প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
মাওলানা নাসীম আরাফাত; বিশিষ্ট বাংলা ও আরবি ভাষার কথাসাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, অনুবাদক ও সম্পাদক। অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দেশের খ্যাতনামা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকার মুহাদ্দিস হিসেবে। শিক্ষকতার পাশাপাশি আশির দশক থেকে নিরলস লেখালেখি ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন নীরব এ সাধক। ছাত্রজীবনে মাদ্রাসার দেয়ালিকার মাধ্যমে প্রথম তার লেখালেখির হাতেখড়ি। এ যাবৎ আরবি ও বাংলা ভাষায় রচিত গল্প, উপন্যাস ও জীবনীগ্রন্থ মিলে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। প্রকাশের পথে রয়েছে আরও দশোর্ধ্ব বই। তার লেখার প্রধান বিষয়Ñ রাসুল (সা.)-এর সিরাত, সাহাবায়ে কেরাম ও বাংলার মনীষী আলেমদের জীবনকথা। জীবনের ৫৪টি বসন্ত পেরিয়ে আসা এ বিশিষ্ট লেখকের অধিকাংশ বই সৃজনশীল ও গতানুগতিক ধারার বাইরে। লেখালেখিকে কেন্দ্র করে বাংলাবাজারের ইসলামি টাওয়ারে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘মাকতাবাতুল হুদা আল ইসলামিয়া’। লেখালেখি ও একুশে বইমেলা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের সহ-সম্পাদক মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
লেখালেখিতে কীভাবে এলেন?
লেখালেখি একটি কঠিন বিষয়। সাধারণত কওমি আলেমরা লেখালেখিতে আসেন না। আমি এমন একটা পরিবেশ পেয়েছি, যার কারণে লেখালেখিতে আসতে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। জীবনের শুরুতে বেশ কয়েকজন লেখক উস্তাদের সংশ্রব পেয়েছি। বিশেষ করে, মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ (আদিব হুজুর), খুলনার মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান ও মাওলানা ইসমাইল বরিশালীর কথা না বললেই নয়। তারা নিয়মিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনে লিখতেন। হাফেজ্জি হুজুরের খেলাফত আন্দোলনের দায়িত্বশীলরা একটি পত্রিকা বের করতেন। নানা সময়ে তারা ক্রোড়পত্র প্রকাশ করতেন। আমি তাদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতাম। এভাবে দেখতে দেখতে লেখালেখির প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়।
কখন মনে হতে লাগল, আপনি লেখক?
১৯৮৪ সালের কথা। খেলাফত আন্দোলন থেকে একটি পত্রিকা বেরুত। যার সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আখতার ফারুক। সে পত্রিকায় সিরাতবিষয়ক লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আমি তাতে অংশ নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করি। সে লেখাটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমার বাসায় সংরক্ষিত ছিল। এখন আর খুঁজে পাই না। আমার জীবনে ওই লেখাটি আমাকে অনেক উৎসাহিত করেছে। এরপর একটি আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করতে পেরেছি যে, আমি চেষ্টা করলে লেখক হতে পারব। তখন থেকেই আমার লেখালেখির প্রতি অনুরাগ ছিল। ১৯৮৮ সালের কথা। শিক্ষা সমাপ্তির পর মাদ্রাসাতুল মদিনায় শিক্ষক হলাম। সহপাঠী মাসউদুর রহমান বিশ্বাস ভাই আরমানিটোলার তারা মসজিদের ইমাম সাহেবের তত্ত্বাবধানে একটি পত্রিকা বের করতেন। তাতে প্রতি মাসে একটি করে লেখা দিতাম। সে লেখাগুলোর সমষ্টি আমার বই ‘কিসরার মুকুট’। এ ক্ষেত্রে আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন মাসউদুর রহমান বিশ্বাস ভাই। তখন লালবাগ থেকে ‘দৈনিক আজাদ’ নামে একটি পত্রিকা বেরুত। আমি তাতেও লিখতাম। এভাবে লিখতে লিখতে সাহস হলো। তারপর লেখা শুরু করলাম ‘জাগো মুজাহিদ’ পত্রিকায়। ওই পত্রিকার কোনো সংখ্যা আমার লেখা ছাড়া বেরুত না। কখনও কোনো সংখ্যায় দুটি, কখনও তিনটি লেখাও ছাপা হতো। গল্প লিখতাম, দেশে দেশে ইসলাম পাতায় লিখতাম, ছোটদের পাতায় লিখতাম, বিদেশি পত্রিকার বিভিন্ন প্রবন্ধ অনুবাদ করতাম। এভাবে লিখতে লিখতে নিজের অজান্তেই কীভাবে যেন লেখক বনে গেলাম।
আলেম বা শিক্ষক হয়েও লেখালেখিতে কেন এলেন?
