প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ জুন, ২০২২
ঋণ সম্পূর্ণ একটি সহযোগিতামূলক চুক্তি। ঋণকে কেন্দ্র করে ব্যবসার চিন্তা গোড়াতেই গলদ। এতে সমাজে অর্থনৈতিক অনাচার ও জুলুম সৃষ্টি হয়। সম্পদে বৈষম্য দেখা দেয়। সর্বপ্রকার বিনিময়হীন মানসিকতা থেকে মুক্ত থেকে ঋণ প্রদান করাই ইসলামের নির্দেশনা। এভাবে বিনিময়হীন ঋণ প্রদান যখন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হয়ে থাকে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে অন্যকে সহযোগিতার নিয়তে হয়ে থাকে, তখন সেটি হয়ে ওঠে ‘উত্তম ঋণ’ যা ইসলামি অর্থনীতিতে ‘কর্জে হাসানা’ নামে পরিচিত।
কিন্তু আমাদের সমাজে ঋণ একটি ব্যবসায়িক মাধ্যম। এর উদ্দেশ্য থাকে ব্যবসা। সহযোগিতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়। দীর্ঘদিন বিধর্মীদের গভীর ষড়যন্ত্রে সমাজে আজ প্রতিষ্ঠিত। ঋণকেন্দ্রিক স্বার্থান্বেষী ব্যবসাকে এখন আর কেউ খারাপ চোখে দেখে না। একটি খারাপ কাজ যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন তা সয়ে যায়।
আমাদের সমাজে ঋণকেন্দ্রীয় ব্যবসার দুটি ধারা প্রচলিত। এক. ব্যাংককেন্দ্রিক ঋণ ব্যবসা। দুই. দরিদ্র শ্রেণিকেন্দ্রিক ঋণ ব্যবসায়। আধুনিক ভাষায় একে ‘ক্ষুদ্র ঋণ’ বা ‘সোশ্যাল বিজনেস’ বলে। শুধু বাংলাদেশে নয়; বিশ্বব্যাপী সুদের ভয়াল থাবায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অধিক।
২০০৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ দশমিক ২৯ বিলিয়ন। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ভারতে এবং ১৭৩ মিলিয়ন চীনে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ছিল ৬৩ মিলিয়ন অর্থাৎ ৬ কোটি ৩০ লাখ। এর মধ্যে পল্লী অঞ্চলে ২৯ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।
ক্ষুদ্র ঋণের নামে ব্যবসার জন্য এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বেছে নেওয়া একটি গভীর ষড়যন্ত্র। বলা হবে, দারিদ্র্য বিমোচন করতে চাই। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই। এর জন্য ‘ক্ষুদ্র ঋণ’ পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হবে। এর মাধ্যমে দরিদ্র শ্রেণিকে ঋণ দেওয়া হবে। এতে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। আদতে ‘ক্ষুদ্র ঋণের’ আড়ালে সুদের জাল বিস্তারই আসল উদ্দেশ্য। ব্যাংক যে হারে সুদ নেয়, এর থেকে কয়েক গুণ অধিক সুদ নেওয়া হয় ক্ষুদ্র ঋণে।
বাংলাদেশের হতদরিদ্র মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে এর ৬৭ শতাংশই ব্যয় করে অনুৎপাদনশীল খাতে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে কোনো ভূমিকাই রাখে না। এ ঋণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রহণ করা হয় ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের জন্য। যেমন চিকিৎসা, খাদ্য ইত্যাদি। এতে দেখা যায়, একসময় সেই ঋণ আদায় করতে না পেরে তা সুদে আসলে বৃদ্ধি হয়ে দরিদ্র মানুষটির জীবন নাভিশ্বাস হয়ে ওঠে। সুতরাং ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব নয়।
পত্র-পত্রিকায় এমন ঘটনা কম নয়, ঋণ আদায় করতে না পেরে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। বহু দরিদ্র মানুষের জীবন তছনছ হয় এই ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে পড়ে। মাঝেমধ্যে কেউ এভাবে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে অন্যান্য সাপোর্টের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠলে সেটি গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়।
কয়েক বছর আগে ডেনমার্কের সাংবাদিক টম হাইনমান কর্তৃক নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ‘ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদ’ নামক প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে ‘ক্ষুদ্র ঋণ’ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যর্থ এবং দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে ক্ষুদ্র ঋণের ইতিবাচক ভূমিকা নেই।
বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার বলেছেন, ‘ক্ষুদ্র ঋণ দারিদ্র্য বিমোচন করে না; বরং সামন্তসমাজের ভূমিদাসের মতো এ যুগের মানুষকে এক ধরনের ঋণদাসে পরিণত করছে। দারিদ্র্য বিমোচনের এ পথ অনুসরণ করার ফলে আমাদের উন্নতির কোনো দিশা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যেই সংখ্যালঘুর ধনী ও সংখ্যাগরিষ্ঠের গরিব হওয়ার প্রক্রিয়া নিহিত। এ গরিব করা ও গরিব রাখার ব্যবস্থা বহাল রেখে গরিবদের ঋণ দিয়ে ও উচ্চহারে সুদ নিয়ে কীভাবে গরিবি মোচন হবে? এ অস্বাভাবিক ও বিকৃত চিন্তাকেই আমরা সদলবলে লালন করে আসছি।’
সুতরাং ঋণকেন্দ্রিক ব্যবসায় মানবতার কোনো কল্যাণ নেই। এতে বাহ্যিক চাকচিক্য আছে। তবে গভীর ক্ষত রয়েছে। সুতরাং ঋণকেন্দ্রিক এসব ব্যবসা ও ধান্ধার স্থান ইসলামে নেই। যদিও আমাদের দেশে কথিত সুদের ফেরিওয়ালারা এসব কথা শুনতে নারাজ।
লেখক : অধ্যাপক, নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র