মক্কা শরিফের জুমার খুতবা

সৎকাজে প্রেরণা ও গোনাহে সতর্কতা

শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল জুহানি

প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাসুল (সা.)-এর প্রধানতম দুটি কাজ ছিল- সুসংবাদ দেওয়া ও ঘৃণা না ছড়ানো। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি রাসুলদের শুধু সুসংবাদ দান ও সতর্কীকরণের জন্যই প্রেরণ করি। যে ঈমান আনে, শুধরে যায়; তার কোনো ভয় নেই, সে চিন্তিত হবে না।’ (সুরা আনআম : ৪৭)। আল্লাহতায়ালা কোরআনুল কারিমের অসংখ্য আয়াতে বিশ্বাসী, অনুগত, সৎকর্মপরায়ণ ও ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দানের আদেশ করেছেন। রাসুল (সা.)-এর সুসংবাদ দানের কিছু বিশেষ রীতি ছিল- তিনি এর জন্য উপযুক্ত সময় নির্বাচন করতেন। শিক্ষাদান ও উপদেশ দানের ক্ষেত্রে উপযুক্ত মাত্রা বিবেচনা করতেন; যাতে সাহাবিরা বিরক্ত না হয়ে যান। মুয়াজ ইবনে জাবাল ও আবু মুসা আশআরি (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় রাসুল (সা.) তাদের বললেন, ‘সহজ কোরো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দিও, ঘৃণা সৃষ্টি করো না। একে অপরকে মেনে চলো, মতভেদ করো না।’ (বোখারি)। ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নও মুসলিমদের ভালোবাসা দেখাতে হবে। শুরুতে তাদের ওপর কঠোরতা করা যাবে না। গোনাহ থেকে নিষেধ করতে হবে দরদ ও মহব্বতের সঙ্গে; যাতে তারা নিষেধকে গ্রহণ করে নেয়। দ্বীনি ইলম শেখানোর ক্ষেত্রে মাত্রা বিবেচনা করতে হবে। কারণ, যে বিয়ষটি শুরুর দিকে সহজ হয়, গ্রহণকারীর কাছে সেটি ভালো লাগতে শুরু করে। খোলা মনে সে তা গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে বিধিবিধানের মাত্রা বেশি হলেও সমস্যা হয় না। সে বেশি গ্রহণ করতেও আগ্রহী থাকে।’

সুসংবাদ দান নববি কর্মপন্থা : রাসুল (সা.) সবসময় সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ প্রদান করতেন। এটি তার অনন্য কর্মপন্থার অংশ। কেউ প্রশংসাযোগ্য কোনো কাজ করলে তিনি তার প্রশংসা করতেন। তাকে জান্নাতে উঁচু মর্যাদা প্রাপ্তির সুসংবাদ দিতেন। এটি তাকে ও তার পাশাপাশি অন্যদেরকে আল্লাহর আনুগত্যে অটল থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করত। এ কারণে মুসলমানের কর্তব্য হলো, সবসময় অপর মুসলমানকে সুসংবাদ দেবে, তার সাফল্যে অভিনন্দন জানাবে। একবারের ঘটনা। রাসুল (সা.)-কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তার সর্বক্ষণের সঙ্গী আবু হুরায়রা (রা.) খুঁজে খুঁজে হয়রান। হঠাৎ জানা গেল, তিনি এক খেজুর বাগানে অবস্থান করছেন। বাগানটি দেয়ালে ঘেরা। সদর দরজা আটকানো। আবু হুরায়রা (রা.) একটি সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে তাতে প্রবেশ করলেন। রাসুল (সা.) তাকে দেখে বললেন, ‘আমার এই জুতা জোড়া নিয়ে যাও। এই দেয়ালের বাইরে যাকেই এমন পাবে, যে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে এ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই; তাকেই জান্নাতের সুসংবাদ দেবে।’ (মুসলিম)।

সুসংবাদ দান ইসলামি শিষ্টাচারের অংশ : সুসংবাদ দান ইসলামি শিষ্টাচারের অংশ। কল্যাণের সুসংবাদ দানের দীক্ষায় সব মুসলমানের দীক্ষিত হওয়া উচিত। এটি যেন সবার হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়ে যায়। মুসলমান মুসলমানকে সুসংবাদ দেবে, ভালো কাজে শুভেচ্ছা জানাবে, আমলে উদ্বুদ্ধ করবে, আনুগত্যে অটল থাকতে উৎসাহ যোগাবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যারা অন্ধকারে বেশি বেশি মসজিদে গমন করে, কেয়ামতের দিন তাদের পরিপূর্ণ আলোকপ্রাপ্তির সুসংবাদ দাও।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)। রাসুল (সা.) একবার সাহাবিদের নিয়ে এশার নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে সবাই ফিরে যাওয়ার আগে রাসুল (সা.) বললেন, ‘একটু দাঁড়াও। সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের ওপর আল্লাহর এ এক অমূল্য নেয়ামত যে, এ সময়ে তোমরা ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নামাজ আদায় করছে না।’ আবু মুসা আশআরি (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে এ কথা শুনে খুশি মনে ঘরে ফিরে গেলাম।’ (বোখারি)।

