মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

যেভাবে ঈমানের স্বাদ হাসিল হয়

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. সালেহ বিন আবদুল্লাহ বিন হামিদ

ঈমানের স্বাদ তুলনাহীন

হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলি বলেন, ‘ঈমানেরও মিষ্টতা আছে, স্বাদ আছে। জিহ্বা দ্বারা যেমন খাদ্য ও পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করা যায়, হৃদয় দ্বারা তেমন ঈমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। খাদ্য ও পানীয় যেমন দেহের আহার্য, ঈমান তেমনই আত্মার আহার্য। সুস্থ শরীর প্রতিটি খাবারের স্বাদ ঠিক অনুভব করতে পারে। শরীর অসুস্থ হলে কখনও উপকারী খাবার বিস্বাদ মনে হয়; আর ক্ষতিকর খাবারকে মনে হয় সুস্বাদু। মনও তেমন; রিপুর তাড়না থেকে নিরাপদ হলে, হারামের চাহিদা থেকে মুক্ত হলে, ঈমানের স্বাদ উপভোগ করতে পারে। কিন্তু মন যদি অসুস্থ হয়, তাতে হারামের চাহিদা থাকে, রিপুর তাড়নার কাছে বশীভূত হয়; ঈমানের স্বাদ আর সে আস্বাদন করতে পারে না। বরং পাপ, পঙ্কিলতা আর আল্লাহর অবাধ্যতার মতো বিষয়গুলো তার ভালো লাগতে শুরু করে।’

ঈমানের স্বাদ কাকে বলে?

ঈমানের স্বাদের মর্ম হলো, ইবাদত-বন্দেগি করতে ভালো লাগা। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-কে সন্তুষ্ট করার জন্য কষ্ট সহ্য করে নেওয়া। দুনিয়ার সম্মানের ওপর এটাকে প্রাধান্য দেওয়া। শরিয়তের দাবি পূরণে হৃদয় প্রস্তুত রাখা। আল্লাহ যাতে সন্তুষ্ট হন, সর্বদা তা করতে সচেষ্ট থাকা। ঈমান ও ইবাদতের স্বাদ গ্রহণে রয়েছে হৃদয়ের প্রশান্তি, আত্মার সৌভাগ্য। এটি একটি চমৎকার স্বাদের ব্যাপার, উপভোগ্য বিষয়। ব্যক্তিভেদে এর তারতম্য হয়। অবস্থাভেদে ধরন ভিন্ন হয়। কখনও বাড়ে, কখনও কমে। এতে উত্থান-পতনও রয়েছে। মানুষের মাঝে উন্নত লক্ষ্য নির্ধারণ ও সংকল্পের দৃঢ়তায় কখনও আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেখা যায়। ঈমানের স্বাদ আল্লাহর আনুগত্যে স্থির থাকার চাবিকাঠি। ইবাদতে মজা পেলেই মানুষ নানা পরীক্ষার সামনে অটল-অবিচল থাকতে পারে।

পার্থিব সুখ বনাম নেক আমলের তৃপ্তি

দুনিয়া পাপ-পঙ্কিলতা ও বাধা-বিপত্তিতে মোড়ানো। নেক আমলের স্বাদ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন। দুনিয়ার আরাম-আয়েশে একঘেয়েমি এসে যায়। নেক আমলের শান্তি উপভোগে কোনো ক্লান্তি আসে না, একেঘেয়েমি অনুভব হয় না। নেক আমল যত বেশি হতে থাকে, স্বাদ তত বাড়তে থাকে, সৌভাগ্যের দ্বার তত উন্মোচিত হয়। দুনিয়ার আরাম-আয়েশ ভোগ করতে গেলে অনেক সময় পরকাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু নেক আমলের স্বাদ উপভোগের মাধ্যমে দুনিয়াও লাভ হয়, পরকালও পাওয়া যায়।

