মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

সুখে থাকবেন যেভাবে

শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল জুহানি

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মনে সুখ না থাকলে জীবনযাপনে কোনো স্বাদ পাওয়া যায় না। সুখী মানুষের হৃদয়-মন প্রশস্ত থাকে, উন্মোচিত থাকে, ঈমানের আলোয় আলোকিত থাকে, বিশ্বাসের দীপ্তিতে সদা দীপ্তিমান হয়। পার্থিব জগতে মানবজীবনের এটাই মূল লক্ষ্য। এটাই সৌভাগ্যের প্রতীক। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে সুপথে পরিচালিত করতে চাইলে ইসলামের জন্য তার হৃদয় উন্মোচিত করে দেন। আর কাউকে বিপথগামী করতে চাইলে তার হৃদয় সংকীর্ণ করে দেন। ইসলামের ওপর চলা তার জন্য আকাশে আরোহণের মতো দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। অবিশ্বাসীদের আল্লাহ এভাবেই লাঞ্ছিত করেন।’ (সুরা আনআম : ১২৫)।

রাসুল (সা.) এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন। এর ব্যাখ্যাস্বরূপ বললেন, ‘হৃদয়ে যখন আলো প্রবেশ করে, তখন তা প্রশস্ত হয়ে যায়।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এটা বোঝার কোনো উপায় আছে?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রবঞ্চনাময় পার্থিব জগৎ থেকে বিমুখ হওয়া, চিরস্থায়ী পরজগতের দিকে অগ্রসর হওয়া আর মৃত্যু আসার আগেই তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।’ (মুসতাদরাকে হাকেম)।

সঠিক পথের দিশা পাওয়া ও আল্লাহর একত্ববাদ হৃদয়ে লালন করা মনে প্রফুল্লতা লাভের অন্যতম উপায়। এ ছাড়া মানুষ হয়তো জীবনের বিশেষ কোনো ক্ষেত্রে সুখণ্ডশান্তি লাভ করতে পারে; কিন্তু তা হয়ে থাকে নিতান্তই সাময়িক। সে সুখ ধোঁকা বৈ কিছু নয়। অচিরেই তা সংকট ও পরিতাপে পর্যবসিত হবে। আর শিরক ও গোমরাহি তো হৃদয়ের সংকীর্ণতার সবচেয়ে বড় কারণ। সুখণ্ডশান্তি লাভের আরও কিছু বিশেষ কারণ হলো-

অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করা

অধিক পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াতে অন্যরকম প্রশান্তি লাভ হয়। কোরআনের হরফগুলো সুন্দরভাবে উচ্চারণ, ওয়াকফ সম্পর্কে অবগতি, মর্ম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা- এর সবই হৃদয়কে প্রশান্ত করে, মনে শান্তি আনে। তদ্রুপ রাসুল (সা.)-এর হাদিস সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করলেও হৃদয়ে আনন্দ লাভ হয়। হাদিসের শাস্ত্রীয় জ্ঞান, কোনটি মুতাওয়াতের, কোনটি খবরে ওয়াহেদ, কোনটি রাসুল (সা.) মুখনিঃসৃত বাণী, কোন হাদিসটি কর্মগত, কোন হাদিসটি সমর্থনসূচক; এ সবকিছুর জ্ঞানলাভ একজন মোমিনের হৃদয়কে প্রফুল্ল করে, আনন্দিত করে, প্রশস্ত করে। এমনকি সে হৃদয় পুরো দুনিয়ার চেয়েও অধিক প্রশস্ত হয়ে যায়।

তাকদিরে বিশ্বাস স্থাপন

মনের সুখের অন্যতম একটি কারণ, তাকদিরে বিশ্বাস স্থাপন। ভালো-মন্দ, মিষ্ট-তিক্ত যা কিছু হয়, সব আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকাই বান্দার কর্তব্য। একজন মানুষ যখন বিশ্বাস করবে, তার যা পাওয়ার ছিল, তা হারাবার ছিল না; আর যা হারাবার ছিল, তা পাওয়ার ছিল না; তাহলে সে যা পেয়েছে, তা নিয়ে খুশির উন্মাদনায় ভেসে যাবে না, তদ্রুপ যা হারিয়েছে, সে কারণে খুব একটা দুঃখী হবে না। বরং সে হৃষ্টচিত্তে অদৃষ্টকে বরণ করে নেবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মোমিনের বিষয়টি বড়ই আশ্চর্যজনক! সর্বাবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে শোকর করে, তাতেও তার লাভ। কষ্টে পতিত হলে ধৈর্য ধরে, তাতেও তার লাভ।’ (মুসলিম)।