লেখালেখি গণমানুষের কাছে বিশুদ্ধ ভাষায় দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম। সেজন্য আমি এপথ বেছে নিয়েছি। জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে আসার পর আমার ইচ্ছে জাগল, ভালো শিক্ষক হব। ইচ্ছে ছিল, বড় কিতাব পড়ানোর। কিন্তু আমার যেহেতু বড় কিতাব পড়ানোর দায়িত্ব তখন আসেনি, তাই আমি নিজেকে আবার লেখালেখির মাঝে নিয়োজিত রাখি। ফলে আমি লেখালেখির একটি অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ পেয়েছি। দেশ-জাতিকে নিয়ে ভাবনার ফুরসত জুটেছে। আল্লাহর তৌফিকে কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যসূচির সেবায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার মতো একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়েছি। তবে শুরুর দিকে কখনও মনে হতো না যে, আমার সমসাময়িক শিক্ষকরা আমার চেয়ে বড় বড় কিতাব পড়ান, আমি তো পারছি না। আমার বোখারি দ্বিতীয় খ-ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মাওলানা ফয়জুদ্দিন (রহ.) আমাকে উৎসাহ দিতেন। তখন মালিবাগ জামিয়ায় তার রুমের পাশেই আমার রুম ছিল। আমি দরসের অবসরে সারাদিন লেখালেখি করতাম। তিনি যখনই রুমে আসতেন, আমাকে দেখতেন আমি লিখছি। কিছু বলতেন না। তার মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে একদিন আমার রুমে এলেন। বললেন, ‘হাদিসে আছে, তুমি যাকে মহব্বত করো, তাকে বলে দাও। আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য মহব্বত করি। কেননা, আপনি সময় নষ্ট করেন না। আমার এখন বুঝে এসেছে, আপনাকে কেন বড় কিতাবের দরস দেওয়া হয় না। তবে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, অচিরেই আপনার পদোন্নতি হবে, ইনশাআল্লাহ।’ অথচ এখনকার বাস্তবতা হলো, আমাকে বড় কিতাব দেওয়া হলেও পড়ানোর সুযোগ নেই। ব্যস্ততা বেড়েছে। লেখালেখি ও গবেষণার দ্বার বিস্তৃত হচ্ছে ধীরে ধীরে।
আপনার লেখালেখির হাতেখড়ি কোথায়Ñ কীভাবে?
ছাত্রজীবনে নুরিয়া মাদ্রাসায় আরবি-বাংলা ভাষার দুটি দেয়ালিকা বেরুত। তাতে লেখার সঙ্গে দারুণ কিছু অংকন থাকত। দেয়ালিকায় আলোকসজ্জা ছিল। আমি নুরিয়ার সেই দেয়ালিকায় নিয়মিত লিখতাম। এরপর মালিবাগ জামিয়ায় ভর্তি হওয়ার পর আমাদের জামাতে বাংলা বেশি জানতাম আমি। আবার আরবিও জানতাম। তখন বিদগ্ধ লেখক ও গবেষক আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া (রহ.) ছিলেন দেয়ালিকার দায়িত্বশীল। লেখালেখিতে যাদের হাত আছে, তাদের নির্বাচন করলেন তিনি। হুজুর তখন আমাদের নির্বাচনের জন্য পরীক্ষা নিলেন। আমাদের ভ্রমণকাহিনী লিখতে বললেন। আমি দারুণ উপস্থাপনায় একটা ভ্রমণগল্প লিখে ফেলি। আমার লেখাটি হুজুরের খুব পছন্দ হয়। তিনি আমাকে বাংলা দেয়ালপত্রিকার সম্পাদক নির্ধারণ করলেন। আর আদিব হুজুরের ছাত্র হওয়ার সুবাদে আরবি বেশ ভালো জানতাম। তাই আমাকেই নিতে হলো আরবি দেয়ালপত্রিকার দায়িত্ব। নুরিয়ায় পড়াকালে মাওলানা বশির মিসবাহর অংকন দেখতাম। তাই কিছু অঙ্গসজ্জাও করতে পারতাম। ফলে মালিবাগ জামিয়ায় হেদায়া জামাতে পড়াকালে আমার কাঁধে দেয়ালিকার যাবতীয় দায়িত্ব অর্পিত হলো।
লেখালেখিতে কে বা কারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছেন?