ঈমানের স্বাদ অর্জনের উপায়

ঈমানের স্বাদ উপভোগ করতে হলে, ইবাদতে তৃপ্তি পেতে হলে, সর্বপ্রথম আত্মা পরিশুদ্ধ করতে হবে। অপরিচ্ছন্ন পাত্রে পান করে পানীয়ের কাক্সিক্ষত স্বাদ পাওয়া যায় না। পূর্ণ স্বাদ ও মিষ্টতা তখনই মেলে, যখন পাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়। এরপর তাতে পানীয় পরিবেশন করা হয়। যে হৃদয় পাপের পঙ্কিলতায় ডুবে আছে, যে হৃদয়ে ভুলের কাদা লেগে আছে, যে হৃদয় রিপুর তাড়নায় অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে, সে হৃদয় ঈমানের স্বাদ উপভোগ করতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তিনটি কাজ করলে ঈমানের স্বাদ উপভোগ করা যাবে। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে হবে, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; সম্পদের জাকাত আদায় করতে হবে ও আত্মা পরিশুদ্ধ করতে হবে।’ (সুনানে আবি দাউদ : ১৫৮২ )। রাসুল (সা.) বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমার হৃদয়ে আপনার ভয় দান করুন। হৃদয় পরিশুদ্ধ করুন। আপনিই উত্তম পরিশুদ্ধকারী। আপনিই হৃদয়ের প্রকৃত আপন ও মনিব।’ (মুসলিম : ২৭২২)। বিশর ইবনে হারেস বলেন, ‘কোনো মানুষ যতক্ষণ তার ও তার রিপুর চাহিদার মাঝে লোহার পাঁচিল দাঁড় না করাবে, ততক্ষণ ইবাদতের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবে না।’

কিছু ফরজ আছে বাহ্যিক, কিছু আছে অভ্যন্তরীণ। এসব ফরজ আদায়ের মাধ্যমেই মূলত আত্মা পরিশুদ্ধ হবে। সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে হবে। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। নিজের শক্তি-সামর্থ্যরে ওপর ভরসা করা যাবে না।

প্রথম ফরজ হলো, আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করা, তাঁরই জন্য ইবাদত করা, তাঁরই ওপর ভরসা করা, তাঁকেই ভালোবাসা, তাঁরই মাঝে প্রশান্তি খুঁজে নেওয়া, তাঁরই কাছে আশা করা। আল্লাহতায়ালাই বান্দার চিন্তা ও সংকল্প নিয়ন্ত্রণ করেন। যার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকবে, সে আনুগত্যের স্বাদ পাবে। আল্লাহর আদেশ পালনের মতো স্বাদ আর কোনো কিছুতেই নেই। আল্লাহর ইবাদতে যার চোখ শীতলতা লাভ করে, তাকে দেখে জগৎবাসীর চোখ শীতল হয়। আর আল্লাহর ইবাদতে যার চোখ শীতল হয় না, একসময় তার নিজের হৃদয়ও তাকে নিয়ে আফসোস করতে থাকে। নিজের মনও তার পর হয়ে যায়।

আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে আরেকটি কাজ হলো, গোনাহ থেকে তওবার চেষ্টা করা। বেশি বেশি তওবা-এস্তেগফার করতে হবে। আল্লাহর কাছে ঈমানের দৃঢ়তা ও সঠিক পথপ্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা করতে হবে। হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি দাসত্বের মনোভাব জাগিয়ে তুলতে হবে। আল্লহর প্রতি যত বেশি দাসত্বের মনোভাব জাগ্রত হবে, নিজেকে তত অক্ষম মনে হতে থাকবে। ফলে এক আল্লাহর সঙ্গে মন লেগে থাকবে। এ জন্য বুজুর্গরা নিজ মনের মুনাফেকি ও কপটতাকে সবচেয়ে বেশি ভয় করতেন। মুতাররিফ ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, ‘অহঙ্কার ও আত্মমুগ্ধতার সঙ্গে ইবাদতে রাত কাটানোর চেয়ে অনুতপ্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে রাত কাটানো আমার কাছে অধিক প্রিয়।’ আত্মমুগ্ধ ব্যক্তির কোনো আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। দাম্ভিক ও আত্মমুগ্ধ ব্যক্তির তাসবি জপার চেয়ে আল্লাহর কাছে গোনাহগারের কান্না অধিক পছন্দনীয়। বিনয়ী হৃদয়ই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। যে হৃদয়ে নিজের অক্ষমতার বোধ আছে, এমন হৃদয়ের অধিকারী আল্লাহর সামনে মাথা নত করে রাখে। লজ্জা ও অনুতাপে আল্লাহর সামনে কখনও মাথা উঁচু করে না।

