সম্পদ উপার্জনে ইসলামের নির্দেশনা
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
উবায়দুর রহমান হাম্মাদ

অনেকেই উপার্জনকে দ্বীনদারী বা তাওয়াক্কুল পরিপন্থী ভাবেন। অথচ এই মানসিকতা সবক্ষেত্রে শুদ্ধ নয়। কোরআন-হাদিসের কোথাও এমন মানসিকতার পৃথক কোনো মূল্যায়ন নেই। বরং ইসলাম মানুষকে রিজিকের প্রয়োজনে উপার্জনে উৎসাহিত করেছে। রিজিক অন্বেষণকে আল্লাহর অনুগ্রহ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে, 'সালাত আদায় হলে তোমরা পৃথিবীর দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ো। আর আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করো।' (সুরা জুমা : ১০)। মৌলিকভাবে সুস্থ-সবল মানুষের জন্য হালাল উপার্জন একটি আবশ্যকীয় দায়িত্ব। ফিকহের পরিভাষায় এ ধরনের আবশ্যকীয় দায়িত্বকে ওয়াজিব বলা হয়। এরশাদ হচ্ছে, 'হালাল উপার্জন অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ওয়জিব।' (মাজমাউয যাওয়াইদ : ১০/২৯১)।
উপার্জন ও শ্রম নবীদের সুন্নত : নিজ উপার্জনে স্বাবলম্বী হওয়া নবীদের সুন্নত। হজরত আদম (আ.) চাষাবাদ করে, নুহ (আ.) কাঠমিস্ত্রির কাজ করে ও ইদরিস (আ.) সেলাইয়ের কাজ করে জীবিকা উপার্জন করতেন। হজরত দাউদ (আ.) লোহা গলিয়ে বর্ম তৈরি করে ও মুসা (আ.) বকরি চরানোর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। (ফাতহুল বারি : ৪/৩০৬)। আরও অনেক নবী-রাসুলের নিজ হাতে উপার্জনের কথা হাদিসে পাওয়া যায়। তা ছাড়া এরশাদ হচ্ছে, 'হে নবী! আপনি পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের পদাঙ্ক অনুসরণ করুন।' (সুরা আনআম : ৯০)। রাসুল (সা.) নিজে বকরি চরিয়েছেন। যুবক বয়সে হজরত খাদিজা (রা.)-এর পক্ষ হয়ে সুদূর সিরিয়ায় বাণিজ্যিক সফরে ব্যবসায় সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইসলামের প্রথম যুগে রাসুল (সা.) সায়িব ইবনে আবু সায়িবের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা করেছেন। সায়িব ইবনে আবু সায়িব এ প্রসঙ্গে বলেন, '(হে নবী!) আপনি আমার ব্যবসায় অংশীদার ছিলেন। আপনি কতই না উত্তম অংশীদার। আপনি ধোঁকা দিতেন না। ঝগড়া-বিবাদ করতেন না।' (সুনানে আবি দাউদ : ৫/১৭০)।
সম্পদ উপার্জনে ব্রত হওয়া তাওয়াক্কুল পরিপন্থী নয় : অতীতকালের এক ধরনের সুফিরা ধারণা করতেন, যারা দ্বীনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, তাদের জন্য দুনিয়ার উপার্জনের পেছনে ব্যস্ত হওয়া ঠিক নয়। ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'কিতাবুল কাসব'-এ এ ধরনের ধারণা পোষণকারী সুফিদের মূর্খ বলেছেন। তিনি এমন ধারণা পোষণকারীদের জবাবে বলেছেন, 'দ্বীনের কাজ ও উম্মতের ফিকির নবীদের চেয়ে বেশি কারো হতে পারে না। তারা তো এই মহান দায়িত্ব নিয়েই পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন। অথচ তারাও জীবিকা উপার্জনে নিজে শ্রম দিয়েছেন। কেউ বকরি চরিয়েছেন, কেউ চাষাবাদ করেছেন, কেউ ব্যবসা করেছেন। সেখানে আমাদের মতো মানুষের এমন ধারণার সুযোগ কোথায়? এমন ধারণা পোষণকারী নিজেরা উপার্জন না করলেও মানুষের উপার্জিত সম্পদ লাভের আশায় থাকে।' তিনি তার মতের স্বপক্ষে হজরত ওমর (রা.)