প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৩ অক্টোবর, ২০২০
মানবপ্রজাতির সূচনাযুগ থেকেই মানুষের মধ্যে অভিবাদন চলে আসছে। সাক্ষাতে, চিঠিপত্রে, মোবাইল ফোনে মানুষ পারস্পরিক অভিবাদন আদান-প্রদান করে। একে অপরকে উইশ করে। জাতি-গোত্র, দেশ ও ভাষার ভিন্নতায় অভিবাদনও হয় ভিন্নরকম। কিন্তু ইসলাম বিশ্বাসীদের দিয়েছে এমন এক অভিবাদন, যা অর্থ ও মর্মে সব অভিবাদনের ঊর্ধ্বে। অন্যান্য অভিবাদন শুধু সামাজিকতা হিসেবে এবং তা পরিবর্তনযোগ্য। কিন্তু ইসলামি সম্ভাষণ শুধু সামাজিকতা নয়, বরং এটি ইবাদতও বটে। এর সম্পর্ক ইহকাল-পরকাল উভয় ক্ষেত্রে এবং তা অপরিবর্তনীয়। ইসলাম যদি শুধু এ সম্ভাষণের মাধ্যমেও বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, তাহলেও বিশ্ববাসী তার শ্রেষ্ঠত্বের সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হবে।
সালাম শব্দের অর্থ
ক. সালামের একটি অর্থ হলো বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকা। খ. সালাম আল্লাহ তায়ালার একটি নাম। গ. সালাম একটি জান্নাতের নাম। পূর্ণ সালামের অর্থ হবে, রবের পক্ষ থেকে তোমার ওপর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
সালাম আদিতম সম্ভাষণ
কেয়ামতের দিন জান্নাতিদের বলা হবে, ‘রবের পক্ষ থেকে সালাম।’ (সুরা ইয়াসিন : ৫৮)। আদম (আ.) এবং ফেরেশতাদের মধ্যে প্রথম শব্দ সালাম। আল্লাহ তায়ালা আদম (আ.) কে সৃষ্টি করার পর বলেন, তুমি ফেরেশতাদের কাছে যাও। তাদের সালাম দাও। তারপর ভালো করে খেয়াল করো জবাবে তারা কী বলে। এটাই হবে তোমার এবং তোমার সন্তানদের সম্ভাষণ। (বোখারি, মুসলিম)।
সালাম জান্নাতিদের সম্ভাষণ
চিরশান্তির আলয় জান্নাতের সম্ভাষণ হবে এ সালাম। আল্লাহ বলেন, ‘জান্নাতে তাদের সম্ভাষণ হবে সালাম।’ (সুরা আহযাব : ২৪)।
ফেরেশতাদের সম্ভাষণ
আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, ‘ইনি জিবরাইল তোমাকে সালাম দিয়েছেন।’ আয়েশা (রা.) বলেন, আমি বললাম, ‘ওয়া আলাইহিস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।’ (বোখারি, মুসলিম)।
সালাম শ্রেষ্ঠ গুণ
এক সাহাবি এসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, ইসলামে শ্রেষ্ঠ গুণ কী? তিনি (সা.) বলেন, শ্রেষ্ঠ গুণ হলো যে, তুমি খাবার খাওয়াও এবং পরিচিত-অপরিচিতকে সালাম প্রদান কর।
সালাম জান্নাতে যাওয়ার মাধ্যম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা জান্নাতে যেতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা মোমিন না হও, আর তোমরা মোমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসো। আমি কী তোমাদের এমন জিনিসের কথা বলে দেব না, যা করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হবে; তোমরা পরস্পরকে সালাম প্রদান কর।’ (মুসনাদে আহমদ)।
সালাম ঐক্যের মাধ্যম
উপরিউক্ত হাদিসে সালামের মাধ্যমে ভালোবাসা তৈরি হয় বলা হয়েছে। আর ভালোবাসা তৈরি হলে, তৈরি হবে ঐক্য। এতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। ব্যাপক হারে কল্যাণমূলক কাজ করা যাবে।
সালাম বিজাতির হিংসার কারণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের সালাম এবং আমিন বলার ক্ষেত্রে ইহুদিরা যত হিংসা করে অন্য কোনো ক্ষেত্রে ততটা হিংসা করে না। (ইবনে মাজাহ)। অর্থাৎ মুসলিমদের পারস্পরিক ভালোবাসা এবং ঐক্য, ভ্রাতৃত্ববোধ তারা একদমই সহ্য করতে পারে না। ইদানীং আমরা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখছি, জ্ঞানপাপী নাস্তিকরা কীভাবে ‘বিশুদ্ধ সালাম’ এবং ‘আল্লাহ হাফেজ’ এর মতো এত সুন্দর শব্দগুলোকে জঙ্গিবাদ বলে ইসলামবিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।