শিক্ষকতা শুরু করার পর মনে হলো, লেখালেখি করা দরকার। আর আমি যেহেতু বড় কোনো কিতাব পড়াতাম না, তাই সুযোগ পেতাম। আর শিক্ষকতার ময়দানে তো প্রতিযোগিতার বিষয় থাকে। সেখানে আমি কোনো কিতাব না পড়াতে পারলে আমার চেয়ে যোগ্য আরও বহু মানুষ রয়েছেন। কিন্তু তখনকার সময় লেখালেখির এ অঙ্গনে আমার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। তবে পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। তখন পা-ুলিপি নিয়ে কেউ প্রকাশ করে দিত না। এমন কাউকে পেতাম না, যার হাত ধরে এ পথে হাঁটব। তবে চলার পথে জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগের সিনিয়র মুহাদ্দিস, বিদগ্ধ লেখক ও গবেষক আমার উস্তাদ মাওলানা আহমদ মায়মুন আমাকে বেশ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। ইসলামিয়া কুতুবখানা থেকে আল্লামা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়াকে একটি বই অনুবাদ করতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি তা করেননি। তখন মাওলানা আহমদ মায়মুন সাহেব হুজুর অনুবাদের কাজটি আমাকে দিলেন। আমি কাজটি করি। হজরত ইসমাইল শহিদ (রহ.)-এর জীবনের ওপর করা আমার সে কাজটি আমাকে বেশ অনুপ্রাণিত করে। আরেকজন আমাকে বেশ উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি আমাদের থেকে অনেক বড়, দৈনিক ইনকিলাবের সহ-সম্পাদক ও বিদগ্ধ লেখক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী। তার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আমাকে এমদাদিয়া লাইব্রেরির মালিকের কাছে নিয়ে যান। পরিচয় করিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে আমার একটি বই প্রকাশিত হয়। আমার কাছে নবীজীবন ও সাহাবাচরিত নিয়ে কিছু পা-ুলিপি প্রস্তুত ছিল। সেগুলো নিয়ে বায়তুল মোকাররমে যাই। সেখানে এক ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমাকে কাঁটাবন আর.এ.এস পাবলিকেশন্সের মালিক রফিকুল ইসলাম সরদার ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তিনি আমার লেখা দেখেন। আমার তিনটির মতো বই প্রকাশ করেন। বলতে গেলে, এ তিনজনের হাত ধরে আমার লেখার গতি অগ্রসর হতে থাকে। মাওলানা আবু তাহের মেসবাহর (আদিব হুজুর) ছাত্র হলেও আমি তার কাছ থেকে বাংলা শেখার তেমন কোনো দিকনির্দেশনা পাইনি। তবে আরবি সাহিত্য শিখেছি তার কাছ থেকে। আমি হুজুরকে প্রচুর আরবি লেখা দেখাতাম। তিনি তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখে দিতেন। হুজুরের সম্পাদিত ইকরা ও পরবর্তী সময়ে আল কলমে আমি লিখতাম। আমি যে লেখা দিতাম, তার এক-তৃতীয়াংশ ছাপা হতো। বাকিটুকু হুজুরের লেখা থাকত। কিন্তু আমার নামে তিনি ছাপতেন। আমাকে উৎসাহ দিতেন। তখনকার দিনে এটা আমার জন্য কম আনন্দের ছিল না।
কার বা কাদের লেখায় আপনি বেশি প্রভাবিত?
