হজের আহকাম ও তাৎপর্য

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

প্রকাশ : ১০ জুন ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘হজ’ আরবি শব্দ, হজের আভিধানিক অর্থ ‘ইচ্ছা বা সংকল্প’ করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় হজ হলো, হজের নিয়তসহ ইহরামের কাপড় পরিধান করে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ও বাইতুল্লাহ জিয়ারত করা। হজ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। পাঁচ স্তম্ভের এক স্তম্ভ। তাই ইসলামে হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, পাঁচটি বিষয়ের ওপর ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত- আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল- এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা, নামাজ প্রতিষ্ঠা করা, জাকাত দেওয়া, বাইতুল্লাহর হজ করা ও রমজানের রোজা রাখা। (মুসলিম : ২১)।

হজ একটি শারীরিক, আর্থিক ও আত্মিক ইবাদত। হজ পালনে যেমন রয়েছে ফজিলত ও তাৎপর্য, তেমনি রয়েছে দীর্ঘ সফর ও আর্থিক ব্যয়ের সামর্থ্য। তাই হজ অন্যান্য বিধানের মতো প্রত্যেকের ওপর ফরজ নয়। কেবল শারীরিক ও আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন মুসলিম নর-নারীর ওপরই হজ ফরজ। আল্লাহতায়ালা বলেন, মানুষের মধ্যে যারা কাবায় পৌঁছতে সক্ষম, তাদের ওপর আল্লাহর ঘর জিয়ারত করা ফরজ। (আলে ইমরান : ৯৭)। আর্থিক সক্ষমতা দ্বারা উদ্দেশ্য, মক্কায় যাওয়া-আসা, থাকাণ্ডখাওয়া ও কোরবানি ইত্যাদি যাবতীয় খরচ এবং হজ থেকে ফেরা পর্যন্ত পারিবারিক ব্যয়ভার বহন করার সক্ষমতা থাকা। মহিলা হলে তার সঙ্গে মাহরাম পুরুষ আবশ্যক। পাশাপাশি মাহরাম প্রাপ্তবয়স্ক ও বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া জরুরি, অন্যথায় হজ ফরজ নয়। কিন্তু পালন করলে তা আদায় হয়ে যাবে।

হজের প্রকার

হজ তিন প্রকার : ইফরাদ, তামাত্তু ও কিরান। ইফরাদ- শুধু হজের নিয়ত করে ইহরাম বেঁধে ওই ইহরামেই হজকার্য সম্পাদন করা। তামাত্তু- একই সফরে ভিন্ন ভিন্ন ইহরামে হজ ও ওমরাহ উভয়টি পালন করা। প্রথমে ইহরাম পরিধান করে ওমরাহ পালন করবে। অতঃপর ইহরাম থেকে মুক্ত হয়ে পুনরায় ইহরাম পরিধান করে হজকার্য সম্পাদন করবে। কিরান- একই সফরে হজ ও ওমরা পালনের নিয়ত করে ইহরাম বেঁধে ওই একই ইহরামে উভয়টি পালন করা। এই তিন প্রকারের মধ্যে কিরান পালন করা উত্তম। কিন্তু একই সফরে ইহরাম অবস্থায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার দরুন নিষেধাজ্ঞাগুলো সঠিকভাবে পালন না করতে পারার আশঙ্কা থাকায় তামাত্তুই উত্তম। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বিদায় হজের বছর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে রওনা হলাম। আমরা ওমরাহর জন্য ইহরাম বাঁধলাম। অতঃপর রাসুল (সা.) বললেন, যার সঙ্গে হাদি অর্থাৎ কোরবানির পশু আছে সে যেন একত্রে ওমরার সঙ্গে হজের ইহরাম বাঁধে, অতঃপর ওমরা ও হজের অনুষ্ঠান শেষ না করে যেন ইহরামমুক্ত না হয়। (মুসলিম : ২৮০০)।