সালামে গোনাহ মাফ হয়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মোমিন যখন মোমিনের সাক্ষাৎ করে অতঃপর সালাম দেয় এবং হাত ধরে মুসাফাহা করে, তখন তার গোনাহগুলো গাছের পাতা ঝরার মতো ঝরে পড়ে যায়।’ (তাবারানি)। একই গ্রন্থের আরেক বর্ণনায় আছে, প্রচ- ঝড়ো বাতাসের সময় যেমন পাতা ঝড়ে পড়ে যায়, ঠিক তদ্রƒপ গোনাহগুলো ঝড়ে পড়ে যায়। যদিও তার গোনাহ সাগরের ফেনা পরিমাণ হোক।
সালামের সওয়াব
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) কাছে এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম। তিনি সালামের জবাব দিলেন। লোকটি বসে গেল। অতঃপর তিনি বললেন, ১০। আরেক ব্যক্তি এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) জবাব দিলেন। লোকটি বসে গেল। তিনি বললেন, ২০। আরেক ব্যক্তি এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সালামের জবাব দিলেন। লোকটি বসে গেল। তিনি বললেন, ৩০।
সালাম পাওয়া মুসলমানের হক
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এক মুসলমানের ওপর আরেক মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। জিজ্ঞাসা করা হলো, সেগুলো কী? তিনি বলেন, যখন কোনো মুসলমানের সাক্ষাৎ করবে, তখন তাকে সালাম করো।’ (মুসলিম)।
সালামদাতা সর্বোত্তম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো, যে আগে সালাম দেয়।’ (আবু দাউদ)। রাসুলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, দু’জন ব্যক্তির সাক্ষাৎ করার সময় কে আগে সালাম দেবে? তিনি বলেন, ‘যে আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সে আগে সালাম দেবে।’ (তিরমিজি)।
অথচ এখন সালাম দেওয়াকে নীচুতা আর সালাম পাওয়াকে সম্মানের মনে করা হয়। সে জন্যই ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, অফিসের বস, নেতা, মুরব্বি মানুষ সালাম পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ঘোষিত-অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে বসকে সালাম না দিলে চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
সালামে বরকত
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন তোমরা ঘরে প্রবেশ কর তখন নিজদের সালাম করবে। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণময় ও পবিত্র দোয়া।’ (সুরা নুর : ৬১)।
আনাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন, হে আমার সন্তান, তুমি যখন পরিবারের কাছে যাবে, তখন সালাম প্রদান করবেÑ এটা তোমার এবং তোমার পরিবারে বরকতের কারণ। (তিরমিজি)।
ইবনে আব্বাস (রা.), আতা (রহ.) এবং কাতাদা (রহ.)সহ আরও অনেকে বলেন, ঘরে কেউ না থাকলেও সালাম করবে। তখন এভাবে বলবে, ‘আসসালামু আলা ইবাদিল্লাহিস সালেহিন।’ কেননা ঘরে ফেরেশতারা থাকেন। তারা তখন সালামের জবাব দেবেন। (কুরতুবি)।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই বাস্তব, আমরা যারা সালামের গুরুত্ব দিই, তারাও নিজের পরিবারকে সালাম দিই না। দিতে পারি না। এখানে এসেই যেন আষ্টেপৃষ্ঠে সব লজ্জা জড়িয়ে ধরে। আবার ভুলেও যাই। আমার কথাই বলি, আমি ফোনে আমার মা-বাবা, বোন সবাইকে সালাম দিই। কিন্তু সম্মুখে সালাম দিতে পারি না। কেমন ইতঃস্তত বোধ কাজ করে। আমি আমার প্রিয় মানুষদের জন্য শান্তি কামনা করতে পারি না; এটা খুব লজ্জাজনক। তাদের সঙ্গে মুসাফাহা, মুয়ানাকা করতে পারি না। তবে কি সালামকে ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করতে পারিনি? তারপর খালি ঘরে সালাম তো কল্পনাই করা যায় না। অথচ এক্ষেত্রেও তাগিদ এসেছে।
