
বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় বহুল প্রচলিত লেনদেন হলো, জমি বন্ধক রীতি। কারও টাকার প্রয়োজন হলে কেউ সাধারণত করজে হাসানা দেয় না। বরং জমিবন্ধক প্রদানের শর্তে ঋণ প্রদান করে। ঋণদাতা বা বন্ধকগ্রহীতা বন্ধককৃত জমি ভোগ করে এবং মেয়াদান্তে মালিক পুরো টাকা ফেরত দিয়ে জমি বুঝে নেয়। বিভিন্ন এলাকায় একে ‘জমি কট দেওয়া’ও বলে। আবার কেউ ‘জমি খায়খালাসি দেওয়া’ও বলে।
বিধান : ইসলামে ঋণ প্রদান করে ঋণ প্রদানের কারণে ঋণগ্রহীতা থেকে ঋণের অতিরিক্ত যে কোনো কিছু গ্রহণ করা সুদ। হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘যেসব ঋণ প্রদানের কারণে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি থেকে কোনো ধরনের উপকার বয়ে নিয়ে আসে, সেটা সুদ হবে’ (আল মাতালিবুল আলিয়া বি-যাওয়ায়িদি মাসানিদি ছামানিয়া, ৪/৩৮১, হাঃ ১৪৮৪; সুনান আল কুবরা, বাইহাক্বি ৫/৫৭৩ হাঃ১০৯৩৩; বাগিয়্যাতুল বাহেস আ’ন যাওয়ায়িদিল মুসনাদিল হারেস ১/৫০০০ হাঃ ৪৩৭)।
উক্ত হাদিসে ‘নাফউন’ শব্দের অর্থ নবহবভরঃ, যবষঢ়ভঁষহবংং বাংলায় বলে ‘উপকার, লাভ, মুনাফা ইত্যাদি’। উক্ত ‘বেনিফিট’ ব্যাপক। চাই তা অর্থ দ্বারা হোক বা অন্য যে কোনো উপায়ে অর্জিত হোক সবই এর অন্তর্ভুক্ত। তদ্রুপ চাই তা চুক্তিতে শর্তযুক্ত হোক বা সামাজিক প্রথা ও রীতির ভিত্তিতে শর্তযুক্ত হোক সবটাই উদ্দেশ্য। হাদিসে নিষিদ্ধ বেনিফিট হলো করজদাতার জন্য। গ্রহীতার জন্য নয়। কারণ, সে তো করজ দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্যই করজ গ্রহণ করেছে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েক বছরের জন্য জমি বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম, বাবু কিরাইল আরদ : ৩৮২২)। বোঝা গেল, সমাজে প্রচলিত ‘রেহান’ কোনো শরিয়তসম্মত ক্রয়-বিক্রয় নয়।
রাহন বা ঋণের মূলনীতি : শরিয়তের পরিভাষায় ‘রাহন’ হলো কোনো দাবির বিপরীতে কোনো বস্তুকে এমনভাবে আটক রাখা, যাতে আটককৃত বস্তু দিয়ে দাবি বা অধিকার বা পাওনা আদায় সম্ভব হয়। যেমন ঋণ। সোজা কথায়, রেহান অর্থ বন্ধক। মোট কথা বন্ধক রাখার বিষয়টি ইসলামি শরিয়তে অনুমোদিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন যদি তোমরা সফরে থাক এবং কোনো লেখক না পাও, তবে হস্তান্তরকৃত/অধিকৃত/ আয়ত্তাধীন বন্ধকী বস্তু নিজ দখলে রাখবে। (সুরা বাকারাহ : ২৮৩)। সুরা মুদ্দাচ্ছিরের ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : ‘প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ (রাহিনাহ)।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এক ইহুদি থেকে বাকিতে কিছু খাদ্য ক্রয় করেছিলেন এবং সেই দেনার গ্যারান্টি হিসেবে তার বর্মটি ইহুদির কাছে রেহান (বন্ধক) রেখেছিলেন।
