
অর্থ-সম্পদ আল্লাহ তায়ালার অন্যতম নেয়ামত। এ নেয়ামত অর্জন করার জন্য রয়েছে নানাবিধ ব্যবস্থা। বেঁচে থাকার জন্য কোনো না কোনো পর্যায়ে অর্থসম্পদের প্রয়োজন পড়ে। মানবজীবনে এটি শরীরের রক্তের সঙ্গে তুলনাযোগ্য। জীবনকে স্বার্থক করার ক্ষেত্রে উপার্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষ অনেক কিছু করতে চায়, কিন্তু উপার্জন তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। উপার্জনের ওপর নির্ভর করে ব্যক্তির অর্থ-সম্পদ অর্জিত হয়। এটি বাস্তব এবং খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়। উপার্জন করার ক্ষেত্রে কী করণীয় রয়েছে এবং কী বর্জন করতে হবে, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে এই প্রবন্ধে।
উপার্জন বলতে কী বোঝায়? উপার্জন শব্দটির সমর্থক শব্দগুলো হচ্ছেÑ আয়, রোজগার, কামাই, লাভ, প্রাপ্তি, সংগ্রহ, অর্জন ইত্যাদি। (ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি)। আরবিতে এবং ইংরেজীতে বলা হয় ওহপড়সব. পরিভাষায় উপার্জন হলো: জীবন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করা। অন্যভাবে বলা যায় যে, Income is the monetary payment
received for goods or services, or from other sources, as rents or investments. (http://dictionary.reference.com/browse/income). মানবজীবনে উপার্জনের প্রয়োজনীয়তা : ক. জীবন পরিচালনার জন্য উপার্জন আবশ্যকীয় : বিষয় জীবন ধারণ করার জন্য উপার্জনে সক্ষম প্রত্যেককে উপার্জন করতে হবে। উপার্জন ছাড়া পৃথিবীতে বসবাস করা সম্ভব নয়। উপার্জন না করে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আর তাই দেখা যায় যে, সালাত শেষ হওয়ার পর উপার্জনে বের হওয়ার কথা আল-কোরআনে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে, তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার। (সুরা জুমআ : ১০)।
খ. পৃথিবী উপার্জন করার একমাত্র ক্ষেত্র : আল্লাহ তায়ালা আমাদের শুধু সৃষ্টিই করেননি, জীবন পরিচালনার জন্য এ পৃথিবীকে কর্মক্ষেত্র করে দিয়েছেন। সে সঙ্গে উপার্জন করার জন্য অসংখ্য ক্ষেত্রের ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ বলেন, তিনিই তো তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তার রিজিক থেকে তোমরা আহার কর। আর তার নিকটই পুনরুত্থান। (সুরা মুলক : ১৫)।
গ. পরিবারিক দায়িত্ব পালন করা : প্রত্যেক ব্যক্তিই পরিবারের সদস্য। তাই পরিবারিক দায়িত্ব পালনে তাকে উপার্জন করতে হয়। পরিবারে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা রয়েছে, যা উপার্জন করে মেটাতে হয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর সন্তানের পিতার উপর কর্তব্য, বিধি মোতাবেক মায়েদের খাবার ও পোশাক প্রদান করা। (সুরা বাকারাহ : ২৩৩)।
ঘ. উপার্জন করার ক্ষমতা দুনিয়ার কল্যাণকর বিষয় : উপার্জন করার যোগ্যতা একটি কল্যাণকর বিষয়। এটা আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের চিন্তা, বুদ্ধি ও বিবেক দিয়েছেন, দু’টি হাত দিয়েছেন। যাতে স্বাবলম্বী হওয়া যায়। অপরের কাছে হাত পাততে না হয়। উপার্জন করার মতো কল্যাণকর বিষয়ে দোয়া করার ভাষা শিক্ষা দেওয়া হয়েছে আল-কোরআনে, আর তাদের মধ্যে এমনও আছে, যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন আর আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন। (সুরা বাকারাহ : ২০১)।
ঙ. স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যম : ইসলাম অপরের ওপর নির্ভর করে জীবন পরিচালনার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেছে। এ মর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ায়, সে কেয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আগমন করবে যে, তার মুখম-লে এক টুকরো গোশতও থাকবে না। (বোখারি, ২য় খ- : ১৪৭৪)।
চ. উত্তরাধিকারীদের স্বচ্ছল রেখে যাওয়ার উপায় : সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) আমাকে এভাবে বলেছেন, তোমাদের সন্তান-সন্তুতিদের সক্ষম ও স্বাবলম্বী রেখে যাওয়া, তাদের অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। (বোখারি, ১ম খ- : ৫২)।
উপার্জনের প্রকারভেদ : আল্লাহ তায়ালা তার সমগ্র সৃষ্টিকে মানুষের খাদেম করেছেন। মানুষ নির্দেশিত পথে তা থেকে উপার্জন বা সম্পদ আহরণ করবে। ইসলাম এমন একটি জীবনবিধান যা কোনটি হালাল আর কোনটি হারাম তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। সেজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হালাল বা বৈধ সুস্পষ্ট এবং হারাম বা অবৈধও স্পষ্ট আর এ দুই এর মধ্যবর্তী বিষয়গুলো হলো সন্দেহজনক। আর বেশিরভাগ লোকই সেগুলো (সম্পর্কে সঠিক পরিচয়) জানে না। অতএব, যে ব্যক্তি ওই সন্দেহজনক জিনিসিগুলোকে পরিহার করল, সে তার দ্বীন ও মান-সম্মানকে পবিত্র রাখল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহের মধ্যে পতিত হলো তার উদাহরণ ওই রাখালের মতো যে পশু চরায় সংরক্ষিত ভূমির সীমানায় এমনভাবে যে, যে কোনো সময়, সে তাতে প্রবেশ করবে। (বোখারি, ৪র্থ খ- : ৫২)। আলোচ্য হাদিস থেকে বোঝা যায় উপার্জন দুই ধরনের। ক. হালাল উপার্জন, খ. হারাম উপার্জন।