তেমন নির্দিষ্ট কেউ বা কারও লেখা নেই। তবে ছাত্রজীবনে প্রচুর উপন্যাস ও গল্পের সিরিজ পড়তাম। নিয়মিত কয়েশ’ খ-ের সিরিজ পড়ে শেষ করেছিলাম। নুরিয়াতে পড়াকালে লালবাগের এক পাঠাগার থেকে বই সংগ্রহ করতাম। সেসব পড়ার কারণে আমার লেখালেখিতে বেশ গতি আসে।
মাদ্রাসার ভেতরেই কী বাংলা সাহিত্যচর্চা করতেন?
না, ছুটির দিনে বাসায় বই পড়তাম, লেখালেখি করতাম। লালবাগে যে পুরোনো লাইব্রেরি ছিল, আমি তার সদস্য ছিলাম। বাসায় যাওয়ার আগে সেখান থেকে পছন্দের বই সংগ্রহ করতাম। বাসায় থাকাকালে বইগুলো পড়ে শেষ করে শুক্রবার আবার ফেরত দিতাম। তবে আমি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাঠাগার থেকে। সেখানে ঢোকার সময় সঙ্গে দুটি রুটি নিতাম। দুপুর হলে খেয়ে নিতাম। সারাদিন বইয়ে মগ্ন হয়ে নিবিষ্ট চিত্তে অধ্যয়ন করতাম। এশার পর বেরুতাম।
লেখালেখিতে পারিবারিক সাপোর্ট কেমন পেয়েছেন?
পারিবারিকভাবে যথেষ্ট সাপোর্ট পেয়েছি। আমার বাবা-মা আমাকে কখনও বাধা দেননি। বরং যেকোনো বই কেনার জন্য টাকা চাইলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিতেন। তারা কোনোদিন জিজ্ঞেস করেননি, টাকা দিয়ে কী করব? কারণ আমি তাদের কাছে নিজের আস্থা সৃষ্টি করতে পেরেছিলাম। তারা জানতেন, আমি টাকা নিয়ে বিপথে খরচ করব না।
লেখালেখি করতে এসে বাধা-বিপত্তি কিংবা হতাশার গল্প আছে কী?
বাধা-বিপত্তি না থাকলে এতটা পথ হাঁটা হতো না হয়তো। বাধা-বিপত্তি ছিল বলেই আজ এ পর্যন্ত। হতাশার গল্প অনেক। ভাবতাম, কাছের মানুষদের কাছ থেকে বেশ সহযোগিতা পাব; কিন্তু তারাই জীবনে কষ্ট দিয়েছে বেশি। যারা একদম অপরিচিত, চলার পথে তারাই হয়েছেন জীবনের পরম বন্ধু। শুরুতে নিজের টাকা দিয়ে নিজেই বই প্রকাশ করতাম। আমি লেখক, আমিই নিজের বইয়ের প্রকাশক ও প্রচারক। প্রচ্ছদ ছেপে বসে আছি। হাতে টাকা নেই। মাত্র চার হাজার টাকা দরকার। বইটি ছাপতে পারলাম না টাকার অভাবে। এমন বহু গল্প আছে আমার লেখালেখির জীবনে।
আর লেখালেখি করবেন না, কখনও কী এমনটা মনে হয়েছে?
কখনও এমন মনে হয়নি। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল, তিনি আমার দুর্দিনের পর সুদিনের মুখ দেখাবেন। তা-ই হয়েছে। লেখালেখি করে এখন আমি অনেক সচ্ছল, আলহামদুলিল্লাহ।
লেখালেখিকে কী আপনার ইবাদত মনে হয়?