সালামের মাধ্যমে বিবাদ দূর হয়ে যায়
ইসলামে পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারিও এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এক মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানকে তিন দিনের বেশি পরিত্যাগ করা জায়েজ নেই। যে তিন দিনের বেশি পরিত্যাগ করল। অতঃপর মারা গেল। সে জাহান্নামে যাবে। (আবু দাউদ, নাসায়ি)।
এক ব্যক্তি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এর কাছে এসে বলল, তার চাচাতো বোন তাকে গালি দেয়, সে কি তাকে সালাম দেবে? আহমদ (রহ.) উত্তরে বলেন, যখনই সাক্ষাৎ করবে সালাম দেবে। সালাম ঝগড়া মিটিয়ে দেয়।
সালামের কিছু আদব
* কথা বলার আগে সালাম দেওয়া।
* ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া। (সুরা নুর : ৭১)।
* আরোহী ব্যক্তি হেঁটে চলা ব্যক্তিকে, হেঁটে চলা ব্যক্তি দাঁড়ানো ব্যক্তিকে, দাঁড়ানো ব্যক্তি উপবিষ্ট ব্যক্তিকে এবং বেশি মানুষ কম মানুষকে সালাম করবে। (বোখারি ও মুসলিম)।
* মজলিসে পৌঁছে এবং সেখান থেকে চলে আসার সময় সালাম দেওয়া। (তিরমিজি)।
* সালামের জবাব সালামদাতার চেয়ে উত্তম হওয়া। যেমন সালামদাতা ‘আসসালামু আলাইকুম’ বললে, জবাবে ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ’ পারলে ‘ওয়া বারাকাতুহ’সহ বলা। (মাজালিসুল হুকামা)।
শুদ্ধভাবে সালাম দেওয়া
ওপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হয়েছে, সালামের পূর্ণ রূপ হলো ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ’ এবং ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। তবে ‘আসসালামু আলাইকুম’ এবং ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম’ এতটুকু বললেও আদায় হয়ে যায়।
সালাম যেহেতু একটি ইবাদত এবং রবের পক্ষ থেকে নির্বাচিত শব্দ। তাই সালাম আদায় হওয়ার জন্য এবং ফজিলত অর্জনের জন্য সালাম যেভাবে যে ভাষায় প্রবর্তিত হয়েছে, সেভাবেই বলা জরুরি। সালামকে আধুনিক বানানোর চেষ্টা করা, নিজের মতো করে ব্যক্ত করা বা অন্য ভাষায় সালাম দেওয়া অন্যায়। এটা সালামের বিকৃতি এবং স্পষ্ট জুলুম। রবের নির্বাচিত সালাম যদি কারও কাছে আনস্মার্ট লাগে, ফলে কেউ ‘সøামালাইকুম’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন, তাহলে এটা তার ঈমানের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
হাদিস থেকে জানা যায়, সালাম বিকৃতি করা ইহুদিদের কাজ ছিল। তারা রাসুলুল্লাহ (সা.) কে ‘আসসামু (বিষ) আলাইকুম’ বলেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, বদদোয়া করা।
সালামের হুকুম
সালাম দেওয়া সুন্নত। আর সালামের জবাব শুনিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। হাত বা মুখের ইশারায় জবাব দিলে হবে না। হ্যাঁ, যদি দূরে হয় বা আরোহণ অবস্থায় হয়, তাহলে ইশারা করেও দিতে পারবে। লিখিতভাবে বা অন্যের মাধ্যমে সালাম প্রেরণ করলেও উত্তর দেওয়া জরুরি।