ইরানে হামলা চালিয়ে নিজের পায়েই কুড়াল মারল ইউক্রেন

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক

একপ্রান্তে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, অন্যপ্রান্তে ইরান যুদ্ধ- এই দুই সংঘাত কখনও একবিন্দুতে এসে মিলবে কি না, তা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগে ছিল বিশ্ব। এবার ইউক্রেনের এক পদক্ষেপে সেই উদ্বেগ রীতিমতো আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে এক নাবিক নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ইরান। কিয়েভের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে এখন একটিই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর তা হলো, ইরানের জাহাজে এই দুঃসাহসিক হামলা চালিয়ে ইউক্রেন কি আসলে নিজের পায়েই কুড়াল মারল? সম্প্রতি ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী কাস্পিয়ান সাগরে এক অভূতপূর্ব সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিজেই এই অভিযানের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তাদের বাহিনী দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে কাস্পিয়ান সাগরে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। এই হামলায় রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক কার্গো বহনকারী জাহাজকে টার্গেট করা হয়।

ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ (ঝইট) এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যেসব জাহাজ রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম ও লজিস্টিকস পরিবহন করছিল, সেগুলোর ওপরই এই নিখুঁত ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার মাধ্যমে ইউক্রেন স্পষ্ট করে দিলো যে, রাশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে তারা যে কোনো সীমানা পার হতে প্রস্তুত। ইউক্রেনের এই হামলাকে ইরান মোটেও হালকাভাবে নেয়নি। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ (ওজঘঅ) জানিয়েছে, কাস্পিয়ান সাগরে গত শনিবারের এই ড্রোন হামলার কারণে তাদের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই এক ইরানি নাবিক নিহত হন এবং আরেকজন গুরুতর আহত হন। এই ঘটনার পর তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের চার্জ দি অ্যাফেয়ার্স বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলাকে একটি ‘শত্রুভাবাপন্ন ও অপরাধমূলক কাজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাসের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। তিনি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, ইরান হুংকার দিয়েছে যে, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় যে কোনো ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না।

ইউক্রেন ও ইরানের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত অবশ্য নতুন নয়। ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই ইউক্রেন অভিযোগ করে আসছে, ইরান রাশিয়াকে হাজার হাজার ‘শাহেদ’ আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহ করছে। কিয়েভের দাবি অনুসারে, যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তারা রাশিয়ার ছোড়া ৪৪ হাজারেরও বেশি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

কিন্তু ইরান সবসময়ই দাবি করে এসেছে, তারা এই যুদ্ধে কোনো পক্ষ অবলম্বন করেনি এবং রাশিয়াকে কোনো অস্ত্র দিচ্ছে না। এর জবাবে ইউক্রেনও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। তারা কেবল নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাই জোরদার করেনি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতাও বাড়িয়েছে।

ইউক্রেন এরই মধ্যে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েতের মতো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে তাদের বিশেষায়িত ড্রোন ইন্টারসেপ্টর দল পাঠিয়েছে। এই দলগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করার কৌশল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

তবে কাস্পিয়ান সাগরের বুকে সরাসরি ইরানি জাহাজে আঘাত হানা ইউক্রেনের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। জাহাজে হামলার ঘটনার পরপরই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। তিনি দাবি করেছেন, রাশিয়া মহাকাশে তাদের সামরিক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটির ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। আর এই নজরদারির সব গোপন ছবি ও তথ্য সরাসরি ইরানের কাছে হস্তান্তর করছে রাশিয়া।

জেলেনস্কির মতে, বাহরাইন, জর্ডান এবং কুয়েতের মতো দেশের মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরান যেসব ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তার পেছনে রাশিয়ার সরবরাহ করা স্যাটেলাইট ইমেজের বড় ভূমিকা রয়েছে। হামলা চালানোর আগে পরিকল্পনা তৈরি করতে এবং হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে ইরান এই রুশ তথ্য ব্যবহার করছে। ইউক্রেনের এই নতুন অভিযোগ তেহরান ও মস্কোর মধ্যকার সামরিক অক্ষকে আরও বেশি প্রকাশ্য করে তুলেছে। কাস্পিয়ান সাগরে হামলা চালিয়ে ইউক্রেন আসলে এক বিশাল মৌচাকে ঢিল মেরেছে। কারণ, ইরানের সামরিক শক্তি ও তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বিপজ্জনক। ইরানের কাছে এমন কিছু ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।

ইরানের খুররামশাহর, সিজ্জিল বা হাজ কাসেমের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা দুই হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এর অর্থ হলো, ইরান যদি সরাসরি কিয়েভ বা ইউক্রেনের অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে, তবে তা অনায়াসেই ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানবে। এতদিন ইরান সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও, তাদের নিজেদের নাগরিকের মৃত্যু এবং জাহাজে হামলার পর তারা কিয়েভকে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতার আওতাভুক্ত থাকার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ইসরায়েলকে সহায়তার অভিযোগে গত মার্চেই ইউক্রেনকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ ঘোষণা করেছিল ইরান। তেহরানের দাবি, ইসরায়েলকে ড্রোন সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে ইউক্রেন কার্যত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেন, ইসরায়েলি সরকারকে ড্রোন সহায়তা দিয়ে ব্যর্থ ইউক্রেন কার্যত যুদ্ধে প্রবেশ করেছে এবং এর মাধ্যমে তারা নিজেদের পুরো ভূখণ্ডকে ইরানের জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি তেহরান। ইউক্রেন সরকারও আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে ড্রোন সহায়তা দেওয়ার কথা স্বীকার করেনি। তবে দেশটি কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের দল পাঠিয়েছিল। ইউক্রেন এখন এমনিতেই রাশিয়ার সামরিক চাপের মুখে রয়েছে। দেশটির পূর্ব ও দক্ষিণ ফ্রন্টলাইনগুলোতে তীব্র লড়াই চলছে। এমন এক পরিস্থিতিতে ইরানের মতো একটি আঞ্চলিক পরাশক্তিকে সরাসরি খেপিয়ে তোলা ইউক্রেনের জন্য কতটা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রথমত, এই হামলার ফলে ইরান এখন রাশিয়াকে আরও আধুনিক ও বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সরবরাহ করতে পারে, যা ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ ও অবকাঠামোর ওপর বিপর্যয় ডেকে আনবে। দ্বিতীয়ত, ইরান কাস্পিয়ান সাগর বা মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ইউক্রেনীয় বা পশ্চিমা স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে কোনো জাহাজে পাল্টা হামলা চালিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।