১ম পর্ব

প্রচলিত শেয়ার ব্যবসা ও ইসলাম : একটি পর্যালোচনা

সংকলক : সাজ্জাদ সালাদীন

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২১, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। মানব জীবনের এমন কোনো দিক নেই, যে সম্পর্কে ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নাজিল করেছি, যেটি এমন যে, তা প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা, হেদায়েত, রহমত এবং মুসলমানদের জন্য সুসংবাদ। (সুরা নাহল : ৮৯)। ইসলাম যেমনÑ নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ ইত্যাদি ইবাদত সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, আইন-কানুন ইত্যাদি জীবন ঘনিষ্ঠ অন্যান্য বিষয় নিয়েও কথা বলে। বর্তমান সময়ে শেয়ার ব্যবসা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক লেনদেন। শেয়ার বাজার মূলত : পুঁজিপতিদের সৃষ্টি। শেয়ার ব্যবসাটা কী, এ ব্যবসা শরিয়তে বৈধ কি না, এ ব্যবসায়ে জনগণের কল্যাণ বা অকল্যাণ কতটুকু? ইসলামিক দৃষ্টিতে পুঁজিবাজারে শেয়ার লেনদেন করা কি জায়েজ? অনেকে বলছেনÑ হ্যাঁ। আবার অনেকে বলছেনÑ না। অংশীদারী কারবারের শেয়ার লেনদেন নিয়ে দেখা দিয়েছে দ্বন্দ্ব। এরই মধ্যে অনেকে স্টক বাংলাদেশÑ এ ফোন করেও এমন প্রশ্ন ছুড়েছেন। স্টক বাংলাদেশ- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ইমলামিক বিভিন্ন চিন্তাবিদের দ্বারস্থ হয়েছেন।

শেয়ার ব্যবসা কী? খুব সহজে বললে, দুই তিনজন মিলে কোনো ব্যবসা করাই শেয়ার ব্যবসা। শেয়ার অর্থ অংশীদারিত্ব। দুই বা ততধিক ব্যক্তির অংশীদারিত্বে যে ব্যবসা পরিচালিত হয়, প্রকৃত অর্থে তাই শেয়ার ব্যবসা। তবে প্রচলিত শেয়ার ব্যবসার ধরন প্রকৃত অর্থে শেয়ার ব্যবসা থেকে খানিকটা ভিন্ন। প্রচলিত শেয়ার ব্যবসা বলতে মূলত সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ারের মালিকানার ক্রয়-বিক্রয়কে বোঝায়। কোম্পানি থেকে প্রথমবার শেয়ার একজন ক্রয় করে পরবর্তী সময়ে তা সেকেন্ডারি মার্কেটে হাতের পর হাতবদল হতে থাকে। এর সঙ্গে কোম্পানির মূলধন, অ্যাসেট ইত্যাদির প্রায় কোনো সম্পর্কই থাকে না। বরং, নিজস্ব গতিতে সেকেন্ডারী মার্কেটে শেয়ারের দাম ওঠা-নামা করে। চলে সরাসরি ও ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে এসবের ক্রয়-বিক্রয়।

ব্যবসা সম্পর্কে শরিয়তের মূলনীতি : ব্যবসা সম্পর্কে শরিয়তের মূলনীতিটি খুব সহজ। আল-কোরআনের ভাষায়Ñ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (সুরা বাকারাহ : ২৭৫)। এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি : ১. যে কোনো ক্রয়-বিক্রয় মৌলিকভাবে হালাল। ২. যে কোনো সুদভিত্তিক লেনদেন মৌলিকভাবে হারাম। এর অর্থ দাঁড়ায় এই যে, কোনো ব্যবসা সুদভিত্তিক হলে তা প্রথমেই হারাম। আর সুদভিত্তিক না হলে প্রথমেই তা হারাম নয়। তবে এতে যদি অন্য কোনো হারাম বিষয় থাকে, তাহলে তা হারাম হবে। যেমন, ধোঁকা, জুয়া ইত্যাদি।

শেয়ার ব্যবসার বিধান সম্পর্কে আলেমদের মতামত : আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের শরিয়া বিধানের ক্ষেত্রে আমরা আলেম ও ফকিহদের একাধিক মতামত দেখতে পাই। শেয়ার ব্যবসার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। এ ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি চারটি মতামত পেয়েছি। মতামতগুলো উল্লেখ করার আগে বলে রাখা ভালো যে, মূল ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনার তারতম্যের ভিত্তিতে ফকিহরা বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। ১. যেসব কোম্পানির মূল ব্যবসা ও সব লেনদেন শরিয়সম্মত ও সুদমুক্ত। এসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে যদি গ্যাম্বলিংক না হয়, তাহলে তা সমকালীন প্রায় সব ফকিহের মতে ক্রয়-বিক্রয় করা জায়েজ। ২. যেসব কোম্পানির মূল ব্যবসা হারাম। যেমন মদ ব্যবসা, সুদি ব্যবসা ইত্যাদি। এসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় জায়েজ নেই। ৩. যেসব কোম্পানির মূল ব্যবসা হালাল, তবে কোনো না কোনোভাবে তা শরিয়তবিরোধী কাজ বা সুদি লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। এ ব্যাপারে আমরা চারটি মতামত পাই।

