ঋণ পরিশোধে ইসলামের নির্দেশনা
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জীবনের এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা হচ্ছে ঋণ আদান-প্রদান। প্রয়োজনের সময় মানুষ ঋণ নেয়। ঋণের আদান-প্রদানে ঋণগ্রহীতা ঋণের টাকা নিয়ে যেমন উপকৃত হয় এবং তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে, তেমনি ঋণ দাতাও এর মধ্য দিয়ে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে আসে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে একদিকে ঋণ প্রদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে, অন্যদিকে ঋণ পরিশোধের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করবে, তাদের জন্য হুঁশিয়ারিও উচ্চারিত হয়েছে। ঋণ যথারীতি পরিশোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ প্রদান করে ঋণদাতা গ্রহীতাকে উপকার ও অনুগ্রহ করে থাকে। কিন্তু ঋণ পরিশোধ কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং ঋণ গ্রহীতার ওপর এক অবধারিত দায়িত্ব।
ঋণ গ্রহীতার ওপর এটি ঋণদাতার অধিকার। এমনকি যদি ঋণ গ্রহীতা ঋণ পরিশোধ করার আগে মারা যায়, তাহলে কাফন-দাফনের পর প্রথমেই তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধ করে দিতে হবে। ঋণ পরিশোধের পর যদি অতিরিক্ত কিছু থাকে, তাহলেই শুধু তার ওয়ারিশদের মধ্যে তা বণ্টন করা হবে এবং তাতে তার অসিয়ত কার্যকর হবে।
ঋণ পরিশোধের বিষয়টি একদিকে যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনি হাদিস শরিফে এর ফজিলতের কথাও বর্ণিত হয়েছে। এতে প্রকারান্তরে যথারীতি ঋণ পরিশোধের প্রতি উৎসাহিতও করা হয়েছে। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি পরিশোধ করে দেওয়ার নিয়তে কারও কাছে থেকে ঋণ গ্রহণ করে, আল্লাহতায়ালা তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেন।’ (বোখারি : ২৩৮৭)।
যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া শুধু পাওনা আদায় নয়, বরং এটা ওয়াদা রক্ষা করার অন্তর্ভুক্ত। সময়মতো যেন ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া যায় এজন্য হাদিসে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইমাম বোখারি (রহ.) বর্ণনা করেছেন, হজরত আবু যর (রা.) বলেছেন, আমি একদিন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। একপর্যায়ে ওহুদ পাহাড় তার দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বলেন, ‘আমি চাই না ওহুদ পাহাড় আমার জন্য স্বর্ণে পরিণত করে দেওয়া হলেও এর একটি দিনার আমার কাছে তিন দিনের বেশি সময় থাকুক; হ্যাঁ, যদি কোনো দিনার আমি আমার ঋণ পরিশোধের জন্য রেখে দিই, সেটা ভিন্ন।’ (বোখারি : ২৩৮৮)।
সময়মতো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ঋণগ্রহীতা যেন এ দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারে, সেজন্য হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদের দোয়াও শিখিয়েছেন। দোয়াটি হলোÑ আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিক, ওয়া আগনিনি বিফাজলিকা আম্মান সিওয়াক। অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার হালাল বিষয়ের মাধ্যমে হারাম থেকে বাঁচান এবং আপনার দয়া ও করুণা দিয়ে অন্যদের থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।’ (তিরমিজি : ৩৫৬৩)।
অনেকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করে থাকে। কাজটি সুস্পষ্ট অন্যায়। ঋণ গ্রহীতার মনে রাখা উচিত ঋণদাতা তার ওপর অনুগ্রহ করেছে। এ অনুগ্রহের পরিবর্তে তার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করাই কর্তব্য। সময়মতো যদি তার ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য না থাকে, তাহলে সে সৌজন্য রক্ষা করে ঋণদাতাকে তা জানাতে পারে, তার কাছ থেকে আরও কয়েক দিন সময় চেয়ে নিতে পারে। কিন্তু সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ যথাসময়ে আদায়ে টালবাহানা করা হাদিসে একে সরাসরি জুলুম বলা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘সচ্ছল ব্যক্তির (ঋণ পরিশোধে) টালবাহানা করা অন্যায়।’ (বোখারি : ২৪০০)।
সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে পাওনাদার অনেক সময় কটূকথাও বলে। ইসলামের শিক্ষা হলো, পাওনা টাকার জন্য তাগাদা করার সময় ঋণদাতা যেন সহজ ও কোমল আচরণ করে, কোনো কটূবাক্য ব্যবহার না করে। কিন্তু এরপরও যদি সে কটূ কথা বলে, অসুন্দর আচরণ করে, তাহলে ঋণ গ্রহীতার উচিত, তার সঙ্গে বাদানুবাদে কিংবা ঝগড়া-তর্কে জড়িয়ে না পড়া। হাদিসে আছে, এক ব্যক্তির কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু ঋণ নিয়েছিলেন। সে এসে তার সঙ্গে কঠোর ভাষায় কথা বলতে লাগল। তা দেখে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাকে মারতে উদ্যত হচ্ছিলেন। কিন্তু হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও, পাওনাদারের একটু কথা বলার অধিকার রয়েছে।’ (বোখারি : ২৪০১)।
ঋণ পরিশোধের সময় ঋণগ্রহীতা ইচ্ছা করলে ঋণদাতার অনুগ্রহের বদলাস্বরূপ তাকে কিছু টাকা বাড়িয়েও দিতে পারে কিংবা যে মানের সম্পদ ঋণ নিয়েছিল, তাকে এর চেয়ে উৎকৃষ্ট মানের জিনিস ফেরত দিতে পারে। বাড়িয়ে দেওয়ার যদি স্পষ্ট কিংবা অস্পষ্ট কোনো আগের কথা না থাকে, তাহলে এটা নিষিদ্ধ সুদের অন্তর্ভুক্তও হবে না। অনুগ্রহের বিনিময় তো অনুগ্রহ দিয়েই হতে পারে। প্রিয় নবীজি (সা.) এর জীবনী থেকেও আমরা এ অনুগ্রহের শিক্ষা পাই। হজরত জাবের (রা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার কাছ থেকে একবার ঋণ নিয়েছিলেন। যখন তিনি তা আমাকে পরিশোধ করলেন, তখন আমার পাওনার চেয়েও বাড়িয়ে দিলেন।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৩৩৪৯)।
পাওনা পরিশোধকালে পাওনাদারের কৃতজ্ঞতা জানানো এবং তার জন্য কল্যাণের দোয়া করা, ইসলামের এক অনন্য শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি রবিয়া (রা.)-এর থেকে ৪ হাজার দিরহাম ঋণ করেছিলেন। পরিশোধের সময় তিনি তার জন্য দোয়া করলেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদে বরকত দান করুন।’ (সুনানে নাসায়ি : ৪৬৮৩)।
আলোকিত ডেস্ক