বুরহানুদ্দিন আবুল হাসান আলী ইবনে আবুবকর আল-ফারগানি আল-মারগিনানি (রহ:) তার আল-হিদায়া কিতাবের ‘রাহন’ অধ্যায়ে বলেছেন, রেহান (বন্ধক) রাখা জায়েজ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা রয়েছে। রেহান (বন্ধক) হচ্ছে নিজের পাওনা উসুল নিশ্চিত করার নিমিত্তে সম্পাদিত একটি চুক্তি। ইমাম শাফেয়ি (রহ:) বলেছেন, বন্ধকি বস্তু (রেহান) বন্ধকগ্রহীতার কাছে আমানতস্বরূপ থাকে। আল-মারগিনানি (রহ:) তার আল-হিদায়া কিতাবের ‘রাহন’ অধ্যায়ে আরও বলেছেন, ‘বন্ধক’ (রেহান) গ্রহীতা ব্যক্তির জন্য জায়েজ নেই বন্ধকের (রেহান) মাল দিয়ে উপকৃত হওয়া। সেবা নেওয়া, বসবাস করা বা পরিধান করা কোনোটাই জায়েজ নয়। রেহান রাখা হয় শুধু নিজের পাওনা আদায় করার জন্য।
বলা বাহুল্য, কট প্রথায় জমির বেনিফিটটা মূলঋণের অতিরিক্ত। তাই তা সুদ। শরিয়ার ব্যাপারে অসচেতনতার কারণে কট প্রচলন আজ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বন্ধককে কেন্দ্র করে সুদের লেনদেন গ্রামে-গঞ্জে আরও বহুভাবে হয়ে থাকে। একটি মূলনীতি মনে রাখবেন, ঋণের বিপরীতে বন্ধক গ্রহণ করে যে কোনো উপায়ে সেটা থেকে গ্রহীতা কোনোরূপ উপকার হাসিল করলে সেটাই সুদ বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।
বিকল্প বা জায়েয সুরত : কট প্রথার বিকল্প হল, ঋণদাতা জমি লিজ নিয়ে তা থেকে উপকৃত হবে। তবে এর জন্য শর্ত হলোÑ ক. করজ ও লিজ চুক্তি দুটি সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্রভাবে হতে হবে। খ. একটি চুক্তির সঙ্গে আরেকটি চুক্তি কোনোভাবেই শর্তযুক্ত হবে না। সুতরাং করজ প্রদানের পর করজগ্রহীতা তার জমি লিজ দিতে অস্বীকার করলে তাকে চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। শুধু সঠিক অর্থে জমি বা অন্য কিছু বন্ধক প্রদানের জন্য বলতে পারবে। গ. জমির রেন্ট উরফ অনুযায়ী মতো সংগত হতে হবে।
প্রশ্ন হতে পারে, জমি বর্গা চাষ বা ইজারা দেওয়ার শরিয়াতসম্মত পন্থা কি? জমি বর্গা দেওয়ার ক্ষেত্রে উপরে উল্লেখিত নীতিগুলো মেনে বর্গা দেওয়া যাবে রাফে বিন খাদিজ (রা.) বলেন, আমার দুই চাচা নবী করিম (সা.)-এর যুগে জমি বর্গা দিতেন এভাবে যে, নালার পাশে যে শস্য হবে, তা তাদের অথবা জমির মালিক (শস্য নেওয়ার জন্য) কিছু জমি পৃথক করে দিতেন। নবী করিম (সা.) এরূপ করতে নিষেধ করলেন। হানযালা (রহ.) বলেন, আমি রাফে’ বিন খাদিজ (রা.) কে বললাম, স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে জমির ভাড়া দেওয়া যাবে কি? তিনি বললেন, এতে কোনো বাধা নেই (বোখারি, মুসলিম, মিশকাত : ২৯৭৪)।
জমিতে উৎপাদিত শস্য পারস্পরিক ভাগাভাগির চুক্তিতে বর্গা দেওয়া শরিয়াতসম্মত। আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) খায়বারের জমিতে উৎপাদিত ফল-ফসল অর্ধেক প্রদানের শর্তে বর্গা দিয়েছিলেন (বোখারি, মুসলিম, মিশকাত : ২৯৭২)।
