অনর্থক কথাবার্তা ও গল্পগুজব

মুহাম্মাদ আবু আখতার

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলে থাকি। কিন্তু এর মধ্যে অনেক কথাই প্রয়োজনীয় নয়। বিনা প্রয়োজনেও অনর্থক গল্পগুজব করা আমাদের অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর অবসর সময় পেলে তো বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করি। এতে আমাদের জীবনের অতি মূল্যবান সময়ের অপচয় হয়। ইসলাম অনর্থক কথাবার্তা ও গল্পগুজবে সময় নষ্ট করা কিছুতেই সমর্থন করে না। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, অনেক দ্বীনদার ব্যক্তিও এ ব্যাপারে তেমন সচেতন নয়। আবার অনেকে তো এ ব্যাপারে যে ইসলামের দিকনির্দেশনা রয়েছে, সে সম্পর্কেই জানে না। অথচ কোরআন হাদিসে এ বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে মোমিনদের বিভিন্ন গুণাবলীর কথা বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ হলো তারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে। সফলকাম মোমিনদের সাতটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনায় দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘যারা অনর্থক কথাবার্তা হতে বিমুখ।’ (সুরা মুমিনুন : ৩)।

শুধু তাই নয় এটাও তাদের বৈশিষ্ট্য যে, কেউ যখন তাদের সঙ্গে অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হতে চায়, তখন অত্যন্ত ভদ্রভাবে তাকে এড়িয়ে চলে। অন্য আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে ‘তারা যখন অবাঞ্চিত কথাবার্তা শ্রবণ করে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, আমাদের জন্য আমাদের কাজ এবং তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গে জড়িত হতে চাই না।’ (সুরা কাসাস : ৫৫)। সুতরাং সত্যিকার মোমিন হতে হলে অবশ্যই অনর্থক কথাবার্তা হতে বেঁচে থাকা একান্ত জরুরি।

অনর্থক কথাবার্তা ও গল্পগুজবে লিপ্ত হওয়া এমন জঘন্য একটি কাজ যা মানুষকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়। যেসব কারণে মানুষ জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে এটা তার বড় একটা কারণ।

জাহান্নামীরা নিজেদের মুখেই তাদের এ অপরাধ স্বীকার করবে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘(জাহান্নামীদের জিজ্ঞেস করা হবে) কোনে অপরাধে তোমরা জাহান্নামে প্রবেশ করেছ? তখন তারা বলবে, আমরা নামাজ পড়তাম না, মিসকিনদের খাদ্য দিতাম না, অনর্থক গল্পগুজবকারীদের সঙ্গে গল্পগুজব করতাম এবং কেয়ামত দিবসকে অবিশ্বাস করতাম।’ (সুরা মুদ্দাসসির : ৪২-৪৬)।

অনর্থক গল্পগুজবের সময় সাধারণত মানুষ মুখে যা আসে তাই বলতে থাকে। মিথ্যা, গিবত, পরনিন্দা, ঠাট্টা-উপহাস, চোগলখুরি ইত্যাদি জঘন্য পাপের কোনো খেয়াল করা হয় না। আর কেউ এ ব্যাপারে সতর্ক করলেও এসবের পরোয়া তেমন কেউ করে না। আর এর ফলে মুখ হতে এমন পাপের কথা বের হওয়া খুবই স্বাভাবিক, যা তাকে জাহান্নামের গভীরে নিক্ষেপ করতে পারে। এসম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতে শুনেছেন যে, ‘নিশ্চয় বান্দা পরিণাম চিন্তা না করেই এমন কথা বলে যে, কথার কারণে সে ঢুকে যাবে জাহান্নামের এমন গভীরে যার দূরত্ব পূর্ব (পশ্চিম) এর দূরত্বের চেয়েও বেশি।’ (সহিহ বোখারি : ৬৪৭৭)।

এমনকি জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করার পরেও দুনিয়াতে আল্লাহর স্মরণ ব্যতিত যেসব সময় অনর্থক কথা ও কাজে অতিবাহিত করেছে তার জন্য আফসোস করবে। তাহলে জাহান্নামিদের আফসোস কত বেশি হবে, তা তো বলাই বাহুল্য। এ সম্পর্কে হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতিদের জান্নাতে যাওয়ার পর দুনিয়ার কোনো জিনিসের জন্য আফসোস হবে না। শুধু ওই সময়ের জন্য আফসোস হবে, যা আল্লাহর স্মরণ ব্যতিত অনর্থক কথা বা কাজে অতিবাহিত হয়েছে।’ (বায়হাকী : ৫০৯)।

পক্ষান্তরে অনর্থক কথাবার্তা হতে বিরত হয়ে নীরব থাকার বিরাট ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে হজরত ইমরান ইবনে হুসাঈন (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির (অনর্থক কথাবার্তা হতে) নীরব থাকায় যে মর্যাদা লাভ হয় তা ষাট বছরের নফল ইবাদত হতেও উত্তম।’ (বায়হাকী : ৪৬০২)।

যারা অনর্থক গল্পগুজব ও খেলতামাশায় তাদের জীবনের মূল্যবান সময়গুলো নষ্ট করছে আল্লাহ তায়ালা তাদের কেয়ামত দিবসে ভয়াবহ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে বলেন, ‘অতএব, আপনি তাদের ছেড়ে দিন, তারা অনর্থক কথাবার্তা ও খেলতামাশায় লিপ্ত থাকুক, সেই দিনের সম্মুখীন হওয়া পর্যন্ত, যে দিনের ওয়াদা তাদের সঙ্গে করা হয়েছে। সে দিন তারা কবর থেকে দ্রুতবেগে বের হবে, যেন তারা কোনো এক লক্ষ্যস্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তাদের দৃষ্টি থাকবে নিচু; সেদিন তারা চরমভাবে অপমানিত হবে। এটাই সেইদিন, যার ওয়াদা তাদের দেওয়া হত।’ (সুরা মা’আরিজ : ৪২-৪৪)।

আল্লাহ তায়ালার এত বড় ধমকির পরেও যদি আমরা সতর্ক না হই, তাহলে এটা হবে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ। এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।

কেয়ামতের দিন শতকোটি আফসোসও সামান্যতম কোনো কাজে আসবে না। তাই এখনই তওবা করে অনর্থক কথাবার্তা ও গল্পগুজব হতে বেঁচে থাকা প্রত্যেকের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য।