয়া তৈরি করে।

কিছু কিছু মানসিক ব্যাধি যেমন : অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার, উদ্বেগজনিত ব্যাধি, আঘাতোত্তর হতাশা বা মানসিক চাপগ্রস্ততা ব্যক্তির মনে ফোবিয়া উৎপাদন করে।

কতিপয় সাধারণ ফোবিয়া বা ভীতি : অ্যারাকনোফোবিয়া বা মাকড়সাভীতি, ওফিডিওফোবিয়া বা সর্পভীতি, জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার ভীতি, অ্যাক্রোফোবিয়া বা উচ্চতাভীতি, সামাজিক আচরণজনিত ভীতি। এরমধ্যে গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা সাতাত্তর ভাগ মানুষের কমবেশি জনসমক্ষে কিছু বলার ভীতি বা বক্তব্য দেওয়ার ভীতি রয়েছে।

বিরল ভীতিগুলোর মধ্যে স্পেক্ট্রোফোবিয়া বা আয়নাভীতি, চিক্লেফোবিয়া বা চুইংগাম চিবানো ভীতি, দীর্ঘ ও কঠিন শব্দ উচ্চারণে ভীতি উল্লেখযোগ্য।

চিকিৎসা : ফোবিয়া বা ভীতি চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময়যোগ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব মেন্টাল হেলথের তথ্যমতে প্রাপ্তবয়ষ্ক জনসংখ্যার শতকরা ১২.৫ শতাংশ তাদের জীবনকালে কোনো না কোনো ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়। ফোবিয়া জীবনকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে এবং জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে হানি ঘটায়। ফোবিয়ার চিকিৎসা থেরাপি এবং ঔষধের যুগপৎ প্রয়োগে কার্যকর।

ফোবিয়া উপশমে প্রয়োগকৃত ঔষধ : সিলেক্টিভ সেরোটনিন রি-আপটেক ইনহিবিটর, বিটা ব্লকার, উদ্বেগ প্রশমনকারী ঔষধ ইত্যাদি প্রয়োগে ফোবিয়া বা ভীতি বা আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যায়।