যেসব বিষয় মনে অন্যরকম তৃপ্তি আনে, অপার্থিব স্বাদে হৃদয় পূর্ণ করে, তার অন্যতম হলো দোয়া। দোয়া এমন অস্ত্র, যা কখনও ভোঁতা হয় না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন নেয়ামত চাই, যা কখনও শেষ হবে না। চোখের এমন শীতলতা চাই, যা কখনও হারিয়ে যাবে না।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৮৩৫১)। আমাদের গভীর মনোযোগের সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত করতে হবে। নফল ইবাদত, আল্লাহর জিকির, নিজের মন-চাহিদার ওপর আল্লাহর পছন্দকে প্রাধান্য দান, আল্লাহর দয়া-মায়া ও অনুগ্রহের উপলব্ধি, সুবহে সাদিকের সময়কে ইবাদতে ব্যয় করা এবং বুজুর্গদের সান্নিধ্য লাভের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে হবে।

আল্লাহর ভালোবাসা ইবাদতে আগ্রহ সৃষ্টি করে। দুনিয়ায় সবচেয়ে উপভোগের বিষয় হলো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। তদ্রুপ পরকালে সবচেয়ে উপভোগের বিষয় হবে, আল্লাহর দর্শন। এ জন্য রাসুল (সা.) বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার সুমহান চেহারার দর্শন প্রার্থনা করছি। আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের আকাক্সক্ষা করছি।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৮৩৫১)। কোনো এক বুজুর্গ বলেন, ‘পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখের বিষয়, আল্লাহর পরিচয় লাভ ও তাঁর ভালোবাসা; আর পরকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ।’ অন্য এক বুজুর্গ বলেন, ‘দুনিয়ার নিঃস্বরা দুনিয়া ত্যাগ করল; কিন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে স্বাদের জিনিস ভোগ করতে পারল না।’ তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে স্বাদের জিনিস কী?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর ভালোবাসা ও তাঁর জিকির।’

ঈমানের স্বাদ গ্রহণে বাধা

ঈমানের স্বাদ গ্রহণে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপের কাজ ঈমানের স্বাদ গ্রহণে বড় বাধা। গোনাহ এমন মোটা আবরণ, যা হৃদয়ে ঈমান ও ইবাদতের স্বাদ অনুভূত হতে দেয় না। গোনাহের কারণে অন্তর শক্ত হয়ে যায়। রুক্ষ্মতা চলে আসে। কোনো এক বুজুর্গ বলেন, ‘আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো, মন শক্ত হয়ে যাওয়া।’ অনেক লোক এমন রয়েছে, যার দৃষ্টিশক্তি তো ঠিক আছে; কিন্তু সে অন্তর্দৃষ্টির আলো থেকে বঞ্চিত। তার বাকশক্তি বিদ্যমান, কিন্তু হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা থেকে অনেক দূরে। আহার সন্দেহজনক হওয়ার কারণে তার হৃদয় অন্ধকার হয়ে গেছে। তাহাজ্জুদ ও মোনাজাতে কোনো স্বাদ আসে না। জুন্নুুন মিসরি (রহ.) বলেন, ‘শরীর রোগাক্রান্ত হলে যেমন খাদ্যের স্বাদ অনুভব করতে পারে না, তেমন বান্দা গোনাহগার হলে তার হৃদয়ও ইবাদতের স্বাদ উপভোগ করতে পারে না।’

দুশ্চিন্তা ও বিপদাপদ কখনও আল্লাহর পক্ষ থেকে নগদ শাস্তি হয়ে থাকে। আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, হৃদয়ে তাঁর ভালোবাসা বিরাজ করা, তাঁর জিকিরে জবান তরতাজা থাকা, তাঁর মারেফাতে হৃদয় আনন্দিত হওয়া; এগুলো নগদ পুরস্কার, দুনিয়াতেই যেন জান্নাতের সুখ লাভ করা। এ এমন সুখময় জীবন, যে জীবনের কোনো তুলনা হয় না। গোনাহের কারণে হৃদয় মরে যায়। গোনাহ ত্যাগের মাধ্যমে হৃদয় প্রাণশক্তি লাভ করে। হৃদয় যখন জীবিত থাকে, প্রাণময় থাকে, তখনই ঈমান ও ইবাদতের স্বাদ অনুুভব করা যায়। সব আমলে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা চাই। শুধু তাঁরই জন্য আমল করা উচিত। হৃদয় যখন আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকবে, তখনই তাঁর সঙ্গে ভালোবাসা তৈরি হবে। তিনি আপন হয়ে যাবেন। আহ, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের কত সুখ! কতই না ক্ষতিগ্রস্ত সেসব লোক, যারা আল্লাহ থেকে দূরে!

১১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি মোতাবেক ১৪ জানুয়ারি ২০২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর মুইনুল ইসলাম