৯৬ শতাংশ মুসলিমের দেশ আজারবাইজানে হিজাব নিষিদ্ধ
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক

মুসলিম দেশ আজারবাইজানে স্কুলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের হিজাব পরার ওপর পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
নতুন পোশাকবিধির কারণে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। গত সোমবার আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে অনুমোদিত সংশোধনীতে সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন পোশাক পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা সরকারের ভাষায় 'ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি' লঙ্ঘন করে। নতুন এ বিধির আওতায় হিজাব পরা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
শিক্ষিকা জাহরা হাসানোভা আলজাজিরাকে বলেন, স্কুলে আর হিজাব পরতে পারবেন না বলে তাকে জানানো হয়েছে। সত্যি বলতে, আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ। এতে আমি কষ্ট পেয়েছি। হিজাব পরা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কোনো দিন খুলে ফেলতে চাইলে সেটিও আমার সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এপিএ জানিয়েছে, সরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পোশাকবিধিতে সংশোধন আনার উদ্দেশ্য হলো দেশের 'ধর্মনিরপেক্ষ নীতি'র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিন্ন পোশাকবিধি নিশ্চিত করা।
দেশটির প্রায় ৯৬ শতাংশ মানুষ মুসলিম। তবে সংবিধানে আজারবাইজানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছে। নতুন বিধিতে বলা হয়েছে, আজারবাইজানের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে- এমন পোশাক বিশেষ অনুষ্ঠানে পরার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষাবিষয়ক পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাটির ভাষ্য, পোশাকবিধি শিক্ষকদের পেশাগত মান বজায় রাখতে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়তা করবে।
নতুন বিধির প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, হিজাব পরার কারণে স্কুলে ঢুকতে না পেরে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, একাধিক স্কুলের শিক্ষার্থীরা নতুন বিধির প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করেছে। এদিকে, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ২০২০ সালে দণ্ডিত হয়ে কারাবন্দি সাংবাদিক পোলাদ আসলানভ নতুন পোশাকবিধির প্রতিবাদে অনশন শুরু করেছেন। তার স্ত্রী গুলমিরা আসলানোভার ফেসবুক পোস্টে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, 'কারাগারে থেকেও আমার সাংবিধানিক অধিকার পদদলিত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমার হাতে থাকা একমাত্র প্রতিবাদের উপায়- অনশন।'
এদিকে দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার খবরও ছড়িয়েছে। তবে ওপেন অবজারভেটরি অব নেটওয়ার্ক ইন্টারফেরেন্স ও নেটব্লকসের মতো পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য থেকে এ ধরনের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অন্যদিকে আজারবাইজানের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রতিবেশী তুরস্কেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারাভিযান ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশ দুটির পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৯৭ সালে তুরস্কে সংঘটিত 'উত্তরাধুনিক অভ্যুত্থান'-এর তুলনা টেনেছেন অনেকে। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব পরা নারীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে কর্মরত হিজাব পরা নারীদের বরখাস্ত করা হয়েছিল অথবা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ করেন প্রতিবাদকারীরা। মুসলিম নারীদের পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার জন্য বাকুর কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তারা। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এ বিক্ষোভের বিষয়ে সরাসরি তুরস্কের নাম উল্লেখ না করলেও দেশটির প্রতি পরোক্ষ সমালোচনা করেন। নিজের দল নিউ আজারবাইজান পার্টির কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, অন্যদের উচিত নয় আজারবাইজানের 'জীবনযাপনের ধরনে হস্তক্ষেপ করা'।
উল্লেখ্য, আজারবাইজান মুসলিম দেশ হলেও সৌদি আরবের মতো গোপনে ইসরায়েলের সঙ্গে সখ্যতা রয়েছে। ইসরায়েলকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল দেয় এই আজারবাইজান।
