কোরবানির গৌরবময় ইতিহাস ও শিক্ষা

মো. সাইফুল মিয়া

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আরবি ‘কুরবান’ শব্দটি ফারসি ও উর্দুতে কোরবানি রূপে পরিচিত। যার আভিধানিক অর্থ নৈকট্য অর্জন করা, কাছাকাছি যাওয়া ইত্যাদি। ঈদুল আজহার দিন আল্লার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়ত মোতাবেক হালাল যে পশু জবাই করা হয়, তাই কোরবানি। যেদিন কোরবানি করা হয়, সেদিনকে ‘ইয়াওমুল’ আজাহা বলা হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি। তিনি তাদের জীবনোপকরণ স্বরূপ যে চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছেন, সেগুলোর ওপর তারা যেন আল্লাহর স্মরণ করে’ (সুরা আল হাজ্জ-৩৪)। হজরত আবু হুরাইয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ থাকার সত্ত্বেও যে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাঁহের মাঠে আসে না।’ (ইবনে মাজাহ)।

মানব সৃষ্টির পর থেকেই কোরবানির বিধান চালু হয়েছে। হজরত আদম (আ.) এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিলের পেশ করা কোরবানি হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম কোরবানি। এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত আপনি তাদের যথাযথভাবে শুনিয়ে দেন, যখন তারা উভয়ই কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অব্যশই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমিদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন’ (সুরা মায়িদা-২৭)।

বর্তমানের কোরবানি মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নাহ। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ৮৬ বছর বয়সে আদরের সন্তান হজরত ঈসমাইল (আ.) কে পাওয়ার পর আল্লাহ সেই সন্তানকে কোরবানির নির্দেশ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আদরের সন্তান হজরত ঈসমাইল (আ.) কে কোরবানি দিতে প্রস্তুত হয়ে যান। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর কোরবানি আল্লাহর কাছে এতটাই পছন্দনীয় হয়েছে, যে কারণে আল্লাহতায়ালা পবিত্র আল কোরআনে সুচারুরূপে বর্ণনা করে উম্মতে মুহাম্মদীকে জানিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ইবরাহিম (আ.) যখন আমার কাছে দোয়া করল, হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে এক সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দান করেন। অতঃপর আমি তাকে এক অতি ধৈর্যশীল পুত্রের সুংবাদ দিলাম। অতঃপর সে যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন ইবরাহিম (আ.) বলল, বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানি করছি, এখন বল তোমার অভিমত কী? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করেন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। দু’জনই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিলো আর ইবরাহিম তাকে কাত করে শুইয়ে দিলো। তখন আমি তাকে ডাক দিলাম, হে ইবরাহিম! স্বপ্নে দেওয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করে ছাড়লে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। অব্যশই এটা ছিল একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা’ (সুরা আস-সাফফাত : ১০০)। এরপর থেকেই হালাল পশু দিয়ে কোরবানির প্রথা চালু হয়, যা বর্তমানেও বিরাজমান আছে।

হজরত আদম (আ.) এর সময়ে হাবিল আর কাবিলের কোরবানি এবং হজরত ইবরাহিম (আ.) এর কোরবানি উভয়ই ছিল আল্লাহর পক্ষ হতে পরীক্ষাস্বরূপ। তারা উভয়ই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কোরবানি করেছিলেন। আল্লাহতায়ালা কোরবানির মাধ্যমে বান্দার তাকওয়া পরীক্ষা করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর কাছে (কোরবানির পশুর) গোশত ও রক্ত পৌঁছে না বরং তোমাদের মনের তাকওয়া পৌঁছে থাকে’ (সুরা হজ : ৩৭)। হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিন পশু কোরবানির চাইতে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আমল আর নেই। কেয়ামতের দিন জবেহ করা পশুকে তার শিং ও খুরসহ হাজির করা হবে। কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা খোলা মনে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে কোরবানি কর’ (মেশকাত শরিফ : ১/১২৮)। আল্লাহ আমাদের সবাইকে একনিষ্ঠতার সঙ্গে একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন। আমিন!

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।