প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ মে, ২০২২
ঈদুল ফিতর পুরস্কারের দিন
আজ পুরস্কার পাওয়ার দিন। এ দিনে আল্লাহতায়ালা রমজান মাসে যারা সিয়াম পালন করেছেন, কিয়াম করেছেন, বিভিন্ন নেক আমল করেছেন এবং নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন, তাদের পুরস্কার দিয়ে থাকেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন ফেরেশতারা রাস্তার মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে এবং মানুষদের আহ্বান করতে থাকে- হে মুসলমান! আল্লাহর দিকে এসো। আল্লাহ মানুষকে ভালো কাজ করার শক্তি দেন। এরপর তার উত্তম প্রতিদান দিয়ে থাকেন। তোমাদের আল্লাহ কিয়ামুল লাইল আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা আদায় করেছ। আল্লাহ তোমাদের সিয়াম পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা সিয়াম পালন করেছ। আল্লাহর আনুগত্য করেছ। এখন আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান গ্রহণ করো।’ ঈদের নামাজ শেষ হয়ে গেলে ফেরেশতা বলতে থাকে, ‘তোমাদের মাফ করে দেওয়া হয়েছে। এখন তোমরা সফল। গোনাহমুক্ত হয়ে ঘরে ফিরে যাও। আজ পুরস্কারের দিন। আসমানে এ দিনকে পুরস্কারের দিন বলা হয়।’ (তাবারানি)।
দোয়া কবুলের দিন
ঈদের নামাজের জন্য সমবেত লোকদের দোয়া আল্লাহতায়ালা কবুল করেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে আমার বান্দা! আমার কাছে প্রার্থনা করো। আমার ইজ্জতের কসম, ঈদের নামাজে একত্রিত হয়ে আমার কাছে কল্যাণকর যা চাইবে, আমি দেব। আমি বিশেষভাবে তোমাদের খেয়াল রাখব। আমি তোমাদের সবাইকে মাফ করে দিয়েছি। তোমরা আমাকে খুশি করতে চেয়েছ, আমিও তোমাদের ওপর খুশি হয়েছি।’
ঈদের দিনে শরিয়তের বিধান
ইসলামে দুটি ঈদ। এর মধ্যে একটি হলো ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ রোজার পরে, আর অন্যটি হজের পরে। ঈদের মাধ্যমে মূলত বান্দা ফরজ রোজা এবং ফরজ হজ পালন শেষ করে আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করে। এর মাধ্যমে ইসলামের নিদর্শন প্রকাশ পায়। মূলভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। জুমা হচ্ছে সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এ দিনে বিশেষ নামাজ আদায় করা হয়। ঈদের দিনের সঙ্গে শরিয়তের অনেক বিধিবিধান সম্পর্কিত। ঈদের সালাত, খুতবায় আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা এবং শরিয়তের অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা, সদকাতুল ফিতর আদায় করা। রোজায় নিষিদ্ধ কাজগুলো ঈদের দিন থেকে জায়েজ হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আপনি বলুন, আল্লাহ সাজসজ্জাকে (যা তিনি বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন) এবং পবিত্র খাদ্যবস্তু হারাম করেছেন? আপনি বলুন, এসব নেয়ামত আসলে পার্থিব জীবনে মোমিনদের জন্য এবং কেয়ামতের দিন একান্তভাবে তাদের জন্য।’
ঈদুল ফিতর উদযাপনের মাধ্যম
এ উৎসবে আনন্দ উদযাপনের মধ্যে রয়েছে- রোজা শেষ হওয়ার আনন্দ, নতুন পোশাক পরিধান ও নেক আমলের আনন্দ, অন্তরের সম্প্রীতি, পবিত্রতা ও পারস্পরিক স্নেহ-ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি সহানুভূতি এবং অতীতকে ভুলে যাওয়া, আত্মীয় ও কাছের মানুষের সঙ্গে অন্তর পরিষ্কার করে পেছনের কথা মনে না রাখা, সবাইকে আপন করে নেওয়া ইত্যাদি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সব মুসলিম জাতি হচ্ছে একটা পুরো দেহের ন্যায়। যখন এ দেহের কোনো একটি জায়গা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন শরীরের অন্যান্য অংশও ব্যাথিত হয়।’ (বোখারি)।
ঈদের শিক্ষা অন্তরের বক্রতা দূর করে
