প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ মার্চ, ২০২১
ইসলামি অর্থব্যবস্থায় পুঁজি ও উদোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন অপরিহার্য। ইসলামি অর্থব্যবস্থা সম্পদকে কুক্ষিগত করে রাখতে নিরুৎসাহিত করে; বরং তা প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে বাকিটা বিনিয়োগের পরামর্শ দেয়। মানুষের দুটো শ্রেণি। একশ্রেণির হাতে পুঁজি থাকে, কিন্তু তারা উদ্যোক্তা নন। আবার একশ্রেণি ভালো উদ্যোক্তা, কিন্তু পুঁজি সংকটে ভুগেন। অবশ্য এমনও মানুষ আছেন যাদের পুঁজিও আছে আবার তারা উদ্যোগী, তবে পর্যাপ্ত পুঁজি নেই। এই সব শ্রেণিকে সমন্বয় করার জন্য ইসলাম চমৎকার কিছু বিনিয়োগ পদ্ধতি আমাদের শিখিয়েছে। মুশারাকা ও মুদারাবা তন্মধ্যে অন্যতম।
মুশারাকা : একাধিক ব্যক্তির পুঁজিকে একত্রিত করে যৌথ বিনিয়োগ করে ব্যবসা করাকে মুশারাকা বা অংশীদারিত্বের ব্যবসা বলা হয়। এ পদ্ধতিতে একাধিক ব্যক্তি মূলধন বিনিয়োগ করেন। সবার পুঁজি একত্রিত করে তা দিয়ে ব্যবসা করা হয়। লাভ হলে তা পুঁজির হার অনুপাতে সবার মধ্যে বণ্টন করা হয়। আর ক্ষতি হলেও সমহারে তা বণ্টিত হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যবসার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অংশীদারদের কেউ দায়িত্ব নিয়ে থাকলে তার মুনাফার হার সাধারণত অন্যদের চেয়ে বেশি হয়।
মুদারাবা : মুদারাবাও এক প্রকার অংশীদারিত্বের ব্যবসা। তবে এখানে সবাই মূলধন বিনিয়োগ করেন না। বরং এক পক্ষ মূলধন বিনিয়োগ করেন, অপর পক্ষ শ্রম বিনিয়োগ করেন। ব্যবসায় লাভ হলে আগের নির্ধারিত হারে তা বণ্টন করা হয়। আর ক্ষতি হলে তা মূলধন বিনিয়োগকারী বহন করেন। অবশ্য ক্ষতির কারণ যদি শ্রম বিনিয়োগকারী বা মুদারিব হন, তাহলে তিনি তার ক্ষতিকারক কাজের ক্ষতির সমপরিমাণ ক্ষতি বহন করেন। রাসুল (সা.) বিবাহের আগে মুদারাবার ভিত্তিতে খাদিজা (রা.) এর ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। সীরাত গ্রন্থগুলোতে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
মুশারাকা ও মুদারাবা ইসলামি অর্থব্যবস্থায় সবচেয়ে আদর্শ দুটো বিনিয়োগ পদ্ধতি, যা পুঁজি ও উদ্যোক্তাকে সমন্বয় করে। এ পদ্ধতি দুটোতে লাভ ও ক্ষতির অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়। মুদারাবার অনুসরণে ওলামায়ে কিরাম মুযারা’আ ও মুসাকাত নামে আরো দুটো পদ্ধতির কথা বলেছেন। মুযারা’আ হলো যেখানে জমির মালিক তার জমি ও বীজ কিংবা শুধু জমি বিনিয়োগ করেন। আর অপরজন শ্রম ব্যয় করে, সেখানে ফসল ফলান। এরপর উৎপন্ন ফসল উভয়ের মধ্যে আগের নির্ধারিত হারে বণ্টিত হয়। ফসল না হলে কারও কিছু চাওয়ার থাকে না। আর মুসাকাত হলো, যেখানে বাগানের মালিক তার গাছগুলোকে বিনিয়োগ করেন। আর অপরজন শ্রম দিয়ে সেখানে পানি দেন, গাছের দেখাশোনা করেন। এরপর যা ফল হয় তা উভয়ের মধ্যে আগে নির্ধারিত হারে বণ্টন করা হয়। ফল না হলে কেউ কিছু পায় না। এক কথায় লাভ ও ক্ষতির অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পুঁজি ও শ্রমের বিনিয়োগে ইসলাম আমাদের উৎসাহিত করে।
আধুনিক ইসলামি অর্থনীতিতে অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগের পদ্ধতি মুশারাকা ও মুদারাবা যদিও ইসলামের আদর্শ দুটো অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগ পদ্ধতি, তথাপি সবসময় সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। ফলে সুদী অর্থব্যবস্থাকে বর্জন করে ইসলামের গ-ির ভেতর থেকে আরও কয়েকটি ক্রয়-বিক্রয়ভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তন্মধ্যে বাই-মুরাবাহা, বাই-সালাম ও বাই-ইসতিসনা উল্লেখযোগ্য।
