প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৫ জুলাই, ২০২২
ইমামতি একটি মহান দায়িত্ব। এটি সুন্দর ও সম্মানজনক পেশা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও ইমামতি করেছেন। তারপর তার সাহাবিরা ও খোলাফায়ে রাশেদিন ওই একই মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। ইমামতির রয়েছে অনেক ফজিলত। হজরত ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ৩ ধরনের লোক কেয়ামতের দিন মেশক আম্বরের টিলার ওপর অবস্থান করবে। প্রথম এবং শেষ যুগের মানুষ তাদের অবস্থা দেখে হিংষা পোষণ করবে। তারা হলো- ক. যে ব্যক্তি প্রতিটি রাত-দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আহ্বান (মুয়াজ্জিন) করবে। খ. যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের (নামাজের) ইমামতি করে এবং তারা তার (ওই ইমামের) ওপর সন্তুষ্ট থাকে। গ. যে গোলাম আল্লাহর হক আদায় করে এবং মালিকের হকও (কর্মস্থলের দায়িত্ব যথাযথ) আদায় করে।’ (তিরমিজি)।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ানোর পর ইমামদের হাতে অফুরন্ত সময় থাকে। শহরের অধিকাংশ ইমাম এ সময় ভিন্ন পেশায় কর্মরত থাকলেও গ্রামের অধিকাংশ ইমাম এই মূল্যবান সময়গুলো চিরায়ত আলস্যের মধ্যে কাটান। অথচ তারা ইচ্ছা করলে এই সময়ে অনেক কিছু করতে পারেন। তাদের জন্য এমন অনেক কাজ করা সহজ, যা অন্যদের জন্য খুব কঠিন। ইমামরা সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। তাদের কথার প্রতি সাধারণ মানুষ খুব শ্রদ্ধাশীল। তাই তাদের যে কোনো সংস্কারমূলক কাজ করা যতটা সহজ, অন্যদের জন্য ততটা সহজ নয়। তারা সাধারণ মানুষের মনমেজাজে প্রবেশ করতে পারেন। তাদের মনের কথাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছাতে পারেন। ইমামদের জন্য প্রতি জুমাবার জনগণের একেবারেই কাছে চলে যাওয়ার, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ।
ইসলামের কথা, সমাজের অসঙ্গতির কথা জনগণের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে জুমাবার একটি মিডিয়ার ভূমিকা পালন করে। ইমামরা এসব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সমাজ সংস্কারমূলক বিভিন্ন কাজ করতে পারেন। সমাজের অসঙ্গতির কথা, বৈধ-অবৈধের কথা কোরআন-হাদিসের আলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। আমাদের দেশের ইমামরা নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ পরকালীন মুক্তির ওয়াজ-নসিহতের মাঝে সীমাবব্ধ থাকতে চান। পার্থিব কর্মকাণ্ডের বিধি-বিধান সম্পর্কে সাধারণত তারা মুখ খুলতে চান না। অথচ ইসলামের বিধান শুধু নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।
ইসলাম মানুষের সর্বক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত, ব্যক্তিজীবন থেকে নিয়ে পারিবারিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন- সর্বক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে। একজন ইমামকে যেমনিভাবে নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে, তেমনিভাবে সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ইত্যাদি সামাজিক অপরাধ সম্পর্কেও জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। তবে এ দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে গিয়ে ইমামরা বাধাগ্রস্ত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে সব বাধা উপেক্ষা করে সৎসাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে। বাধা আসার ভয়ে শরিয়তের কিছু অংশ প্রকাশ করা, কিছু অংশ গোপন করার অবকাশ নেই। মনে রাখতে হবে, নবীরাও দ্বীনের বাণী প্রচার করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই বলে তারা রিসালাতের কাজ ছেড়ে দেননি। নবীদের সেই দায়িত্ব এখন ওলামায়ে কেরামের ওপর ন্যস্ত। তাই বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে এ দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে হবে।
ইমামতির পাশাপাশি ইমামরা সমাজিক উন্নয়ন ও নিরক্ষরতা দূরীকরণেও ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারেন। ইসলামের সোনালি যুগে মসজিদভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল। সাহাবায়ে কেরাম শিক্ষা অর্জনের জন্য মসজিদে নববিতে জড়ো হতেন। সেখানকার শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং রাসুলে করিম (সা.) এবং শিক্ষা সিলেবাস ছিল আল্লাহ প্রদত্ত ওহি। ওহির জ্ঞান অর্জন করে তারা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।
ইসলামের সোনালি যুগে সমাজ পরিচালিত হতো মসজিদকে কেন্দ্র করে। বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো মসজিদে। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞান বিতরণ করা হতো মসজিদ থেকে। সেই ইতিহাস আমরা ভুলে গেছি। মসজিদকে আমরা ধর্মীয় তীর্থ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারি না। ইসলামকে আমরা শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। এর জন্য মসজিদের ইমামরাই বেশি দায়ী। ইমামরা শুধু ইবাতদের ওয়াজ-নসিহত করেন। মসজিদ থেকে এখন আর লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, সুদণ্ডঘুষের আলোচনা খুব একটা শোনা যায় না।
সাধারণ মানুষ এসব বিষয়ের আলোচনা না শুনতে না শুনতে এসব বিষয়কে ইসলামবহির্ভূত বিষয় মনে করতে শুরু করেছে। তারা নামাজ-রোজা সঠিকভাবে আদায় করলেও লেনদেন, বিয়েশাদি ইত্যাদি বিষয়ে শরয়ি বিধি-বিধান জানারও প্রয়োজন বোধ করে না। বাংলাদেশের প্রায় সব গ্রামে একাধিক মসজিদ আছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে একটি বিদ্যালয় নেই সেখানেও একাধিক মসজিদ আছে। মসজিদের ইমামরা যদি এসব বিষয় মানুষকে জানান, তাহলে জনগণের অনেক ভুল ভেঙে যাবে। ইমামরা সাহস ও প্রত্যয় নিয়ে একটু অগ্রসর হলেই কেল্লাফতে। আল্লাহতায়ালা আমাদের আমল করার তৌফিক দান করুন।