
মানুষ আল্লাহর সেরা সৃষ্টি। মানুষের জন্য আল্লাহর বিধান মানা জরুরি। আল্লাহ তায়া’লা মানুষের জীবন পরিচালনা করার জন্য নিয়ম-নীতি তৈরি করে রেখেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে। একজন মুসলমান কী খাবে, কী পরবে, কীভাবে তার প্রাত্যহিক জীবনে চলাফেরা করবে; তার পুরো নির্দেশনাবলী আল্লাহ তায়া’লা প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে সব মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, যা ক্ষেত্রবিশেষ আমাদের ওপর ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত হয়ে থাকে। আল্লাহর একটি আদেশ হচ্ছে ‘তোমরা সবসময়ই পবিত্র অবস্থায় থাকবে। যদি কোনো কারণে অপবিত্র হয়ে যাও, তাহলে তৎক্ষণাৎ তোমরা পবিত্র হয়ে নেবে।’ আল্লাহ তায়া’লা কোরআন শরিফে বলেন ‘তোমরা যদি অপবিত্র অবস্থায় থাকো, তবে নিজেদের শরীর (গোসলের মাধ্যমে) ভালোভাবে পবিত্র করে নাও।’ (সুরা মায়েদা : ৬)।
পরিষ্কারের অন্যতম উপায় হলো গোসল, ওজু অথবা শুধু জায়গাটা পরিষ্কার করে নেওয়া। আর গোসলের মাধ্যমে পবিত্র হওয়ারও বিভিন্ন ধরন ফিকাহ এবং হাদিসের কিতাবে বর্ণিত আছে। ক্ষেত্রবিশেষ এটি ফরজ, সুন্নাত ও মুস্তাহাব গোসল। সহবাসের পর (সুরা মায়েদা-৬), স্বপ্নদোষ হওয়ার পর, মহিলাদের রক্তস্রাবের পর (বোখারি-৩০৯), সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর (কানযুল উম্মাল-৯/১১০৯) ইত্যাদি কারণে গোসল ফরজ হয়ে থাকে। একটি মাসালা মনে রাখা উচিত, সেটি হচ্ছে মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া জীবিতদের ওপর ফরজ। (বুখারি : ১১৭৫)।
আবার কখনও গোসল আমাদের ওপর সুন্নাতও হয়ে থাকে। যেমন, জুমার দিনে নামাজের পূর্বে (তিরমিজি -৪৮৬), দুই ঈদে নামাজের আগে (ইবনে মাজাহ-১৩০৬), এমন কী ইহরাম পরিধানের জন্য (তিরমিজি-৭৬০) ইত্যাদি। আবার কখনও বা গোসল মুস্তাহাব হয়ে থাকে। যেমন, কদরের রাতে (বোখারি-৩৪), সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের আগে (তিরমিজি-২৭২৩), শিঙ্গা লাগানোর পর (আবু দাউদ : ২৯৪), মাতাল বা বেহুঁশ ব্যক্তির স্বাভাবিক জ্ঞান ফেরার পর (বুখারি : ৬৪৬), ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার সময়, যদি সে পাক থাকে, তবু গোসল করা মুস্তাহাব। কিন্তু সে যদি নাপাক থাকে, তবে তো গোসল করা ফরজ, মৃত ব্যক্তিকে গোসল দানকারীর জন্য (আবু দাউদ-২৭৪৯) ইত্যাদি।
আমরা ঠিকই বর্ণিত কারণগুলোর পর ফরজ গোসল করে থাকি, কিন্তু গোসলের নিয়ম না জানার কারণে বা ফরজ গোসলে কী কী কাজ করতে হয় তা না জানার কারণে আমাদের গোসল হয় না। আর গোসল না হওয়ায় আমরা অপবিত্র থেকে যাই। তাই আমাদের নামাজও হয় না। কেন না, নামাজসহ অনেক মৌলিক ইবাদত কবুলের পূর্র্বশর্ত হলো পবিত্রতা অর্জন। এর জন্য আমাদের জানতে হবে ফরজ গোসলের পদ্ধতি। কীভাবে গোসল করলে আমরা অপবিত্র থেকে পবিত্রতা অর্জন করতে পারব। আর আমাদের ফরজ গোসল সম্পূর্ণ হবে।
আমরা জানি গোসলের ফরজ তিনটি কুলি করা (বোখারি -২৫৭), নাকে পানি দেওয়া (বোখারি-২৬৫), পুরো শরীরে পানি পৌঁছানো (আবু দাউদ -২১৭)। আমাদের ওপর যখন গোসল ফরজ হয়ে যায়, তখন আমরা নিম্নোক্ত পন্থাগুলো অবলম্বন করার চেষ্টা করব। সহবাস বা স্বপ্নদোষ হওয়ার পর প্রথমে প্রস্রাব করা। তারপর লেগে থাকা শুকাণুর জায়গাগুলো পরিষ্কার করে নেওয়া। লজ্জাস্থান ধৌত করা। ভালো করে গড়গড়ার সাথে কুলি করা। নাকের ছিদ্রের ভেতর বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুল দ্বারা ভালো করে পানি পৌঁছানো ও ময়লা পরিষ্কার করা। হাত ভিজিয়ে কানের ছিদ্র মুছা। নাভির ভেতর পরিষ্কার করা। নারীরা তাদের নাকফুল নেড়ে ভেতরে পানি পৌঁছানো। দাড়ি, চুল, গোফের গোড়া ভালোভাবে পানি দিয়ে ভিজিয়ে নেওয়া। কারও হাতে ঘড়ি বা আংটি থাকলে তা নেড়ে ভেতরে পানি পৌঁছানো। নারীদের চুল বাঁধা অবস্থায় না খোলে গোড়ায় পানি পৌঁছানো সম্ভব হলে পুরো চুল ভেজানো জরুরি নয়। আর যদি আগ থেকেই খোলা থাকে, তাহলে পুরো চুল ভেজানো জরুরি। অনেক মেয়েদের দেখা যায় তারা হাতে নেইলপালিশ, রং ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন তাদের জন্য উচিত হচ্ছে এগুলো উঠিয়ে তারপর পানি পৌঁছানো। (রদ্দুল মুহতার-১/১৪২)। আল্লাহ তায়া’লা আমাদের সঠিক বিষয়গুলো বুঝার ও আমল করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামি’য়া ইসলামিয়া আরাবিয়া বলিয়ারপুর, সাভার, ঢাকা।