মুহাম্মদ ইবন কাছির (রহ.) বর্ণনা করেন, ইবন উমার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, কৃষি জমি বর্গা দেওয়াকে আমি খারাপ মনে করতাম না। এরপর আমি রাফি ইবন খাদিজ (রা.)-কে এরূপ বলতে শুনি যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। তখন আমি তাঊসের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করি। তিনি বলেন, ইবন আব্বাস (রা.) আমাকে বলেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরূপ করতে নিষেধ করেননি। তবে তিনি বলেছেন, যদি তোমাদের কেউ তার জমি কৃষির জন্য বর্গা দেয়, তবে তা ওই ব্যবস্থার চেয়েও উত্তম যে, কাউকে তা নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে দেবে। (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল বুয়ু,: ৩৩৫৬)।
আবু বাকর ইবন আবী শায়বা (রহ.) বলেন, উরওয়া ইবন যুবায়র (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়দ ইবন ছাবি (রা.) বলেছেন, আল্লাহ রাফি ইবন খাদিজ (রা.) কে ক্ষমা করুন! আল্লাহর শপথ! আমি এ হাদিস সম্পর্কে তার চাইতে অধিক অবহিত। ঘটনাটি এরূপ: একদা দুজন আনসার সাহাবি পরস্পর মারামারি করে নবী (সা.) এর খিদমতে উপস্থিত হয়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের অবস্থা যদি এই হয়, তবে তোমরা জমি বর্গা দেবে না। মুসাদ্দিদ (রহ.) এরূপ অতিরিক্ত বর্ণনা করেছেন যে, রাফি ইবন খাদিজ (রা.) শুধু এতটুকু শোনেন, তোমরা জমি বর্গা দেবে না। (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল বুয়ু,: ৩৩৫৭)।
আমাদের দেশে একটি প্রচলন আছে, আবাদি জমি বন্ধক রেখে টাকা নেওয়া। যেমন : আপনার ৫০ শতক জমি ১ লাখ টাকার বিনিময়ে আমার কাছে বন্ধক রাখলেন, সেই জমি টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত আমার জন্য ভোগ করা জায়েজ হবে কি-না? উক্ত চুক্তিটি জায়েজ হওয়ার দুটি সুরত রয়েছে। এ দুটি সুরত অনুসরণ করলে এ চুক্তি জায়েজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
১ম সুরত : যিনি জমি নেবেন তিনি এ হিসেবে চুক্তি করবেন যে, তিনি জমিটি ভাড়া নিচ্ছেন। নামমাত্র কিছু মূল্য মাসিক ভাড়া হিসেবে নির্দিষ্ট করে নিবে। যেমন ৫০ টাকা বা ১০০ টাকা। আর অগ্রিম ভাড়া হিসেবে প্রদান করবে ১/২ লাখ টাকা। তারপর যেদিন জমিনটি ফেরত নিতে চাইবে, সেদিন আগের নির্ধারণকৃত নামমাত্র ভাড়ার টাকা রেখে বাকি টাকা ফেরত দিয়ে দেবে জমিনটি ভোগদখলকারী তথা জমির ভাড়াটিয়াকে। যেমন আবদুল্লাহ এর জমি আছে। কিন্তু টাকা নেই। তার টাকা প্রয়োজন। আর আবদুর রহমানের টাকা আছে। কিন্তু জমি নেই। তার জমি প্রয়োজন। আবদুল্লাহ তার জমিটি আবদুর রহমানের কাছে দিয়ে ৫ লাখ টাকা নিতে চাচ্ছে। আর আবদুর রহমান টাকা প্রদান করে জমিটির ফসল নিতে চাচ্ছে।