-এর একটি বর্ণনা এনেছেন, একবার হজরত ওমর (রা.) ইবাদতরত এক জামাতের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাদেরকে মাথা নিচু করে বসা অবস্থায় দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, 'এরা কারা?' লোকেরা বললো, 'এরা আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারী। (অর্থাৎ আল্লাহর ওপর ভরসা করে থাকে। কিছু পেলে খায়, অন্যথায় সবর করে)।' তিনি এ কথা শুনে রেগে বললেন, 'কখনোই এমন হতে পারে না। এরা তাওয়াক্কুলকারী নয়, বরং মানুষের সম্পদ ভক্ষণকারী। এরা নিজেরা উপার্জন না করে মানুষের উপার্জিত সম্পদ খেয়ে বেড়ায়।' এরপর বললেন, 'আমি কি তোমাদের বলবো না, কে প্রকৃতপক্ষে তাওয়াক্কুলকারী!' লোকেরা বললো, 'অবশ্যই।' তিনি বললেন, 'প্রকৃত তাওয়াক্কুল অবলম্বনকারী তো সেই ব্যক্তি, যে প্রথমে জমিনে বীজ বপণ করে, এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে।' এরপর তিনি ইবাদরত লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন, 'হে ইবাদতগোজার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের মাথা উঁচু করো। আর নিজেরা উপার্জন করে নিজেদের রিজিকের ব্যবস্থা করো।' (কিতাবুল কাসব : ৮৭-৮৮)। বর্তমানে এমন ধারণার লোক যে একেবারে নেই, ঠিক তা কিন্তু না। অনেকেই সম্পদ উপার্জনে ব্রত হওয়াকে দুনিয়াদারি বলে বাঁকা চোখে দেখেন। মৌলিকভাবে এমন ধারণা রাখা বৈধ নয়। তাই তো ফকিহগণ সুস্পষ্ট বলেছেন, 'কার্যত কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্যই শুধু মানুষের কাছে হাত পাতা বৈধ; অন্য কারও জন্য নয়।' (কিতাবুল কাসব : ১৯০)।
উপার্জনের ক্ষেত্রে যে পেশা গ্রহণ করা উত্তম : মৌলিকভাবে কোরআন-হাদিসে যেকোনো হালাল পেশাকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে হারাম উপার্জন থেকে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছে। তবে কোন পেশা উত্তম, তা আবহমান কাল থেকে ইসলামি ফিকহে একটি মতভেদপূর্ণ অধ্যায়। কেউ পেশা হিসেবে পূর্ববর্তী নবীদের অনুকরণে চাষাবাদের পেশাকে উত্তম বলেছেন, আবার কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যকে উত্তম বলেছেন। প্রত্যেকের মতামতের পক্ষেই পৃথক যুক্তি রয়েছে। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, 'সবচেয়ে উত্তম ও পবিত্র রিজিক হলো, নিজ হাতে উপার্জিত রিজিক। আমার ভাই দাউদ (আ.) নিজ হাতের উপার্জন দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।' (বোখারি : ৪/৩০৩)। অন্য হাদিসে রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, 'কোন পেশা উত্তম?' উত্তরে তিনি বলেছেন, 'হালাল ব্যবসা ও ব্যক্তির নিজের হাতে উপার্জিত রোজগার।' (মুসনাদে আহমদ : ১৫৮৭৪)। অপর হাদিসে এসেছে, 'তোমার নিজের কাছে যা কল্যাণকর মনে হয়, তুমি তাই করো। (তোমার কর্মের সফলতার জন্য) আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করো।' (মুসলিম : ২৬৬৪)। তাই কল্যাণকর যেকোনো হালাল পেশা গ্রহণ করা যাবে, চাই সেটা ব্যবসা হোক কিংবা অন্য কোনো পেশা। শরিয়াসম্মত উপায়ে যেকোনো পেশায় আত্মনিয়োগ করাই সুন্নত।
