ঘরে-বাইরে একের পর এক ধাক্কায় 'হতাশ' ট্রাম্প
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য চলতি সপ্তাহটি বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। দেশের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একের পর এক ঘটনায় তার প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও প্রভাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
মেইল-ইন ভোটের নিয়ম বদলানোর উদ্যোগে সুপ্রিম কোর্টের বাধা, কেনেডি সেন্টার নিয়ে আইনি জটিলতা এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত- সব মিলিয়ে চাপ বেড়েছে ট্রাম্পের ওপর।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে মতপার্থক্য এবং কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মেইল-ইন ভোটে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগ আটকে দিয়েছেন মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। ট্রাম্পের প্রশাসন এমন একটি নিয়ম কার্যকর করতে চেয়েছিল, যাতে রাজ্যগুলোকে ভোটারদের তথ্য দিতে হতো এবং ডাকযোগে পাঠানো ব্যালটে নির্দিষ্ট ধরনের খাম ও বারকোড ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকত। সুপ্রিম কোর্টের আদেশে এই নিয়ম আপাতত কার্যকর করা যায়নি।
এর পর ট্রাম্প তার নিয়োগ দেওয়া কয়েকজন বিচারপতির সমালোচনা করেন। বিশেষ করে বিচারপতি ব্রেট কাভানাহ, নিল গোরসাচ ও অ্যামি কোনি ব্যারেটের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টার নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন আইনি বাধার মুখে পড়েছে। কেন্দ্রটি সংস্কারের জন্য প্রায় ২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য কেন্দ্রটি দুই বছর পর্যন্ত বন্ধ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একজন ফেডারেল বিচারক প্রশাসনের কাছে জানতে চেয়েছেন, এই পরিকল্পনা আগের আদালতের আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না।
এর আগে ট্রাম্পের নাম কেনেডি সেন্টারের ভবনের সামনে যুক্ত করার উদ্যোগও আদালতে বাধার মুখে পড়ে। বিচারক বলেছেন, ভবনের নাম পরিবর্তনের মতো বিষয়ে কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। প্রশাসন ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত বুধবার সুদের হার ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়েছে। নতুন সুদের হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ের পর এটি ছিল প্রথম সুদ বৃদ্ধি। নতুন চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শের নেতৃত্বে ফেডের সব নীতিনির্ধারক এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ফেডের সিদ্ধান্তের পর তিনি আবারও কম সুদের পক্ষে অবস্থান নেন। ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার এক শতাংশের কাছাকাছি থাকা উচিত। অন্যদিকে, ফেড মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফেডের কর্মকর্তাদের বড় অংশ চলতি বছর আরও অন্তত একটি সুদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এতে দলের ভেতরে ট্রাম্পের নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরান যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে ট্রাম্প এখনও নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি। ওদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নিয়েছে। এর মধ্যে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে কৌশলগত অবস্থানও রয়েছে। এই পথটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কানাডার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন কানাডাকে ইইউর প্রথম 'সহযোগী সদস্য' করার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি কার্যকর করতে ইইউর সদস্যদেশগুলোর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ট্রাম্প এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। কানাডাকে সহযোগী সদস্য করার উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি 'শত্রুতামূলক' পদক্ষেপ মনে হলে ইউরোপের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন তিনি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি অবশ্য ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এসব ঘটনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব এবং রিপাবলিকান পার্টির ঐক্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মেইল-ইন ভোট, ইরান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক নীতি- প্রতিটি ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গে দলের সব আইনপ্রণেতার অবস্থান মিলছে না। তবে এসব ঘটনার ভিত্তিতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই সম্ভব নয়। তিনি এর আগেও নানা রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। সামনের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের প্রতিক্রিয়া এবং কংগ্রেসের ফলাফলই তার প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, কানাডা-ইইউ ঘনিষ্ঠতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি করছে। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি- দুই ক্ষেত্রেই একাধিক চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামনে এসেছে।
