রক্তে কোলেস্টেরল প্রতিকারে করণীয়
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ডা. পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

কবজি ডুবিয়ে মাংস খাওয়া বাঙালি বাড়ির গোয়ালের গরুর এক-দেড় লিটার দুধ সাবাড় করতে না পারলে একসময় নিজের পৌরুষের জন্য তা হানিকর মনে করেছে। কিন্তু যতই চিকিৎসাব্যবস্থা আধুনিক হতে শুরু করল, ততই সেই পৌরুষেয় মানুষকে পেয়ে বসল রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের ভীতি। আগেকার দিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও দুর্বলতার কারণে কোলেস্টেরলের উচ্চমাত্রা নির্ণয় করা সম্ভব হতো না। ফলে স্ট্রোক কিংবা হার্ট অ্যাটাকজনিত মৃত্যুগুলো হয়ে উঠত আলগা বাতাসে মৃত্যুর সান্ত্বনামূলক ব্যাখ্যা। কিন্তু উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার বদৌলতে আজ আমরা জানতে পেরেছি, কোলেস্টেরলের উচ্চমাত্রাই এসব রোগীর নীরব ঘাতক।
কোলেস্টেরল কী : কোলেস্টেরল এক ধরনের মোমসদৃশ চর্বিবিশেষ, যা রক্তে প্রবাহিত হয়ে অতিমাত্রার কারণে জমাট বেঁধে প্লাক তৈরি করে এবং রক্তনালির গতিপথ আটকে দেয়। কোলেস্টেরল লাইপোপ্রোটিন জাতীয় প্রোটিনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তৈরি করে হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা উচ্চ ঘনত্বের লাইপোপ্রোটিন, যা এইচডিএল নামে পরিচিত। এটাকে ভালো কোলেস্টেরল বলে। কারণ, এটি রক্ত থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কোলেস্টেরল অপসারণ করে। ভেরি লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা ভিএলডিএল আছে, যেগুলো খারাপ কোলেস্টেরল নামে পরিচিত। এগুলো রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। এর পাশাপাশি ট্রাইগ্লিসারাইড নামে বিশেষ ধরনের চর্বি আছে, যা আমাদের দেহের জন্য অতিমাত্রায় হলে ক্ষতিকর। কোষের স্বাভাবিক কাজের জন্য স্বাভাবিক মাত্রার কোলেস্টেরল প্রয়োজন। কিন্তু এর বেশি হলেই তা ক্ষতিকর। রক্তে টোটাল কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ১৫০ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম। এর ওপরে গেলেই তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তেমনিভাবে ট্রাইগ্লিসারাইডের স্বাভাবিক মান প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ১৫০ মিলিগ্রাম, এইচডিএলের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৪০ থেকে ৬০ মিলিগ্রাম, যা এর চেয়ে যত বেশি হবে, তত বেশি ভালো। ভেরি লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৩০ মিলিগ্রামের কম থাকে।
বেশি কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাদ্য : ডিমের কুসুম, লাল মাংস যেমন গরু-খাসির মাংস, বড় বড় চিংড়ি, পনির ও ঘনীকৃত দুগ্ধজাত খাদ্য, নারকেল ইত্যাদি।
কম কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাদ্য : বিভিন্ন রকমের ফল, শাকসবজি, সামুদ্রিক মাছ, মাছের তেল প্রভৃতি।
কোলেস্টেরলের মান নিরূপণী পরীক্ষা : ফাস্টিং লিপিড প্রোফাইল বা রাতে খাওয়ার পর সকালে প্রাতরাশ না করে রক্ত থেকে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা।
অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের ক্ষয়ক্ষতি : রক্তনালির রক্তসংবহন ক্ষমতা হ্রাস করে, বিভিন্ন অঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমে যায়, হার্ট অ্যাটাক হয়, বুকে ব্যথা বা অ্যানজাইনা হয়, শ্বাসকষ্ট ও ক্লান্তি তৈরি হয়, ব্রেন স্ট্রোক হয়, যৌন সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
কোলেস্টেরলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা : অতিরিক্ত মেদবহুলতা, বিশেষত যাদের বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) ৩০-এর বেশি, যাদের শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস কম, যারা ধূমপায়ী ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে অ্যালকোহল সেবন করেন, যাদের ডায়াবেটিস আছে, উচ্চ রক্তচাপের রোগী, যাদের হৃদ্?রোগ আছে— এ ধরনের মানুষ কোলেস্টেরল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেন।
অতিরিক্ত কোলেস্টেরল থেকে বাঁচার উপায় : শারীরিক পরিশ্রম বাড়াতে হবে, দেহের ওজন বডি মাস ইনডেক্স অনুযায়ী কমিয়ে আনতে হবে, ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবন বন্ধ করে দিতে হবে, অতিরিক্ত লবণ ও চিনি পরিহার করতে হবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, মানসিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে নিজেকে, পর্যাপ্ত বিনোদনের মাধ্যমে মনোদৈহিক সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ করতে হবে।
কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর ওষুধ : আজকাল বাজারে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর বিভিন্ন ওষুধ এসেছে। এর মধ্যে অ্যাটরভাস্টেটিন, রোসুভাস্টেটিন উল্লেখযোগ্য। আবার রক্তে অতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে বিভিন্ন লিপিড-লোয়ারিং এজেন্ট (যেমন : লিপিরেড ক্যাপসুল) বাজারে প্রচলিত আছে। রক্তে এইচডিএলের মাত্রা বৃদ্ধিতে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডও ক্যাপসুল আকারে বাজারে পাওয়া যায়, যা নিরাপদে সেবনযোগ্য।