বাই-মুরাবাহা : বাই-মুরাবাহা এক প্রকার ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি। অন্যসব ক্রয়-বিক্রয়ের ন্যায় এখানে প্রথম শর্ত হলো, ক্রেতা-বিক্রেতার সন্তুষ্টি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। (সুরা নিসা : ২৯)। অনুরূপভাবে, ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি বিনষ্ট করে ফেলে, এমন যে কোনো বিষয় থেকেও মুক্ত থাকতে হয়। যেমন : ধোঁকা-প্রতারণা, হারাম সম্পদ ক্রয়-বিক্রয়, অতি উচ্চমূল্যে বিক্রয়, জুয়া, মালিকানাহীন বস্তু বিক্রয়, স্বত্বাধিকার ছাড়াই কোনো কিছু বিক্রয় ইত্যাদি। তবে অন্যসব ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে বাই-মুরাবাহার মূল পার্থক্য হলো, এতে বিক্রেতা তার ক্রয়মূল্য ও লাভের পরিমাণ ক্রেতার কাছে উল্লেখ করে। অনেক ক্রেতার কাছে বাজারমূল্য স্পষ্ট থাকে না। আবার অনেক বিক্রেতার কাছে লাভের অংক অস্পষ্ট থাকে। উভয় প্রকার ক্রেতা-বিক্রেতার উপকারিতার স্বার্থে বাই-মুরাবাহর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আধুনিক ইসলামি অর্থনীতিতে বাই-মুরাবাহার সঙ্গে বাই-মুয়াজ্জালকে মিলিয়ে একটি বিনিয়োগ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বাই-মুয়াজ্জাল : বাই-মুয়াজ্জাল হলো বাকিতে বিক্রয়। যেখানে ক্রেতা বিলম্বে মূল্য পরিশোধ করার সুযোগ লাভ করে। আর বিক্রেতা নগদে মূল্য পাচ্ছে না বলে চুক্তির সময়ই কিছুটা অতিরিক্ত মুনাফা সংযোজন করে মূল্য নির্ধারণ করে। বর্তমানে প্রচলিত বাই-মুরাবাহার পদ্ধতি হলো, ক্রেতা প্রথমে অর্থ সরবাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে তার প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করার আগ্রহ প্রকাশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি সেই পণ্যের বাজারমূল্য যাচাই করে। অতঃপর ক্রেতার কাছ থেকে তা ক্রয়ের একটি অঙ্গীকারপত্র গ্রহণ করে। এরপর আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে পণ্যটি ক্রয় করে নিজের দখলে নেয়। অবশেষে পণ্যটি ক্রেতার কাছে বিক্রয় ও হস্তান্তর করে এবং ক্রেতা তার মূল্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিকে কিস্তিতে পরিশোধ করে।
বাই-সালাম : বাই-সালাম বাই-মুয়াজ্জালের ঠিক উল্টো। বাই-মুয়াজ্জালে মূল্য অপরিশোধিত থাকে, আর পণ্য নগদে ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আর বাই-সালামে মূল্য নগদে পরিশোধ করা হয়। আর পণ্য বিলম্বে নির্দিষ্ট তারিখে ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত শস্য জাতীয় সম্পদে এই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ব্যবহার হয়ে থাকে। আধুনিক ইসলামি অর্থনীতিতে নানা রকম খাদ্যদ্রব্য বিদেশ থেকে আমদানি করার ক্ষেত্রে ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাই-সালামের ব্যবহার করে থাকে। অন্য সব ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ন্যায় বাই-সালামে পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণ, পণ্য হস্তান্তরের তারিখ, জায়গা, মূল্য ইত্যাদি চুক্তির সময় নির্দিষ্ট করে নিতে হয়। এছাড়াও পণ্যটি চুক্তির সময় থেকে হস্তান্তরের