হালাল উপার্জন : এটা আল্লাহ তায়ালার বান্দার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ যে, তিনি বান্দার জন্য জমিনে উপার্জন করার বিরাট ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন। তিনি আমাদের কল্যাণে অগণিত সেক্টর তৈরি করেছেন। আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে চান না, বরং তিনি চান তোমাদের পবিত্র করতে এবং তার নেয়ামত তোমাদের ওপর পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর। (সুরা মায়েদাহ : ৬)।
হালাল উপার্জনের গুরুত্ব ও ফজিলত : ক. হালাল উপার্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত : আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। বান্দাহ যেসব ইবাদত করে থাকে হালাল উপার্জন তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এ বিষয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, তাই আল্লাহর কাছে রিজিক তালাশ কর, তার ইবাদত কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তিত করা হবে। (সুরা আনকাবুত : ১৭)।
খ. উপার্জনের উৎস সম্পর্কে কেয়ামতে জিজ্ঞাসা করা হবে : কেয়ামতের দিন আদম সন্তানকে তার উপার্জনের উৎস সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। সেজন্য মোমিনের জন্য হালাল উপার্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে হাদিসে উল্লেখ আছে, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, কেয়ামতের দিন আদম সন্তানকে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক কদমও সস্থান হতে নড়তে দেওয়া হবে না। ১. তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে, ২. যৌবনের সময়টা কিভাবে ব্যয় করেছে, ৩. ধন-সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে, ৪. তা কিভাবে ব্যয় করেছে, ৫. সে দ্বীনের যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সেই অনুযায়ী আমল করেছে কি-না। (তিরমিজি, ৪র্থ খ- : ২৪১৭)।
গ. ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত : আল্লাহর ইবাদত করবে অথচ তার উপার্জন হালাল হবে না, এটা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। অতএব, হালাল উপার্জন ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র। তিনি শুধু পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন। তিনি মোমিনদের সেই আদেশই দিয়েছেন, যে আদেশ তিনি দিয়েছিলেন রাসুলদের। আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ইমানদাররা তোমরা পবিত্র বস্তুসামগ্রী আহার কর, যেগুলো আমি তোমাদের রুজি হিসেবে দান করেছি। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলি-ধুসরিত ক্লান্ত-শ্রান্ত বদনে আকাশের দিকে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করে ডাকছে, হে আমার রব, হে আমার রব অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারা সে পুষ্টি অর্জন করে। সুতরাং তার প্রার্থনা কীভাবে কবুল হবে?। (মুসলিম, ৩য় খ- : ২৩৯৩)।
ঘ. হালাল উপার্জন করা আল্লাহর পথে বের হওয়ার শামিল : হালাল উপার্জন করার জন্য প্রয়োজনে বিদেশেও যেতে হতে পারে। সেজন্য এটিকে কোরআন মাজিদে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার সঙ্গে হালাল উপার্জনকে বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, আর কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে, আর কেউ কেউ আল্লাহর পথে লড়াই করবে। (সুরা মুয্যাম্মিল : ২০)।
ঙ. হালাল উপার্জন আখেরাত বিমুখিতা নয় : আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের এ দুনিয়াতে হালাল উপার্জন করার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছেন। সেজন্য উপার্জন করতে বৈধভাবে চাকরি, ব্যবসায়-বাণিজ্য বা অন্য কিছু করা আখেরাত বিমুখতা নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তাতে তুমি আখেরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর জমিনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না। (সুরা ক্বাসাস : ৭৭)।
চ. হালাল উপার্জন জান্নাত লাভের উপায় : মানুষের দু’টি জীবন রয়েছে, একটি দুনিয়ায়, অপরটি আখেরাতে। অতএব, হালাল পন্থায় উপার্জনকারী দুনিয়াতে কখনও সমস্যায় থাকলেও আখেরাতে জান্নাতে যাবে। এ বিষয়ে হাদিসে এসেছে, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জিত খাবার খায় ও সুন্নাতের ওপর আমল করে এবং মানুষ তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি, ৪র্থ খ- : ২৫২০)।
ছ. হালাল উপার্জন অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন : পৃথিবীর জীবন নির্বাহে হালাল উপার্জন করার সুযোগ বা যোগ্যতা লাভ করা আল্লাহ তায়ালার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। সেজন্য হালাল পন্থায় উপার্জনকারী পরকালে জান্নাতে যাবে। আর অবৈধ পন্থায় উপার্জনকারী ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে সম্পদের পাহাড় গড়লেও পরকালীন জীবনে তার জন্য ভয়াবহ আজাব ও শাস্তি অপেক্ষা করছে। হাদিসে এসেছে, চারটি জিনিস যখন তোমার মধ্যে পাওয়া যাবে, তখন দুনিয়ার অন্য সব কিছু না হলেও কিছু যায় আসে না। তা হলো, আমানতের সংরক্ষণ, সত্য কথা বলা, সুন্দর চরিত্র, হালাল উপার্জনে খাদ্যগ্রহণ। (মুসনাদে আহমদ, ২য় খণ্ড : ৬৬৫২)।