হ্যাঁ, আমি ইবাদত মনে করি। লেখালেখির মাধ্যমে লেখকরা সমাজ বিনির্মাণে বলিষ্ঠ ভূমিকা ও অবদান রাখেন। লেখালেখি ইখলাসের সঙ্গে করলে সে সওয়াব পাবে। কেউ চাকরি বা পেশার নিয়তে করলে ভিন্ন কথা। তবে ‘তাম্বিহুল গাফিলিন’ গ্রন্থে আছে, কেউ টাকা নিয়ে ইবাদতের নিয়ত ছাড়া লিখলেও সওয়াব পাবে। কারণ তার লেখা পড়ে যারা দ্বীন পেয়েছে, সত্যের পথে অবিচল থেকেছে, তার সওয়াব সে পাবে। আমি মনে করি, ইখলাসের সঙ্গে নীরব সাধক হয়ে লেখালেখি করা চাই। কারণ জীবনের আয়ুর চেয়ে লেখার আয়ু অনেক বেশি।
কোন বিষয়ে লিখতে বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
আমি রাসুল (সা.)-এর সিরাত, সাহাবাচরিত ও মনীষীদের জীবনীবিষয়ক লেখা লিখতে বেশ পছন্দ করি। কারণ ‘ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম’-এর ভাষ্য তো এটাই।
লেখা দরকার ছিল; কিন্তু এখনও লেখা হয়নিÑ আপনার লেখকজীবনে এমন অপূর্ণ কোনো ব্যাপার রয়ে গেছে কী?
এমন তো অনেক বাকি রয়েছে এখনও। বিশেষ করে, আমার ‘সহজে ইংরেজি শিখবো’ বইটি। বইটির পুরো কাজ আমি শেষ করতে পারিনি। অসম্পূর্ণ রয়েছে। তা ছাড়া আমার রচিত ও পরিমার্জিত কওমি মাদ্রাসার যেসব পাঠ্যপুস্তক রয়েছে, সেগুলোর কিছু বইয়ের অনুশীলনী লিখছি। আরও কিছুর কাজ করা দরকার। কিন্তু সময় হয়ে উঠছে না। বাংলার আলেম মনীষীদের জীবনী সিরিজ ‘হিরে মোতি পান্না’ দশ খ- শেষ করার ইচ্ছে। এখনও কিছু বাকি।
আপনার লেখা পাঠ করে পাঠকের প্রাপ্তি বা প্রতিক্রিয়া কেমন?
পাঠকরাই আমার লেখার প্রাণ। তারা আমার লেখা পড়ে প্রতিনিয়ত দারুণ দারুণ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকেন। একজন ফোন করলেন। তিনি হাফেজ্জি হুজুরের জীবনীবিষয়ক আমার বইটি পড়েছেন। ভদ্রলোক বললেন, ‘বইটি ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হওয়া দরকার।’ কেউ কেউ পড়ার মাঝেই উচ্ছ্বসিত হয়ে জানান, ‘আপনার অমুক বইটি পড়ছি, খুব ভালো লাগছে।’ ময়মনসিংহের একজন সেদিন জানালেন, তিনি নাকি হাফেজ্জি হুজুরের জীবনীবিষয়ক আমার বইটি পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, আল্লাহ যেন তাকে এমন এক সন্তান দান করেন। রোজ এমন অভিব্যক্তি শুনে আমার মনে হয়, আমি সফল লেখক। আমি সর্বদা পাঠকের দোয়া পেতে থাকি। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও স্বার্থকতা।
লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার মূলমন্ত্র কী?
শিক্ষিত সমাজকে পুস্তিকা লিখে তাদের কাছে দ্বীনের আবেদন পৌঁছানোও দাওয়াতি কাজ। এ ক্ষেত্রে খুব কমসংখ্যক আলেমের পদচারণা রয়েছে। তাই অনুভব করি, আরও লেখক আসা দরকার। প্রচুর পরিমাণে বই ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করা দরকার। কারণ এ সমাজ আলেমশূন্য হয়ে গেলে মানুষ পথহারা হয়ে যাবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, আলেম সমাজের আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখা দরকার। লেখালেখির ক্ষেত্রে নিজেকে একজন যোদ্ধা ভাবা চাই। একজন যোদ্ধা কিন্তু যুদ্ধে চূড়ান্ত জয়ী হওয়ার জন্যই রণাঙ্গনে আসেন। একজন লেখককে সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা চাই। লেখালেখির ক্ষেত্রে তাকে প্রচুর পড়তে হবে। লেখাগুলো তথ্যসমৃদ্ধ ও তত্ত্ববহুল হওয়া চাই। একটি লেখার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিষয় নিয়ে আলোকপাত করতে হবে। একপেশে না লেখা চাই। আমাদের দুর্বলতা হলো, আমাদের লেখাগুলো একপেশে হয়। লেখা হতে হবে জীবন্ত গল্প। তা যেমন চিকিৎসাবিদ্যা, চারিত্রিক বিষয় ও ঐতিহ্য বা বিধানসমৃদ্ধ হতে হবে, তেমনি হতে হবে সাবলীল ও জীবনঘনিষ্ঠ উপস্থাপনার।
সাহিত্য চর্চার জন্য আদর্শবিবর্জিত লেখকের লেখা পড়াকে কীভাবে দেখেন?