সময় পর্যন্ত বাজারে থাকাও বাঞ্ছনীয়। যেন কোনো কারণে বিক্রেতা নিজের উৎপাদন থেকে পণ্য হস্তান্তর করতে না পারলে বাজার থেকে ক্রয় করে দিতে পারে; ফলে ক্রেতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বাই-ইসতিসনা : বাই-ইসতিসনা অনেকটা বাই-সালামের মতোই। এ অর্থে যে, এখানেও সাধারণত মূল্য আগে পরিশোধ করা হয় আর পণ্য পরে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তবে বাই-ইসতিসনা এমন পণ্যের ক্ষেত্রে করা হয়, যা একটি নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে আসে। যেমন, জেনারেটর, মোটর, কাপড় ইত্যাদি। এক্ষেত্রে বিক্রেতা পণ্যের কাঁচামাল সরবরাহ করে ও নির্মাণ কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে। আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিং ও অর্থনীতিতে নানা রকম মেশিনারিজ ও মেশিনে তৈরি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাই-ইসতিসনা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
মুদারাবায় একপক্ষ লাভের অধিকারী হয় মূলধন বিনিয়োগের কারণে। আর অপর পক্ষ লাভের অধিকারী হয় শ্রমের কারণে। শ্রম ও মূলধন ছাড়া তৃতীয় আরেকটি কারণে লাভের অধিকারী হওয়া যায়। তা হলো, দায় নেওয়া। শ্রম, মূলধন ও দায় নেওয়া ছাড়া চতুর্থ কোনো কারণে কেউ লাভের অধিকারী হয় না। অনুরূপভাবে ব্যবসায় অংশ না নিয়ে শুধু অর্থ ঋণ দিয়ে সময়ের বিপরীতে লাভের অধিকারী হওয়া যায় না। ইসলামে তা রিবা বলে পরিগণিত এবং সম্পূর্ণভাবে হারাম বলে বিবেচিত। মুদারাবা বা মুশারাকা যাই হোক না কেন, ব্যবসায় লাভ হলে তা পুঁজির আনুপাতিকহারে অংশীদারের মধ্যে বণ্টন হবে। আর ক্ষতি হলে তা মূলধন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের অনুপাতে বহন করবে।
উদাহরণস্বরূপ, খালেদ, রাশেদ ও আমের একটি যৌথ ব্যবসায় বিনিয়োগ করল। খালেদের বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০,০০০/-, রাশেদের ৫০,০০০/- ও আমেরের ২০,০০০/। মোট মূলধন ১,০০,০০০/-। বিনিয়োগের হার : খালেদ ৩০ শতাংশ, রাশেদ ৫০ শতাংশ আর আমের ২০ শতাংশ। এই ব্যবসায় পরিচলনার দায়িত্ব আমেরের। তাই মুনাফার হার তার জন্য বেশি। মুনাফার হার এরূপ : খালেদ : ২০ শতাংশ, রাশেদ ৩০ শতাংশ আর আমের ৫০ শতাংশ। এক বছর পর হিসাব করে দেখা গেল যে, ব্যবসায় যাবতীয় খরচ বাদে লাভ হয়েছে ৫০,০০০/-। তাহলে তা বণ্টন হবে এভাবে : খালেদ ১০,০০০/- (২০ শতাংশ), রাশেদ ১৫,০০০/- (৩০ শতাংশ) আর আমের ২৫,০০০/- (৫০ শতাংশ)।
দ্বিতীয় বছর শেষে দেখা গেল যে, ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে ৫০,০০০/-। তাহলে তা বহন করতে হবে মূলধনের বিনিয়োগ হার অনুসারে এভাবে : খালেদ ১৫,০০০/- (৩০ শতাংশ), রাশেদ ২৫,০০০/- (৫০ শতাংশ) আর আমের ১০,০০০/- (২০ শতাংশ)।
বাংলাদেশে ইসলামি অর্থনীতি সম্ভাবনা, সমস্যা ও সমাধান ইসলাম আমাদের যে অর্থব্যবস্থার দিকনির্দেশনা দেয়, তা যে কোনো যুগে যে কোনো জায়গায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ইসলাম আমাদের নির্দিষ্ট আঙ্গিকের কোনো অর্থব্যবস্থার কথা বলে না। বরং ইসলাম আমাদের মৌলিক কিছু বিধিনিষেধের কথা বলে দেয়, যা মেনে চললে যে কোনো অর্থব্যবস্থাই ইসলামি অর্থব্যবস্থায় পরিণত হবে। দেশের জনসাধারণ মুক্তি পাবে অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়নের করাল গ্রাস থেকে।
নায়েবে মুফতি, ইফতা বিভাগ, জামিয়া
শারইয়্যাহ মালিবাগ