ঈদ এমন একটি সময়, যখন অন্তরের বক্রতা দূর হয়, কল্যাণকর কাজে সবাই অগ্রসর হয়। মুসলমানদের জন্য এটা আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত। জান্নাতিদের অন্তর হবে প্রশান্ত। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের অন্তরে যে ক্রোধ ছিল, আমি তা দূর করে দেব। তারা ভাই-ভাইয়ের মতো সামনাসামনি আসনে বসবে।’ একবার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘সে-ই উত্তম, যে কখনও মিথ্যা বলে না এবং যে মাখমুমুল কলবের অধিকারী।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাখমুমুল কলব কী?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘মাখমুমুল কলব বলা হয়- যার অন্তরে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ, অত্যাচার অথবা জুলুম নেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)।
আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
প্রকাশ্য এবং গোপন আল্লাহর সব নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা দরকার। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর নেয়ামত গণনা করে কখনোই শেষ করতে পারবে না।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৪)। আল্লাহর নেয়ামত সম্পর্কে গভীর চিন্তা করুন। কারণ, নেয়ামত স্মরণ করার মাধ্যমে আল্লাহর নাফরমানির প্রতি সংকোচ তৈরি হয়। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়; যা পাপ কাজ করতে বাধা প্রদান করে এবং ইবাদত করতে বাধ্য করে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহকে হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসো। কেননা, তার অগণিত নেয়ামত প্রতিনিয়ত আমরা ভোগ করছি। আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করো, তাহলে আল্লাহ নেয়ামত বাড়িয়ে দেবেন। নেয়ামতের ধারাবাহিকতা দান করবেন।’
বান্দার প্রতি আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ
আল্লাহতায়ালা অনেক দয়ালু। তিনি মেহেরবান। সব জ্ঞানের অধিকারী। প্রশস্ত নেয়ামতের মালিক। যদি প্রতিটি সৃষ্টি আল্লাহর প্রশংসা করে এবং ভালোবাসা প্রকাশ করে, তাও আল্লাহর প্রতি শুধু আগের শরিয়ত স্থগিত করার যেই নেয়ামত, তার শোকরিয়া আদায় হবে না। আল্লাহতায়ালা আগের শরিয়তের অনেক বিধিনিষেধ স্থগিত করে আমাদের জন্য ভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। সব হারাম এবং নিষিদ্ধ কাজের ব্যাপারে অনুগ্রহপূর্ণ বিধান আরোপ করেছেন। সব সৃষ্টি হলো আল্লাহর পরিবার। আর আল্লাহর কাছে সেই সৃষ্টিই বেশি ভালোবাসার, যে তার পরিবারের বেশি উপকারে আসে। আল্লাহ আমাদের আবশ্যকীয় আমলের বিধানে বড়ই অনুগ্রহ করেছেন।
কালিমায়ে শাহাদতে আমাদের শিক্ষা
কালিমায়ে শাহাদতের অর্থের দিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমানের জন্য এ কালিমা অনেক বড় দয়া। এর মাধ্যমে শুধু আল্লাহর ইবাদতের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। এ কালিমার মাধ্যমে একজন মুসলমান একাধিক উপাস্যকে বিশ্বাস করা থেকে নিজের ঈমানকে হেফাজত করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সে এমন কিছুকে ডাকে, যার অপকার উপকারের আগে পৌঁছে।’ (সুরা হজ : ১৩)। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস জাহান্নামের আগুন থেকে আমাদের হেফাজত করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন। তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম।’ (সুরা মায়িদা : ৭২)। এমনিভাবে তাওহিদের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দাকে পরিশুদ্ধ করেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর মাধ্যমে আল্লাহর একত্ববাদ এবং মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-এর মাধ্যমে শুধু প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অনুসরণের বিশ্বাস দৃঢ় হয়। মুহাম্মদ (সা.)