বিপদে সান্ত¡না জানানো মোমিনের কর্তব্য : বিপদের সময় মোমিন সান্ত¡না চায়। বিপদ থেকে মুক্তির সুসংবাদ শুনতে চায়। সে চায়, কেউ এসে বলুক, ‘এই তো তোমার বিপদ অচিরেই কেটে যাবে।’ অথবা এই বলে সান্ত¡না দিক যে, ‘এই বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে আল্লাহর কাছে অনেক বড় প্রতিদান লাভ করবে।’ উম্মুল আলা অসুস্থ ছিলেন। রাসুল (সা.) তার খোঁজ নেওয়ার জন্য গেলেন। তখন রাসুল (সা.) তাকে বললেন, ‘উম্মুল আলা! সুসংবাদ গ্রহণ করো। মুসলমানের রোগ তার পাপগুলো এমনভাবে দূর করে, যেমন আগুন লোহার মরিচা দূর করে।’ (তিরমিজি)। মোমিন বিপদে মানুষকে সান্ত¡না দেয়। মানুষের ব্যথা-বেদনা দূর করে। মন খুশি করার চেষ্টা করে। হাররার ফেতনার সময়ের ঘটনা। আনাস ইবনে মালেক (রা.)-এর সন্তান-সন্তুতি নিহত হয়। যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) তাকে এক সান্ত¡নামূলক পত্র প্রেরণ করেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘আমি আপনাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ প্রদান করছি। আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, হে আল্লাহ! আনসারদের ক্ষমা করুন। ক্ষমা করুন তাদের পুত্রদের এবং তাদের পুত্রের পুত্রদেরও।’ (মুসনাদে আহমদ)।

মোমিনের জন্য উভয় কালেই সুসংবাদ : যারা ঈমান আনবে ও আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তাদের বিশেষ সুসংবাদ দান করেছেন। তিনি বলেন, ‘তাদের জন্য পার্থিব জীবনে সুসংবাদ রয়েছে এবং পরকালেও। আল্লাহর সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন হয় না। এটাই মহাসফলতা।’ (সুরা ইউনুস : ৬৪)। পার্থিব জীবনে তাদের সুসংবাদ হলো, অন্য মুসলমানের কাছে তারা গ্রহণযোগ্য হবে। মুসলমানরা তাদের সৎকাজের শোকরিয়া আদায় করবে। রাসুল (সা.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কেউ যদি ভালো কাজ করে আর মানুষ তার প্রশংসা করে, এটি কেমন?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘এটা মোমিনের নগদ সুসংবাদ।’ (মুসলিম)। মোমিনের চরিত্র এমন হওয়া উচিত যে, সে অপর মুসলমানকে আশান্বিত করবে। শুভ পরিণামের সুসংবাদ দেবে। অন্য মুসলমানের যেন তার থেকে কোনো ধরনের কষ্টের শিকার না হতে হয়।

ঘৃণা ছড়ানো কাম্য নয় : কোরআন-সুন্নাহর এসব নির্দেশনা জানার পর কোনো মোমিনের ঘৃণাজীবি হওয়া, মানুষকে হতোদ্যম করা ও অপদস্থ করা উচিত নয়। এটা মোমিনের কাজ হতেই পারে না। মোমিন সুসংবাদ ছড়াবে। মানুষকে উজ্জীবিত করবে। ভালো কাজে উৎসাহিত করবে। সাহস যোগাবে। শক্তি যোগাবে। আশা জাগাবে। বেশি বেশি নেক আমল করতে উদ্বুদ্ধ করবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সহজ করো। কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও। ঘৃণা ছড়িও না। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করো। সর্বোত সুন্দরভাবে রাসুল (সা.)-এর আনুগত্য করো।’ (মুসলিম)। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা তাগুতের ইবাদত বর্জন করে ও আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়, তাদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। আমার সেসব বান্দাদের সুসংবাদ দাও, যারা আমার বাণী শ্রবণ করে ও তার উত্তম শিক্ষার অনুসরণ করে। তাদেরই আল্লাহতায়ালা হেদায়েত দান করেছেন। তারাই বুদ্ধিমান।’ (সুরা যুমার : ১৭-১৮)।

মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন- মুফতি মুইনুল ইসলাম