আমরা অদৃশ্য সম্পর্কে অজ্ঞ। অজ্ঞ অদৃশ্যের কল্যাণ-অকল্যাণ সম্পর্কেও। আমরা শুধু তাকদিরের ওপর ভরসা করি। প্রকাশ্য ও গোপন সব বিষয়ের জ্ঞাতা আল্লাহর ওপর সব বিষয় ন্যস্ত করি। আমাদের কোনো বিষয়ের লাভ-লোকসান বুঝে আসুক বা না আসুক, আমরা এ কথায় দৃঢ় বিশ্বাস রাখি যে, আল্লাহ যেটা আমাদের জন্য পছন্দ করে রেখেছেন, তাতেই আমাদের প্রকৃত কল্যাণ। বান্দা নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, তার চেয়ে তার ব্যাপারে আল্লাহর পছন্দ অধিকতর কল্যাণকর হবে। প্রবাদ আছে, ‘অদৃশ্যে জ্ঞান রাখলে তোমরা নির্ধারিত বাস্তবতাকেই গ্রহণ করে নিতে।’

সৃষ্টির প্রতি দয়া করা

হৃদয়ে সুখ লাভের আরেকটি উপায় হলো, সৃষ্টির প্রতি দয়া করা, সম্পদ বা ক্ষমতার মাধ্যমে হোক যথাসাধ্য তাদের উপকার করা। দয়ালু ও মহানুভব ব্যক্তিরা অধিক প্রফুল্ল ও সুখী থাকতে সক্ষম হন। যে কৃপণ, মানুষের প্রতি যার কোনো দয়া নেই, তার হৃদয় হয় সংকীর্ণ; জীবনযাপনে সে হয়ে থাকে সবচেয়ে অসুখী।

মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া

মুসলমানদের জামাত বা দলকে আঁকড়ে ধরা এবং দলছুট না হওয়াও সুখে থাকার বড় একটি উপায়। এতে হৃদয়-মন হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পবিত্র থাকে। যে মুসলমানদের দলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তাদের জন্যও তাণ্ডই পছন্দ করে। নিজের জন্য কিছু অপছন্দ করলে, তাদের জন্যও তা অপছন্দ করে। কিন্তু যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, দলছুট হয়, সে মুসলমানদের তিরস্কার ও নিন্দায় লিপ্ত হয়।

দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী

পার্থিব সুখণ্ডসমৃদ্ধি আল্লাহ মোমিনকেও দান করেন, কাফেরকেও। কিন্তু দ্বীনের ওপর চলার তৌফিক যাকে পছন্দ করেন, তাকেই দান করেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) তার বাড়ির একটি দেয়াল ঠিকঠাক করছিলেন। মাটির প্রলেপ দিয়ে আরও সুন্দর করে তুলছিলেন। রাসুল (সা.) তার হৃদয়কে পার্থিব জীবনের মোহ থেকে মুক্ত করতে চাইলেন। তাকে বললেন, ‘মৃত্যুর সময় তো এর চেয়েও অধিক সন্নিকটে।’ (সুনানে আবি দাউদ)। রাসুল (সা.) চাচ্ছিলেন, তিনি যেন পরকাল নিয়ে চিন্তা করেন। পরকালের জন্যই প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। যে পার্থিব জীবনে অধিক মগ্ন হয়ে পড়েছে, ইহকাল বিনির্মাণের চেষ্টা-প্রচেষ্টায় দৌড়-ঝাঁপ করছে, তার এ আয়াতের নির্দেশনার প্রতি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ আখেরাতে তোমার জন্য যা রেখেছেন, তা অন্বেষণ করো। তবে দুনিয়া থেকেও তোমার অংশকে ভুলে যেও না। আল্লাহ যেমন তোমার ওপর দয়া করেছেন, তুমিও তেমনি দয়া করো। পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি কোরো না।’ (সুরা কাসাস : ৭৭)।

দুনিয়া কী তাহলে ছেড়ে দেব!

পরকালের প্রতি ধাবিত হওয়ার উদ্দেশ্য ইহকাল একেবারে ত্যাগ করা নয়। জান্নাতে সুখ লাভের আশায় দুনিয়াকে সুন্দর না করা, কাফের, মুশরিক ও অবাধ্যদের জন্য এটা একেবারে ছেড়ে দেওয়া অসমীচীন। ইহকাল পরকালের জন্য ক্ষেতস্বরূপ। দুনিয়ার জীবন সুন্দর করার চেষ্টা করা, অনিষ্ট ও বিশৃঙ্খলা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া, দুনিয়াবাসীর ওপর জুলুম হলে তা প্রতিরোধ করা, ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা; এ সবই পরকালের পাথেয়। ইহকাল-পরকালের এরূপ সমন্বয়ই মূলত ভারসাম্যপূর্ণ কর্মপন্থা।

১৩ মহররম ১৪৪৪ (১২ আগস্ট ২০২২) তারিখে মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন মুইনুল ইসলাম