হজের করণীয়

১. ইহরাম বাঁধা : ইহরামের আভিধানিক অর্থ, হারাম বা নিষিদ্ধ করা। ইহরাম বাঁধার দ্বারা উদ্দেশ্য, পবিত্রতার সঙ্গে সেলাইবিহীন দুই টুকরো সাদা কাপড় ইহরামের নিয়তে পরিধান করা। এই কাজকে ইহরাম বলা হয়, যেহেতু তারপর থেকে হজ শেষ হওয়া পর্যন্ত সাধারণ অনেক বিষয় তার জন্য হারাম বা নিষিদ্ধ। যেমন- পাখি শিকার করা, স্ত্রী সহবাস করা, মাথা ঢেকে রাখা ও সুগন্ধী ব্যবহার করা ইত্যাদি। তবে নারীদের জন্য মাথা ডাকা ও সেলাইযুক্ত কাপড় পরিধানে শিথিলতা রয়েছে। যে স্থান থেকে ইহরাম বাঁধা হয়, তাকে বলা হয় মিকাত। দেশ ও অঞ্চলভেদে মিকাতও ভিন্ন ভিন্ন। মিকাত সর্বমোট পাঁচটি- যুলহুলায়ফা, যাতে ইরাক, যুহফা, কারনুল মানাযেল ও ইয়ালামলাম। বাংলাদেশিদের মিকাত ইয়ালামলাম। যদি মিকাতে অবস্থান করার সুযোগ না হয় তাহলে তার আগেও ইহরাম পরিধান করা জায়েজ; কিন্তু ইহরাম ব্যতীত মিকাত অতিক্রম করার সুযোগ নেই। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) মদিনাবাসীর জন্য যুল হুলায়ফা, সিরিয়ার অধিবাসীদের জন্য জুহফা, নাজদবাসীর জন্য কারনুল মানাযিল, ইয়ামানবাসীদের জন্য ইয়ালামলামকে মিকাত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। (মুসলিম : ২৬৯৩)।

২. তাওয়াফ করা

তাওয়াফ কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে শুরু করে সাতবার চতুর্দিক প্রদক্ষিণ করা এবং প্রথম তিনবার দ্রুত চলা। যাকে হজের পরিভাষায় ‘রমল’ বলা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি চক্কর শেষে হাজরে আসওয়াদ তথা কালো পাথরটিকে চুম্বন করা। যদি ভিড়ের কারণে সম্ভব না হয়, তাহলে দূর থেকে হাতের ইশারায় চুম্বন করা। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) প্রথমে মক্কায় পৌঁছে হজ ও ওমরার জন্য বায়তুল্লাহর যে তাওয়াফ করতেন, তাতে তিন চক্কর দ্রুত পদক্ষেপে এবং চার চক্কর স্বাভাবিক পদক্ষেপে সম্পন্ন করতেন। (মুসলিম : ২৯১৫)।

৩. সাফা-মারওয়া সায়ি করা

সাফা-মারওয়া মক্কার অদূরে অবস্থিত দুটি টিলার নাম। সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে যথাক্রমে সাতবার হেঁটে দ্রুত গতিতে যাতায়াত করা। সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় শেষ হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিঃসন্দেহে সাফা-মারওয়া আল্লাহতায়ালার নিদর্শনগুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কাবা ঘরের হজ বা ওমরা পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করায় কোনো দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকির কাজ করে, তবে আল্লাহতায়ালা অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মূল্য দেবেন। (সুরা বাকারা : ১৫৮)।

৪. উকুফ

উকুফ অর্থ অবস্থান করা। পরিভাষায় উকুফ বলা হয় হজ চলাকালীন মক্কার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করা। হজের দিনগুলোতে যথাক্রমে তিন জায়গায় অবস্থান করতে হয়। আরাফা, মিনা ও মুজদালিফা। আরাফাতের ময়দানে উকুফ ফরজ আর বাকি দুই জায়গায় ওয়াজিব। আবদুর রহমান ইবনে ইয়া’মুর (রা.) থেকে বর্ণিত, নজদবাসী কতিপয় লোক রাসুল (সা.)-এর কাছে এলো, তখন তিনি আরাফায় ছিলিন। তারা হজ সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করে। তিনি তখন এক ঘোষণাকারীকে এই মর্মে ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিলেন যে, হজ হলো আরাফাতে অবস্থানের নাম। কেউ যদি মুজদালিফার রাতে ফজর উদয়ের আগেই এখানে আসে, তবে সে হজ পেল। মিনায় অবস্থানের দিন হলো তিন দিন। কেউ দুই দিন অবস্থান করে শিগগির ফিরে যেতে চাইলে তাতে কোনো দোষ নেই। আর তিন দিন অবস্থান বিলম্বিত করতে চাইলেও তাতেও কোন দোষ নেই। (তিরমিজি : ৮৯০)।

৫. কংকর নিক্ষেপ করা

মিনায় অবস্থিত জামারাগুলোতে কংকর নিক্ষেপ করাও হজের আবশ্যকীয় বিষয়। কংকর নিক্ষেপ করার পেছনে রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক ঘটনা। তিনি যখন প্রভুর নির্দেশ পালন করার জন্য বের হলেন, তখন শয়তান তাকে একে একে তিনবার ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে আর তিনি প্রত্যেকবার কংকর নিক্ষেপের মাধ্যমে শয়তানকে বিতাড়িত করেন। অতঃপর প্রভু পরবর্তী লোকদের জন্য সে তিন স্থানে কংকর নিক্ষেপ করা আবশ্যক করে দেন। প্রতি জামারায় সাতটি করে নিক্ষেপ করবে এবং প্রত্যেকবার তাকবির বলা সুন্নাত। আবদুর রহমান ইবনু ইয়াযিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) যখন জামারায় আকাবায় এলেন তখন উপত্যকার মাঝে এসে দাঁড়ালেন, কিবলা মুখ হলেন এবং ডান ভ্রƒ বরাবর উঁচু করে রমি জামারা শুরু করলেন। সাতটি কংকর মারলেন এবং প্রতি কংকর মারার সময় আল্লাহু আকবার বললেন। (তিরমিজি : ৯০১)।

