‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের নৌ অবরোধ

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে ইরান যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে এরইমধ্যে চরম সংকটে ফেলেছে, গত সোমবার হুতিদের দেওয়া এই পদক্ষেপের ঘোষণায় সেই সংকট নতুন করে আরও বেশি অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানিয়েছে, ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতির ভিত্তিতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ‘নৌ অবরোধ’ কার্যকর করা হচ্ছে। তাদের দাবি, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরব যে ‘অন্যায় ও নিপীড়নমূলক অবরোধ’ আরোপ করেছে, তার জবাব হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

লোহিত সাগর উপকূল বরাবর নিজেদের উত্তরের প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিরা কীভাবে এই সামুদ্রিক অবরোধ বাস্তবায়ন করবে কিংবা জাহাজে পুনরায় হামলা চালানো শুরু করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইয়েমেন বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবস্থিত; লোহিত সাগরের দক্ষিণের প্রবেশদ্বার। এটি বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের মধ্যকার সার্বিক সংঘাতের একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরি হবে। হরমুজ প্রণালি এরইমধ্যে অবরুদ্ধ হওয়ায় লোহিত সাগর দিয়ে পারস্য উপসাগরের তেল এবং অন্যান্য পণ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল। সেখানে বড় ধরনের কোনো বাধা সৃষ্টি হওয়ার অর্থ মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রফতানি পথই একযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়া।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের আংশিক অবরোধ পারস্য উপসাগর থেকে বেশির ভাগ তেল ও অন্যান্য রফতানি ব্যাহত করে; যার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। এর জবাবে সৌদি আরব তাদের দৈনিক অপরিশোধিত তেল রফতানির ৭০ শতাংশেরও বেশি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। ইয়ানবু থেকে ইউরোপগামী সব জাহাজ উত্তরে সুয়েজ খাল হয়ে যায়। আর এশিয়ামুখী জাহাজগুলো দক্ষিণে বাব আল-মান্দেব হয়ে চলাচল করে।

জাহাজ চলাচলের তথ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার ও সিগন্যাল ওশান বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইয়ানবু থেকে গড়ে প্রতিদিন ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ৯ লাখ ৭৩ হাজার ব্যারেল। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে বাব আল-মান্দেব দিয়ে মোট ৭৪ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পরিবহন করা হয়েছে; যা বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের প্রায় ৭ শতাংশ। এটি গত বছরের ৪২ লাখ ব্যারেলের তুলনায় অনেক বেশি।

বাব আল-মান্দেব হয়ে এই পরিবহন জ্বালানি বাজারের জন্য জীবনরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করছিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছিল। গত সপ্তাহে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত নিজেদের অপরিশোধিত তেলের পাইপলাইন সম্প্রসারণের কথা বিবেচনা করছে সৌদি আরব। অথচ ২০২৩ সালের নভেম্বরে হুতিরা যখন লোহিত সাগরে জাহাজগুলোতে আক্রমণ শুরু করেছিল, তখন পারস্য উপসাগরের তেল রফতানি একেবারে নির্বিঘ্নেই চলছিল।

১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে হুতিদের আত্মপ্রকাশ ঘটে; যারা সানা সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে আসছিল। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে আসছে এই গোষ্ঠীটি। দেশটির যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি গত সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সানার বিমানবন্দরে একটি ইরানি বিমানের অবতরণ ঠেকানোর জন্য হামলা চালানোর দাবি করার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।