-এর আনিত শরিয়ত মানতে হবে। সব মত ও মতাদর্শের ওপর রাসুল (সা.)-এর কথা ও মতাদর্শকে প্রাধান্য দিতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে লোক রাসুলের হুকুম মান্য করল, সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল।’ (সুরা নিসা : ৮০)। এ কালিমায়ে শাহাদতের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। পরবর্তীদের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। রাসুল (সা.) নিজে জান্নাত অর্জন করে নিজের ওপর অনুগ্রহ করেছেন, তেমনি অন্যদের শিক্ষা দিয়েও তাদের ওপর করুণা করেছেন।
নামাজ ফরজ করার মাধ্যমে বান্দার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ
নামাজ আবশ্যক করার মাধ্যমেও আল্লাহ আমাদের ওপর দয়া করেছেন। কেননা, নামাজ আমাদের শরীরের জন্য জাকাত। গোনাহ থেকে পবিত্রতা অর্জন করার মাধ্যম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘দিনের দুই প্রান্তের নামাজ ঠিক রাখবে। আর রাতের প্রান্তভাগে পুণ্যের কাজ অবশ্যই পাপ দূর করে দেয়।’ (সুরা হুদ : ১১৪)। একজন মুসলমান নামাজে নিজের জন্য দোয়া করে নিজের ওপর অনুগ্রহ করে। অন্যের জন্য দোয়া করে তাদের প্রতি দয়া করে। রাসুল (সা.)-এর প্রতি দুরুদ পাঠ করে নিজের জন্য কিছু অধিকার আদায় করে নেয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা তাদের নামাজের খবর রাখে, তারাই উত্তরাধিকার লাভ করে। তারা শীতল ছায়াময় উদ্যানের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।’ (সুরা মোমিনুন : ৯-১১)।
জাকাতের মাধ্যমে বান্দার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ
জাকাতের আবশ্যকীয়তা আমাদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। জাহান্নাম থেকে হেফাজত করে। আমাদের সম্পদকে বিপদাপদ থেকে হেফাজত করে। সম্পদে বরকত আসে। গরিবদের প্রতি অনেক অনুগ্রহ হয়।
রোজার বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ
আল্লাহর পক্ষ থেকে রোজা আমাদের জন্য একটা অনুগ্রহ। তা আমাদের অন্তর এবং চরিত্রকে পবিত্র করে। অন্তর থেকে সব পাপাচার দূর হয়ে যায়। যখন একজন ব্যক্তি তার সব চাহিদা পূরণ করে এবং আত্মিক চাহিদাও পূরণ করে, তখন তার অন্তর শক্ত হয়ে যায়। ইবাদতে শিথিলতা চলে আসে। অন্তর নিষিদ্ধ কর্মের দিকে বেশি ধাবিত হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘খাও, পান করো। কিন্তু অপব্যয় কোরো না।’ (সুরা আরাফ : ৩১)। আল্লাহতায়ালা বনি ইসরাইলদের সংশোধনের জন্য হালাল জিনিসকেও হারাম করেছিলেন। যাতে তারা ভালো কাজ করে। অন্যায় ও পাপাচার থেকে নিজেদের হেফাজত রাখে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ইহুদিদের জন্য আমি প্রত্যেক নখবিশিষ্ট জন্তু হারাম করেছিলাম। ছাগল ও গরুর চর্বি হারাম করেছিলাম। কিন্তু ওই চর্বি (যা পিঠে কিংবা অন্ত্রে সংযুক্ত থাকে অথবা অস্থির সঙ্গে মিশে আছে) জায়েজ।’ (সুরা আনআম : ১৪৬)। সিয়াম পালন শারীরিক অনেক গোনাহ থেকে আমাদের হেফাজত করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রোজা পালনকারী নারী-পুরুষ, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী নারী-পুরুষ এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী-পুরুষের জন্য আল্লাহ মহাপুরস্কার রেখেছেন।
১ শাওয়াল ১৪৪৩ (৩ মে ২০২২) তারিখে মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত ঈদুল ফিতরের খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন আল মামুন নূর