জীবনযাপনে ভারসাম্যের শিক্ষা

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ

প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলাম এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের বিশ্বাস, ইবাদত, চরিত্র, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত করে। এ দ্বীনের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা হলো ভারসাম্য। ইসলাম মানুষকে চরমপন্থা ও অবহেলা উভয় প্রান্ত থেকে দূরে রেখে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা শেষ নবীর উম্মতকে মধ্যপন্থী বানিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এভাবেই আমি তোমাদের মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি।’ (সুরা বাকারা : ১৪৩)। এ মধ্যপন্থাই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের ভিত্তি।

জীবনের সব ক্ষেত্রে ভারসাম্য : মানুষের জীবন বহুমাত্রিক। দেহ ও আত্মা, দুনিয়া ও আখেরাত, ব্যক্তি ও সমাজ সবকিছুর সমন্বয়েই মানবজীবন পূর্ণতা লাভ করে। ইসলাম কখনও মানুষকে শুধু আত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হয়ে দুনিয়াবি দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বলে না; আবার ভোগবাদী জীবনে ডুবে গিয়ে আখেরাতকে ভুলে যেতেও উৎসাহিত করে না। দুনিয়াকে আখেরাতের সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে শেখায় ইসলাম। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, তিনজন সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের ঘরে এলেন। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইবাদত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। যখন তাদের তা জানানো হলো, তখন তারা যেন সেটাকে খুবই কম মনে করলেন। তারা বললেন, ‘আমাদের অবস্থান আর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অবস্থান কি এক! তার তো আগের ও পরের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।’ অতঃপর তাদের একজন বলল, ‘আমি আজীবন রাতভর নামাজ আদায় করব।’

আরেকজন বলল, ‘আমি সারা বছর রোজা রাখব, কখনও রোজা ভাঙব না।’ তৃতীয়জন বলল, ‘আমি নারীদের থেকে দূরে থাকব, কখনও বিয়ে করব না।’ এ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের কাছে এলেন এবং বললেন, ‘তোমরাই কি সেই লোক, যারা এমন এমন কথা বলেছ?’ এরপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করি এবং তাঁর ব্যাপারে তোমাদের চেয়ে বেশি তাকওয়াবান। অথচ আমি রোজা রাখি এবং রোজা ভাঙিও, নামাজও আদায় করি আবার বিশ্রামও নিই। আমি নারীদের বিয়েও করি। অতএব, যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (বোখারি : ৫০৬৩)। এ হাদিসে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্যের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।

ইবাদত ও নৈতিকতায় ভারসাম্য : ইবাদতের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য। অতিরিক্ত কঠোরতা কিংবা অযথা শিথিলতা দুটোই নিন্দনীয়। নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রেও ইসলাম চরমপন্থার বিপরীতে ভারসাম্যের শিক্ষা দিয়েছে। ইসলাম মানুষকে দয়া ও কঠোরতার মাঝামাঝি অবস্থান নিতে শেখায়। অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, আবার ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষমা ও সহনশীলতা- এ দুটির সমন্বয়েই ইনসাফভিত্তিক ইসলামি চরিত্র গড়ে ওঠে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য : অর্থনীতি ও ভোগের ক্ষেত্রেও ইসলামের ভারসাম্য অনন্য। ইসলাম কৃপণতা যেমন নিষিদ্ধ করেছে, তেমনি অপচয়কেও হারাম ঘোষণা করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় করো না। অপচয়কারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ : ৩১)। একজন মুসলিম উপার্জন করবে হালাল পথে, ব্যয় করবে প্রয়োজন অনুযায়ী এবং সমাজের অসহায়দের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট থাকবে, এটাই ইসলামের অর্থনৈতিক ভারসাম্য।

সমাজজীবনে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আসে। ব্যক্তি স্বার্থ ও সামষ্টিক কল্যাণ- এ দুইয়ের মধ্যে সুষম সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একজন মুসলিম ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক জীবন গড়ে তোলে। সুতরাং দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার জন্য ইসলামের এ মধ্যপন্থাই একমাত্র নিরাপদ ও কল্যাণকর জীবনদর্শন।