প্রথম মত : এসব কোম্পানির প্রাইমারি শেয়ার যদি এ উদ্দেশে কেনা হয় যে, মূল কোম্পানিতে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বছর শেষে লাভবান হবে (উরারফবহফ পাবে), তাহলে চারটি শর্তসাপেক্ষে তা বৈধ হবে। ক. কোম্পানির মূল কারবার হালাল হতে হবে। খ. ঋধপব ঠধষঁব বা শেয়ারের অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম-বেশি করে ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানির খরয়ঁরফ অংংবঃ (নগদ অর্থ ইত্যাদি) এর সঙ্গে সঙ্গে ঋরীবফ অংংবঃ (পণ্য, বিল্ডিং ইত্যাদি) উল্লেখযোগ্য পরিমাণ থাকা। গ. কোম্পানির অএগ বা বার্ষিক সাধারণ সভায় সুদি লেনদেন বা শরিয়তবিরোধী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। ঘ. কোম্পানির আমদানিতে সুদ অন্তর্ভুক্ত হলে লভ্যাংশ থেকে সে হিসেবে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া সদকা করে দেওয়া। আর যদি ঈধঢ়রঃধষ এধরহ-এর জন্য শেয়ার ক্রয় করে থাকেন, যাতে কোম্পানির লভ্যাংশ নয় বরং শেয়ারকে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে কেনা-বেচা করাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলেও পূর্বোক্ত শেষ দুই শর্তসাপেক্ষে তা বৈধ হবে। মুফতি তাকী উসমানী দা. বা. তার বিভিন্ন ফতওয়ায় ও প্রবন্ধ-নিবন্ধে এ অভিমত ব্যক্ত করেন।

দ্বিতীয় মত : এসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় কোনোভাবেই বৈধ নয়। কেন না, এতে প্রকারান্তরে কোম্পানির শরিয়তবিরোধী কাজে সমর্থন দেওয়া হয়, যা আল্লাহ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। (সুরা মায়েদা : ২)। তাছাড়া ১ম মতের ১ম অংশের ক্ষেত্রে উল্লিখিত ‘খ’ ও ‘গ’ শর্ত দুটি বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা অবাস্তব। আর ২য় অংশে উল্লিখিত ক্রয়-বিক্রয়ে (ঈধঢ়রঃধষ এধরহ এর ক্ষেত্রে) ঝঢ়বপঁষধঃরড়হ তথা শেয়ারের দরদাম বাড়া-কমার আন্দাজের ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয়কে মাইসার বা জুয়া সাব্যস্ত করে শায়খ মুহাম্মদ আদদারীসহ অনেকে একে নাজায়েজ বলেছেন।

তৃতীয় মত : শেয়ার ব্যবসার কোনো প্রকারই বৈধ নয়। এর মূল কারণ, শরিয়ত কোম্পানি নামের আইনসৃষ্ট ব্যক্তিকে সমর্থন করে না। কাজেই এর কোনো কাজই বৈধ নয়। তাছাড়া কোম্পানির শেয়ার ক্রয় কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার নামান্তর। কাজেই এতে ঋণের বিধানানুসারে সুদ চলে আসে। মুফতি ইবরাহিম দেসায়ীসহ অনেকেই এই মত পোষণ করেন। তাদের বক্তব্য হলো, মুফতি তাকী উসমানী দা. বা. যে অভিমত প্রকাশ করেছেন, তা তিনি তার চূড়ান্ত মত হিসেবে প্রকাশ করেননি। বরং তিনি এ ক্ষেত্রে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন।

মুফতি ইবরাহিম দেসায়ী দেওবন্দীর নেতৃত্বে সাউথ আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দারুল ইফতার মুফতিরা দীর্ঘ গবেষণার পর প্রচলিত শেয়ার ব্যবসাকে পুরোপুরি অবৈধ বলে অভিমত প্রকাশ করেন।

চতুর্থ মত : যেসব কোম্পানির মূল ব্যবসা হালাল, কিন্তু তা সুদি লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত, ওই সব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় সুনিশ্চিত হারাম না হলেও যথেষ্ট সন্দেহযুক্ত। তাই এ ব্যবসা পরিত্যাগ করাই একজন মুত্তাকি মুসলিমের প্রথম দায়িত্ব। বর্তমান পুঁজিবাজার শরিয়তের দৃষ্টিতে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। সুদ, জুয়া, ধোঁকাÑ কী নেই এতে। রাসুল (সা.) বলেন, পাপ তাই, যা তোমার অন্তরে খটকা লাগে। আর তুমি অপছন্দ করো যে মানুষ তা জানুক। (মুসলিম : ২৫৫৩)। তিনি আরও বলেন, হালাল স্পষ্ট, হারামও স্পষ্ট। আর এ দুয়ের মধ্যে আছে অনেক সন্দেহযুক্ত বিষয়, যা অনেকেই জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে বিরত থাকবে, সে তার দ্বীন ও সম্মান বাঁচিয়ে রাখবে। আর যে সন্দেহ যুক্ত বিষয়ে নিমগ্ন হবে, সে ওই রাখালের মতো যে অন্য মালিকের সীমানার কাছাকাছি তার প্রাণীগুলোকে চড়ায়। এটা খুবই সম্ভব যে তার প্রাণীগুলো অবৈধ সীমানায় ঢুকে পড়বে। জেনে রাখো, প্রত্যেক মালিকেরই সীমানা রয়েছে। আর পৃথিবীতে আল্লাহর সীমানা হলো হারাম বিষয়। (এ সীমানার কাছেও যাওয়া উচিত হবে না)। (বোখারি : ৫২)।

শেয়ার ব্যবসা সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের অভিমত ও এই হাদিসদ্বয় সামনে রেখে একজন মুসলিমের জন্য আমরা এটাই নিরাপদ ও তাকওয়ার কাজ মনে করি যে, তিনি প্রচলিত শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক হবেন। যেহেতু বিষয়টি এখনও আলেমদের গবেষণাধীন, তাই বিনিয়োগ না করাই শ্রেয়। আল্লাহ আমাদের হালাল ও হারাম বুঝে সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগ করার তৌফিক দিনÑ আমিন। (চলবে)