মাতৃদুগ্ধ : কথোপকথনের অনন্য সংকেত
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া
সাদামাটাভাবে দুধ হচ্ছে শিশু হতে বুড়ো সবার জন্যে সহজপাচ্য সরল খাবার। মাতৃগর্ভ হতে পৃথিবীতে অবতরণের পর শিশু আহার হিসেবে গ্রহণ করে মাতৃদুগ্ধ। পৃথিবীতে ডাইনোসরের আগমনেরও আগে হতে মাতৃদুগ্ধের বিকাশ ঘটেছিল। সে হিসেবে এ ইতিহাস প্রায় দুশো মিলিয়ন বছরেরও পুরনো। মাতৃদুগ্ধ নিয়ে গবেষণা করতে করতে আজ এ সত্য আবিষ্কৃত হয়েছে যে, মাতৃদুগ্ধ যতটা না আহার তার চেয়ে অধিক হলো তথ্যভান্ডার। আরও পরিষ্কার করে বললে বলতে হয়, মা ও শিশুর ভাব বিনিময়ের মাধ্যম। মানুষের আঙুলের অগ্রভাগের ছাপ যেমন যারটা তার এবং অনন্য, তেমনি গবেষণায় জানা গেছে, প্রতিটি মায়ের দুগ্ধে স্বাতন্ত্র্য আছে।
এক মায়ের স্তন্যের সঙ্গে আরেক মায়ের স্তন্যের পার্থক্য আছে। এমনকি মায়ের বয়সের ভিন্নতায় মাতৃদুগ্ধেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে। মাতৃদুগ্ধ সম্পর্কে কেটি হিন্ডের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য সম্পর্কে অবগত হওয়ার আগে আমাদের জানা উচিত, মাতৃদুগ্ধের উপাদান ও উপকারিতাগুলো কী কী।
মায়ের দুধে বিদ্যমান উপাদান ও উপকারিতা : মায়ের দুধে পানি থাকে ৮৭-৮৮ শতাংশ। কঠিন দ্রব থাকে প্রতি লিটারে ১২৪ গ্রাম। এরমধ্যে ৭ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট ১ শতাংশ প্রোটিন, ৩.৮ শতাংশ চর্বি বা স্নেহ। শালদুধে চর্বি কম কিন্তু উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও রোগ প্রতিরোধক উপাদান থাকে। ক্ষুদ্র রাইবোনিউক্লিয়িক এসিড সমৃদ্ধ মাতৃদুগ্ধ শিশুর জন্যে সংক্রমণ মোকাবেলায় এক বড় হাতিয়ার। মাতৃদুগ্ধে বিদ্যমান লিনোলিক এসিড মানবদেহের জন্যে একটি অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, চোখের ও রক্তনালীর গঠনে অতি আবশ্যক। মায়ের দুধে কেসিন নামের এক প্রকার প্রোটিন আছে যার পরিমাণ শতকরা পঁয়ত্রিশ ভাগ যা গরুর দুধের চেয়ে অনেক কম। হোয়ে প্রোটিন নামে আরেকটি উপাদানের পরিমাণ থাকে গরুর দুধের তুলনায় বেশি। ফলে শিশুর পক্ষে মাতৃদুগ্ধ হজমে সহজ হয়।
মায়ের দুধে ল্যাকটোজের পরিমাণ তুলনামূলকভাবেই অনেক বেশি থাকে। ল্যাকটোজ শিশুর মস্তিষ্কের গঠন ও বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং শিশুর বুদ্ধি ও বিকাশ বাড়ায়। এছাড়া ল্যাকটোজ শরীরের ভেতর ক্যালসিয়াম টেনে নিতে সাহায্য করে। ফলে শিশুদের রিকেটস রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
মায়ের দুধে বিদ্যমান আয়রনের শতকরা পঞ্চাশভাগ শিশুর দেহে শোষিত হয়। ফলে শিশু আয়রন ঘাটতিতে ভোগে না। মায়ের দুধে ভিটামিন সি-সহ সব ভিটামিন পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। যদিও পরবর্তীতে বয়স বাড়লে ভিটামিন এ ও ডি-এর চাহিদা খাদ্য থেকে মিটিয়ে নিতে হয়। মায়ের দুধে সংক্রমণ প্রতিরোধী এন্টিবডি ও শ্বেত রক্তকণিকা থাকে যা শিশুকে পাতলা পায়খানা, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, কানের প্রদাহ, মেনিনজাইটিস এবং প্রস্রাবের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মায়ের দুধ পানে শিশু প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম পেয়ে থাকে।
মাতৃদুগ্ধ নিয়ে গবেষণা ও কেটি হিন্ডে : ড. ক্যাথেরিন হিন্ডে বা কেটি হিন্ডে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির কম্পারেটিভ ল্যাকটেশন ল্যাবের একজন গবেষক। মাতৃদুগ্ধ কীভাবে মানবজীবনের প্রথম প্রহর থেকেই জীবনকে প্রভাবিত ও বিকশিত করে তা নিয়ে আছে তার নানা যুগান্তকারী আবিষ্কার। তার গবেষণার বিষয় হলো মাতৃ স্তন্যপান। এখানে তিনি মায়ের দুধের মধ্যে বিদ্যমান হরমোন, পুষ্টি ও ওষুধের অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করেন।
হিন্ডের গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে, মায়ের দুধে থাকা চর্বি, প্রোটিন, খনিজ, চিনি, ব্যাকটেরিয়া এবং হরমোনের সংমিশ্রণ আঙুলের ছাপের মতনই অদ্বিতীয় এবং প্রসবোত্তর জীবন থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া অবধি তা শিশুর বিকাশ ও বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। মানুষের বুকের দুধে দুশোর অধিক রকমের অলিগোস্যাকারাইড আছে। শিশুরা এগুলো হজম করতে পারে না, বরং এ অলিগোস্যাকারাইডগুলো অন্ত্রের রোগজীবাণুগুলিকে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়।
ড. কেটি হিন্ডে শনাক্ত করেছেন যে, ছোট বানর মায়েদের দুধে বয়স্ক বানর মায়েদের তুলনায় কম ক্যালোরি থাকে। কিন্তু স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল বেশি থাকে। তার গবেষণায় জানা গেছে, বেশি কর্টিসল শিশুদের আরও সক্রিয় এবং খেলাধুলাপূর্ণ রাখতে অবদান রাখে। রেসাস ম্যাকাক প্রজাতির বানর মায়েদের স্তন্য নিয়ে তিনি বিশ্লেষণ করেছিলেন। তার গবেষণায় দেখা গেলো, পুত্রসন্তানের জন্মদানকারী বানর মায়েরা যে দুগ্ধ উৎপন্ন করেছেন তা ফ্যাট ও প্রোটিনে তুলনামূলক অধিক সমৃদ্ধ। অপরপক্ষে কন্যাসন্তানের জন্মদানকারী বানর মায়েরা যে দুগ্ধ উৎপন্ন করেছেন, তা পরিমাণে তুলনামূলকভাবে খুবই বেশি ও এর পুষ্টি উপাদানের অনুপাতও ভিন্ন। তিনি ২৫০ এর বেশি মায়ের দুগ্ধ হতে ৭০০’র বেশি নমুনা তৈরি করে বিশ্লেষণ করলেন। এতে তিনি নিশ্চিত হলেন, মাতৃদুগ্ধ শুধুমাত্র দেহ গঠন করেনি, একইসঙ্গে তৈরি করেছে শিশুর মেজাজ বা আচরণ।