এমতাবস্থায়, আবদুল্লাহ তার জমিটি আবদুর রহমানের কাছে ভাড়া দিবে। মাসিক ভাড়া নির্দিষ্ট করে নিল কথার কথা ৫০ টাকা। যতদিন আবদুর রহমান জমিটি রাখবে, ততদিন মাসিক ৫০ টাকা করে ভাড়া প্রদান করবে। মাসিক ভাড়া অগ্রিম হিসেবে আবদুর রহমান ৫ লাখ আবদুল্লাহকে দিয়ে দিবে। ফলে জমিটির ভাড়াটিয়া হিসেবে আবদুর রহমান ভোগদখল করতে থাকবে। আর আবদুল্লাহ টাকাটি খরচ করতে পারবে।
তারপর যেদিন আবদুল্লাহ তার জমিটি ফেরত নিতে চাইবে, সেদিন বিগত দিনের মাসিক ভাড়া বাদ দিয়ে বাকি টাকা প্রদান করে জমিটি ফেরত নিয়ে নেবে। কথার কথা যদি ৫ মাস পর ফেরত নিতে চায়, তাহলে ৫ মাসের ভাড়া ২৫০ টাকা রেখে বাকি ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৫০ টাকা প্রদান করে আবদুল্লাহ সাহেব তার জমিটি ফেরত নিয়ে নিবেন। (ফতহুল কদ্বীর, কিতাবুয জাকাত ২/১৭৪)।
২য় সুরত : দুটি চুক্তি সম্পাদন করবে। প্রথমে ক্রয় বিক্রয় চুক্তি। তারপর আলাদা আরেকটি চুক্তি নামায় যেদিন টাকা পরিশোধ করতে পারবে, সেদিন জমিটি প্রথম জমির মালিক ক্রয় নিয়ে নিয়ে যাবে, আর বুর্মান মালিক তা বিক্রি করে দিবে মর্মে চুক্তি সম্পাদিত করবে। যেমন- আবদুল্লাহ এর জমি আছে। কিন্তু টাকা নেই। তার টাকা প্রয়োজন। আর আবদুর রহমানের টাকা আছে। কিন্তু জমি নেই। তার জমি প্রয়োজন। আবদুল্লাহ তার জমিটি আবদুর রহমানের কাছে দিয়ে ৫ লাখ টাকা নিতে চাচ্ছে। আর আবদুর রহমান টাকা প্রদান করে জমিটির ফসল নিতে চাচ্ছে।
এমতাবস্থায়, আবদুল্লাহ তার জমিটি ৫ লাখ টাকায় আবদুর রহমানের কাছে বিক্রি করে টাকা গ্রহণ করে নিবে। এভাবে আব্দুল্লাহ টাকার মালিক ও আবদুর রহমান জমিটির ভোগ দখলের মালিক হয়ে যাবে। তারপর ভিন্ন আরেকটি চুক্তি সম্পাদন করবে। যাতে লিখবে যে, যেদিন আবদুল্লাহ ৫ লাখ টাকা দিতে পারবে, সেদিন আবদুর রহমান জমিটি আবদুল্লাহের কাছে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিক্রি করে দিবে। এভাবে ভিন্ন দুটি চুক্তি সম্পাদিত করলে টাকা খরচ করা এবং জমিটি ভোগ দখলের মধ্যে অবৈধতার কোনো কিছুই বাকি থাকবে না। (বাহরুর রায়েক্ব, কিতাবুল বুয়ু’-বাবু খিয়ারিশ শরত ৬/৮; রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বুয়ু’ ৭/২৮১)। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত দেখুন (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৮/২৪৪-২৪৫; শরহু মুখতাসারিত তহাবি ৩/১৪৯; রদ্দুল মুহতার ৬/৪৮২; বাদায়েউস সানায়ে ৫/২১২; শরহুল মাজাল্লা, খালেদ আতাসি ৩/১৯৬-১৯৭; ইলাউস সুনান ১৮/৬৪; ইরওয়াউল গালিল হা/১৩৯৭)। আল্লাহু আলামু বিস সাওয়াব।