প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৮ মে, ২০২২
কোম্পানি আইনের গোড়ার কথা
আনুমানিক নব্বই দশকে ইউরোপে বাণিজ্যের বিভিন্ন ধারণা উদ্ভব হয়। এর মধ্যে গিল্ড বা বণিক সংঘ অন্যতম। গিল্ড অনেকটা বর্তমানের ব্যবসায়ী সমিতির মতো ছিল। যারা ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক অধিকার বাস্তবায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করত। খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে ইংল্যান্ডে গিল্ড ধারণা ব্যাপকতা লাভ করে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ক বিভিন্ন সংবিধান রচনা করত। তাদের এসব সংবিধানকে আইনের মর্যাদা দেওয়ার জন্য সরকারি লাইসেন্স বা চার্টারের প্রয়োজন হয়। ইংল্যান্ডের রাজা এসব চার্টার অনুমোদন করত। ষোড়শ শতকে বহু সংস্থা ও কোম্পানিকে রাজকীয় চার্টার প্রদান করা হয়। ইতিহাসে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এমনই একটি বিখ্যাত চার্টার্ড কোম্পানি হিসেবে পরিচিত।
প্রথম কোম্পানি আইন পাস
সর্বপ্রথম ১৮৪৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কোম্পানি আইন পাস হয়। তখনও তাতে সীমাবদ্ধ দায়ের বিধান ছিল না। পরবর্তী সময়ে ১৮৫৫ সালে সংশোধিত কোম্পানি আইনে প্রথমবার সীমাবদ্ধ দায় যুক্ত হয়।
ব্রিটিশ পিরিয়ড
দেশ বিভক্তির আগ পর্যন্ত উপমহাদেশে ব্রিটিশ পিরিয়ডে কোম্পানি আইন ১৯১৩ প্রচলিত ছিল।
পাকিস্তান পিরিয়ড
দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান উত্তরাধিকারসূত্রে ১৯১৩ সালের আইন বাস্তবায়ন করে। এ সময় আইনের বড় ধরনের কোনো সংশোধন হয়নি।
বাংলাদেশ
জাতীয় সংসদের ১৬তম অধিবেশনে ১৯৯৪ সালে ‘কোম্পানি আইন ১৯৯৪’ নামে সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হয়। এটি ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ সালে পাস হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ প্রচলিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই কোম্পানি আইনে প্রথম উল্লেখযোগ্য সংশোধন।
দ্বিতীয় সংশোধন
২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর কোম্পানি আইন দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন প্রস্তাবের কথা ওঠে। তখন ‘কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০১৮’ নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। এরপর ২০ জুলাই ২০২০ ‘কোম্পানি (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন ২০২০’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।
কী আছে দ্বিতীয় সংশোধনী বিলে?
এ বিলের উল্লেখ্যযোগ্য সংশোধনী হলো ‘এক ব্যক্তি কোম্পানি’ সুযোগ। এতদিন যাবত স্বীকৃত আইন ছিল, পাবলিক কোম্পানিতে অন্যূন তিনজন পরিচালক থাকতে হবে। আর প্রাইভেট কোম্পানিতে অন্যূন দু’জন থাকতে হবে। (ধারা ৯০, কোম্পানি আইন ১৯৯৪)। কিন্তু এখন উক্ত দ্বিতীয় সংশোধনী অনুযায়ী এক ব্যক্তি দিয়েও কোম্পানি করা যাবে। পরিচালক হবে একজন। বোর্ড সদস্য শুধু একজনই থাকবে। সেই শতভাগ শেয়ারের মালিক হবে। এটি নতুন ধারার একটি কোম্পানি হবে। এটি না প্রাইভেট, না পাবলিক। বিলে বলা হয়েছে, এক ব্যক্তির কোম্পানির পরিশোধিত শেয়ার মূলধন হবে অন্যূন ৫০ লাখ টাকা এবং অনধিক ১০ কোটি টাকা। আরও বলা হয়েছে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংসদে এর বিরোধী বক্তব্যও এসেছে। তবে তা আমলে নেওয়া হয়নি।
এক ব্যক্তি কোম্পানি : শরঈ দৃষ্টিকোণ
শরিয়তের আলোকে এক ব্যক্তি কোম্পানি গঠনে মৌলিকভাবে বাধা নেই। এটি তখন কোনো ধরনের শিরকত বা পার্টনারশিপ চুক্তি হবে না। একক ব্যবসা বলে বিবেচিত হবে। তবে পরবর্তীতে সেই এক ব্যক্তি যদি কারও থেকে বিনিয়োগ গ্রহণ করে, তখন তা শরিয়া পার্টনারশিপ মডিউল অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
এক ব্যক্তি কোম্পানির নেতিবাচক দিক
কোম্পানি আইনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, সীমিত দায়নীতি। পাশ্চাত্যের এ নীতি কতটুকু উপকারী, এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক আছে। শরিয়তের দৃষ্টিতেও তা শতভাগ আপত্তিমুক্ত নয়। এ কারণে দেখা যায়, বহু কোম্পানির বোর্ড অব ডিরেক্টররা শেয়ার হোল্ডার ও পাওনাদারদের টাকা ভাগাভাগি করে নিয়ে যায়। এহেন মুহূর্তে মাত্র এক ব্যক্তিকে সব ক্ষমতা প্রদান ও এর পাশাপাশি দায় সীমিত নীতিও বহাল রাখা আমাদের জন্য কতটুকু উপকারী, তা ভাবার বিষয়। এ ছাড়া ব্যবসায়িক জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণও এক ব্যক্তির ওপর শতভাগ ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ নয়। ৫০ লাখ টাকা (পরিশোধিত মূলধন) স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে। যদি ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে চলমান খেলাপি ঋণের সঙ্গে এটিও নিঃসন্দেহে যুক্ত হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ দাতাদের আস্থাও হ্রাস পেতে পারে।
কিছু প্রস্তাবনা
১. প্রচলিত আইন বহাল রেখে একে অনুমোদন না দেওয়া। ২. একান্ত তা অনুমোদন করতে হলে দায় সীমিতকরণ নীতি তুলে দেওয়া। ৩. ব্যাপকভাবে-এর অনুমোদন না দিয়ে পূর্বোক্ত শর্তে ব্যক্তি বিশেষ তার আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। ৪. মনিটরিং জোরালো করা। যদি দেখা যায়, ব্যবসায় ভালো করছে না, তাহলে অনুমোদন বাতিল করা।
লেখক : সিএসএএ, অ্যাওফি, বাহরাইন
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আইএফএ কনসালটেন্সি লি.