সম্পদ উপার্জনে সাহাবা ও সালাফের কর্মপদ্ধতি ও চিন্তাধারা : হজরত আবু বকর (রা.) কোরাইশ গোত্রের বড় ব্যবাসায়ীদের একজন ছিলেন। প্রতিদিন ভোরে ব্যবসার উদ্দেশ্যে তিনি বাজারে চলে যেতেন। এ ছাড়াও হজরত ওসমান (রা.) ও তালহা (রা.)-সহ বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম কাপড়ের ব্যবসা করতেন। (তাবাকাত ইবনে সাদ : ৩/১৮৬)। হজরত ওমর (রা.) বলেন, 'কিছু কিছু পেশাতে যদিও সম্মানের কমতি রয়েছে, তবু তা মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম।' (ইবনু আবিদ দুনিয়া :৭/৪৫৫)। আবু ইসহাক আস সুবাঈ থেকে বর্ণিত; সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের প্রয়োজনে স্বচ্ছলতা ও স্বাবলম্বী হওয়াকে পছন্দ করতেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৫/৩৫৫)। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন থেকে বর্ণিত; তার কাছে আরবের কোনো লোক এলে তিনি বলতেন, 'তোমরা ব্যবসা করো না কেনো? হজরত আবু বকর (রা.) তো ব্যবসায়ী ছিলেন।' (ইবনু আবিদ দুনিয়া :৭/৪৫১)। সুফিয়ান সাওরি (রহ.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলতেন, 'সম্পদ উপার্জনকে একসময় অপছন্দ করা হতো। কিন্তু কালের পরিবর্তনে সম্পদ হলো এখন মোমিনের অস্ত্রস্বরূপ।' (ইসলাহুল মাল : ৮৯)। তাই দ্বীনের প্রয়োজনে স্বাবলম্বী ও স্বচ্ছল হওয়া দোষের কিছু নয়, বরং ক্ষেত্র বিশেষ এটি দ্বীনের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে লক্ষ্যণীয় হলো, সম্পদ উপার্জন করতে হবে হালাল পন্থায়। এটি শরিয়তের একটি মৌলিক ফরজ বিধান।
কোরআনে মানবজাতিকে হালাল উপার্জনের নির্দেশ : আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে হালাল গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই হালাল গ্রহণ শুধু মোমিনের জন্য কল্যাণকর নয়, বরং গোটা মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। সমাজে হালাল প্রতিষ্ঠিত হলে এর সুফল ভোগ করবে গোটা সমাজ। এরশাদ হচ্ছে, 'হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।' (সুরা বাকারা : ১৬৮)।
হালাল থেকে বিমুখ প্রদর্শন শাস্তির কারণ : হালাল উপার্জন সকলের জন্য আবশ্যক। এটি একটি ফরজ বিধান। হালাল থেকে বিমুখ প্রদর্শন করলে আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তি অবধারিত হয়ে পড়ে। এরশাদ হচ্ছে, 'তোমাদেরকে যা দান করেছি, তা থেকে ভালো ও হালাল বস্তু আহার করো এবং এ ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন কোরো না। করলে তোমাদের ওপর আমার ক্রোধ অবধারিত। আর যার ওপর আমার ক্রোধ অবধারিত, সে তো ধ্বংস হয়ে যায়।' (সুরা তহা : ৮১)।
হারাম বর্জনের গুরুত্ব : এরশাদ হচ্ছে, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ কোরো না।' (সুরা নিসা : ২৯)। হারাম উপার্জনের একটি বড় উৎস হলো, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ ভক্ষণ করা। যেমন চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি। ইসলাম উপার্জনের অন্যায় ও অবৈধ সকল পন্থা নিষিদ্ধ করেছে।