৬. পশু কোরবানি করা

কংকর মারা শেষে পরবর্তী কাজ পশু কোরবানি করা। ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ পর্যন্ত যেকোনো সময় পশু কোরবানি করা যায়। আলী (রা.) রাসুল (সা.)-এর হজের বর্ণনা প্রদানের এক পর্যায়ে বলেন, রাসুল (সা.) কংকর নিক্ষেপ শেষে সেখান থেকে কোরবানির স্থানে এলেন এবং নিজ হাতে তেষট্টিটি পশু জবেহ করলেন। তিনি কোরবানির পশুতে আলী (রা.)-কেও শরিক করলেন। অতঃপর তিনি প্রতিটি পশুর গোশতের কিছু অংশ নিয়ে একত্রে রান্না করার নির্দেশ দিলেন। অতএব তাই করা হলো। তাঁরা উভয়ে এ গোশত থেকে খেলেন এবং ঝোল পান করলেন। (মুসলিম : ২৮১৭)।

৭. মাথা মুণ্ডানো

হজের নির্ধারিত আনুষ্ঠানিকতা শেষে পুরুষের মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছাঁটা সুন্নত। আর নারীদের চুলের অগ্রভাগের কিছু অংশ কাটার নির্দেশ রয়েছে। যারা মাথা মুণ্ডাবে তাদের জন্য রাসুল (সা.) রহমতের দোয়া করেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, হে আল্লাহ! মাথা মু-নকারীদের প্রতি দয়া করুন। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! চুল খাটোকারীদের প্রতিও? তিনি বললেন, হে আল্লাহ! মাথা মু-নকারীদের প্রতি দয়া করুন। তারা বললেন, চুল খাটোকারীদের জন্যও (দোয়া করুন) হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন এবং চুল খাটোকারীদের প্রতিও। (মুসলিম : ৩০৩০)।

হজের তাৎপর্য

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হজ করল এবং অশালীন কথাবার্তা ও গোনাহ থেকে বিরত থাকল, তাহলে সে হজ থেকে নিষ্পাপ নবজাতকের মতো ফিরে এলো। (বোখারি : ১৫২১)। এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, একটি কবুল হজের প্রতিদান হলো সুনিশ্চিত জান্নাত। আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা ধারাবাহিক হজ ও ওমরাহ আদায় করতে থাক। এ দুটো আমল দারিদ্র্য ও গোনাহ বিদূরিত করে দেয়। যেমন ভাটার আগুনে লোহা ও সোনা-রুপার ময়লা-জং দূরীভূত হয়ে থাকে। একটি কবুল হজের প্রতিদান তো সুনিশ্চিত জান্নাত। (তিরমিজি : ৮০৮)। এছাড়া বিভিন্ন হাদিসে হজের অসংখ্য ফজিলত ও তাৎপর্য বর্ণিত হয়েছে।

হজ না করার পরিণতি

হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি হজ করল না, তার ব্যাপারে হাদিসে কঠিন সতর্কবাণী বর্ণিত হয়েছে। আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেন, কেউ যদি এতটুকু পাথেয় ও সফর সংক্রান্তের অধিকারী হয়, যা তাকে বায়তুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে, এরপরও যদি সে হজ পালন না করে তবে সে ইহুদি হয়ে মরল বা নাসারা হয়ে মরল এ বিষয়ে (আল্লাহর) কোনো পরোয়া নেই। কারণ আল্লাহতায়ালা তাঁর পবিত্র কিতাবে বলেন, ‘মানুষের মাঝে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশে ওই গৃহের হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য। (তিরমিজি : ৮১০)।

এছাড়া হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহতায়ালা হজ না করার পরিণতি সম্পর্কে বলেন, ‘যে বান্দাকে আমি শারীরিক সুস্থতা দিয়েছি এবং আর্থিক সক্ষমতা দান করেছি, অতঃপর (গড়িমসি করে) তার পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়ে যায় অথচ আমার দিকে (হজব্রত পালন করতে) আগমন করে না, সে অবশ্যই বঞ্চিত।’ (ইবনে হিব্বান : ৩৭০৩)।