সবসবময় একটা কথা বলে থাকি, মুরগি খাঁচা থেকে বেরিয়ে সারাদিন ভালো-মন্দ অনেক কিছুই খায়; কিন্তু সে পরদিন তার মালিককে একটি উপকারী ডিম উপহার দেয়। আপনি শেখার জন্য যা ইচ্ছে পড়তে পারেন; কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে, আপনি একজন ইসলামের প্রচারক। অখাদ্য-কুখাদ্য যা-ই পড়েন, জাতিকে আপনার একটি ফুল উপহার দিতে হবে।
কথিত আছে, লেখকরা না খেয়ে মরেন; এ ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
বিষয়টি একদম ভুল; বরং যারা লিখছেন না, তারা না খেয়ে মারা যাচ্ছেন। আগে ছিল এমন অবস্থা, এখন নেই। এখন একটু ভালো লিখতে পারলেই অনেক মানসম্মত প্রকাশনী ও প্রকাশক ছাপার জন্য প্রস্তুত আছেন। সেজন্য লেখার মান বাড়ানো দরকার।
নতুন যারা লেখালেখিতে আসতে চায়, তাদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ কী?
লেখালেখি একটি সাধনার ব্যাপার। এর জন্য পড়–ন, পড়–ন এবং প্রচুর পড়–ন। বিজ্ঞদের সাহচর্য গ্রহণ করুন। ইসলামকে বুঝুন আগে। তারপর ইখলাসের সঙ্গে এ পথে চলুন। নিজেকে গভীর পড়াশোনায় নিয়োজিত রাখুন। পড়ালেখায় আপনাকে সবসময় ভালো ফলাফল করতে হবে। এ পথে কারও দিকনির্দেশনা মেনে চলুন।
একুশে বইমেলায় তরুণ আলেমদের বই প্রকাশিত হচ্ছে, তারা দিন দিন লেখালেখিতে এগিয়ে আসছেন; তাদের এমন সরব উপস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
একসময় বইমেলায় আলেম লেখকের বই খুঁজে পাওয়া যেত না। এখন অনেক আলেম লিখছেন। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এটা ধরে রাখতে হবে। একুশে বইমেলায় তরুণ আলেমদের বই প্রকাশিত হওয়া খুবই ভালো দিক। একই সঙ্গে এ কথারও প্রমাণ, মাদ্রাসাগুলোতে এখন মাতৃভাষা নিয়ে প্রচুর চর্চা হচ্ছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা লেখালেখিতে আর পিছিয়ে নেই। এটা আমাদের জন্য বেশ আনন্দের ও সুখকর বিষয়। ইনশাআল্লাহ, এভাবে লেখালেখির মাধ্যমে আমরা অদূর ভবিষ্যতে সমাজের দ্বীনি চাহিদার সবটুকু পূরণ করতে সক্ষম হব। আমাদের ইসলামি স্টলগুলোকে বইমেলায় ঢুকতে দিচ্ছে না। তবুও থেমে নেই আমাদের যাত্রা। নামে-বেনামে সেখানে আমাদের বইগুলো যাচ্ছেই। সুতরাং আমরা পিছিয়ে আছি, এটা বলা যায় না। আমি স্বপ্ন দেখি ও আশাবাদী, সামনে এমন সময় আসবে, যখন বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণ মাওলানাদের বইয়ে মুখরিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
শ্রুতলিখন : আবদুল কাদের আফিফ