নবজাতকের নাড়ি বাঁধা
যত দেরি তত লাভ
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

মানুষ নাড়ির টানে ফিরে যায় শেকড়ে। মায়ের গর্ভে সন্তানের নাড়ির বন্ধনও তেমনি গভীর। তবে সন্তান জন্মের পর নাড়ি কখন বাঁধতে ও কাটতে হবে, তা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা দেরিতে নাড়ি বাঁধার পক্ষে মত দিয়েছে।
মায়ের সঙ্গে সন্তানের নাড়ির সম্পর্ক : নাড়ি একটি নমনীয় নালিকা, যার মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশু মায়ের গর্ভফুল বা অমরা থেকে অক্সিজেন ও পুষ্টি পায়। এতে তিনটি রক্তনালি থাকে—একটি শিরা ও দুটি ধমনি। শিরাটি অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত শিশুর কাছে পৌঁছে দেয় এবং ধমনিগুলো শিশুর শরীর থেকে রক্ত গর্ভফুলে ফিরিয়ে নেয়। জন্মের পর নাড়ির প্রয়োজন ফুরিয়ে আসে। এটি কাটলে মা বা শিশু কেউই ব্যথা অনুভব করে না, কারণ নাড়িতে ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ু নেই। কাটার পর অবশিষ্ট অংশ সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে ঝরে পড়ে।
নাড়ির অস্বাভাবিকতা ও জটিলতা : গর্ভাবস্থায় নাড়ি অতিরিক্ত প্যাঁচানো, গলার চারপাশে জড়িয়ে থাকা কিংবা গিঁটযুক্ত হতে পারে। গলায় নাড়ি ঢিলাভাবে জড়ানো থাকলে সাধারণত সমস্যা হয় না, তবে শক্তভাবে জড়িয়ে গেলে প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দিতে পারে। নাড়িতে দুটি ধমনির পরিবর্তে একটি ধমনি থাকাও কিছু জন্মগত ত্রুটির ইঙ্গিত হতে পারে। কখনো নাড়িতে সিস্ট তৈরি হয়, যা রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
শিশুর আগে নাড়ি জন্মপথে নেমে আসাকে কর্ড প্রোল্যাপ্স বলে। এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়; শিশুর জীবন রক্ষায় দ্রুত প্রসব, প্রয়োজনে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করতে হয়। আবার নাড়ির রক্তনালি অরক্ষিত অবস্থায় জরায়ুমুখের কাছে থাকলে প্রসবের সময় ফেটে গিয়ে মারাত্মক রক্তক্ষরণ ঘটতে পারে। গর্ভফুলের সঙ্গে নাড়ির অস্বাভাবিক সংযোগও শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
নাড়ি কাটার উপযুক্ত সময় : সন্তান জন্মের পরপরই নাড়ি বাঁধা ও কাটার প্রচলন দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল। দ্রুত নাড়ি কাটার পক্ষে যুক্তি ছিল, এতে শিশুর শরীরে অতিরিক্ত রক্ত প্রবেশ করে রক্তকণিকার ঘনত্ব বেড়ে যাওয়া, রক্তসঞ্চালনে সমস্যা কিংবা জন্ডিসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, যথাযথ পরিস্থিতিতে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নাড়ি বাঁধলে শিশুর উপকার হয়।
দেরিতে নাড়ি বাঁধার অর্থ হলো জন্মের পরপরই না কেটে সাধারণত অন্তত ৩০ু৬০ সেকেন্ড অপেক্ষা করা। এ সময়ে গর্ভফুল থেকে শিশুর শরীরে অতিরিক্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে আয়রনের মজুদ বাড়ে, যা জীবনের প্রথম ছয় থেকে আট মাসে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া শিশুর রক্তসঞ্চালন স্থিতিশীল হতে সহায়তা করে। বিশেষ করে অপরিণত নবজাতকের ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এবং অন্ত্রের গুরুতর প্রদাহের ঝুঁকি কমাতে পারে। নাড়ির রক্তে থাকা স্টেম সেল বা আদি কোষও শিশুর শরীরে পৌঁছায়।
দেরিতে নাড়ি বাঁধার পক্ষে চিকিৎসাবিজ্ঞান : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক ডা. কাজল কান্তি চৌধুরী দেরিতে নাড়ি বাঁধার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ২০১২ ও ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো এ বিষয়ে আলোচনা জোরাল করে। এসব গবেষণার আলোকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করেন।
বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিষয়ক সংস্থা দেরিতে নাড়ি বাঁধার সুপারিশ করে। তবে মা ও শিশুর শারীরিক অবস্থা এবং প্রসবকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। নবজাতকের নিরাপদ জন্ম নিশ্চিত করাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
